মতামত

বঙ্গবন্ধু আমাদের শতবর্ষী বটবৃক্ষ

।। স্বপন বিশ্বাস।।

সেদিন পার্কে বসে কথা বলছিলাম আমার এক বন্ধুর সঙ্গে। দেশে এখন বেশ সাজ সাজ রব চলছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে। আমি বললাম, ‘বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে এখন তাঁর বয়স হতো এক শ বছর। তিনি বেঁচে ছিলেন মাত্র ৫৫ বছর। কত অল্প বয়সে তিনি বাংলার অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। যিনি বাংলার মানুষকে এতটা আপন করে নিতে পেরেছিলেন যে সবাইকে “তুমি” করে সম্বোধন করতে পারতেন। মাত্র একান্ন বছর বয়সে তাঁর ডাকে বাংলার মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।’
বন্ধুটি আমার কথা শুনে বললেন, তিনি যে ৫৫ বছর বেঁচেছিলেন, তার মধ্যে প্রায় ১৩ বছর জেলে কাটিয়েছেন। আমি বললাম, ‘আপনি যদি সেভাবে হিসাব করেন, তবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার বয়স ১৮ বছর বাদ দিলে তিনি কারাগারের বাইরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন মাত্র ২৪ বছর। এর মধ্যেই তিনি আমাদের একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন। প্রতিদানে তিনি স্ত্রী পুত্রসহ সপরিবারে নিহত হয়েছেন আমাদেরই হাতে।’
বন্ধুটি আমার কথা শুনে বললেন, ‘শুনুন। আপনাকে একটা “সিরিয়াস গল্প” বলি। তখন জিয়াউর রহমান শাসনামলের মাঝামাঝি সময়। আমি তখন নাইন কি টেনে পড়ি। আমাদের স্কুলে কয়েকজন আর্মি অফিসার এলেন রিক্রুটমেন্ট ক্যাম্পেইনের জন্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেক সেনা সদস্য নিহত হন। সেনাবাহিনীতে তখন লোক দরকার। তারা আর্মির চাকরির অনেক সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে বললেন। তারপর একপর্যায়ে বললেন, “একজন মানুষের ঘোষণা ছাড়া আমরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে পারতাম না। তোমরা কি কেউ বলতে পারবে তিনি কে?” প্রশ্ন কমন পড়ায় আমি খুশিতে লাফিয়ে উঠে বললাম, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।” আর্মি অফিসারেরা যেন দপ করে আগুনের মতো জ্বলে উঠলেন। চিৎকার দিলেন, “স্টপ দিস ননসেন্স। হাউ ডেয়ার ইউ! হু টিচেস ইউ হিস্ট্রি? গেট আউট ফ্রম হেয়ার।” হেড স্যার ইতিহাস স্যারকে ধমক দিয়ে বললেন, “দাঁড়িয়ে দেখছেন কী? ওকে ঘাড় ধরে স্কুল থেকে বের করে দেন। সেই সঙ্গে আপনিও বিদায় হন।”’
বন্ধুর গল্পটি শুনে মনে হলো সত্যিই খুব ‘সিরিয়াস গল্প’। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর একটা দীর্ঘ সময় আমরা পার করেছি, যখন বঙ্গবন্ধুর নাম বলাটাও একটা অপরাধ ছিল। সঠিক ইতিহাস জানাটাও একটা অপরাধ ছিল। আজ সময়ের পালাবদল হয়েছে। আমরা অনেক জাঁকজমক করে যে জন্মশতবর্ষ পালন করছি, এটি তাঁর প্রাপ্য। এটি পালন করা আমাদের দায়িত্ব। আমাদের নেতারা বক্তৃতা বিবৃতিতে প্রায়ই বলেন, ‘আমাদের গায়ের চামড়া দিয়ে যদি বঙ্গবন্ধুর পায়ের জুতা বানিয়ে দেওয়া যায়, তবুও বঙ্গবন্ধুর কাছে বাঙালি জাতির ঋণ শোধ হবে না।’ বাঙালি আবেগপ্রবণ জাতি। আবেগের পরিভাষায় এটি একটি সঠিক উপমা বলেই আমি মনে করি। অথচ জাতি হিসেবে আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা আমাদের এই মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখতে পারিনি। যেই নেতাকে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী হত্যা করেনি, সেই নেতাকেই বাঙালি নামধারী কয়েকজন কুলাঙ্গার সপরিবারে হত্যা করেছে। আজ যখন আমরা মুজিব বর্ষ পালন করছি, তখন মুজিব নেই। মুজিব-হারা এই বাংলায় আমরা স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হই—‘এক মুজিব লোকান্তরে, লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে’, ‘কে বলে রে মুজিব নাই, মুজিব সারা বাংলায়’। এসব স্লোগান দিয়ে তো আমরা এটাই বোঝাতে চাই যে আমরা মুজিবের স্বপ্ন, মুজিবের চেতনাকে অন্তরে ধারণ করি। যে স্বপ্ন, যে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন, তাঁর অবর্তমানে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা কতটুকু সফল হয়েছি, তা ফিরে দেখার সময় এই জন্মশতবর্ষ।
বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থার। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের মুক্তির। সে মুক্তি অবশ্যই অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক বঞ্চনা থেকে মুক্তি। তিনি ‘চাটার দল’, চোর, মুনাফাভোগী ও দুর্নীতিমুক্ত একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি প্রতিটি মানুষের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। সর্বোপরি তিনি একটি ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। আজ বঙ্গবন্ধুর এই জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে আমাদের হিসাব করতে হবে কী পেয়েছি, কী পাইনি, না পেলে কেন পাইনি এবং যা পাইনি তা অর্জনের জন্য একটি বাস্তবমুখী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
এ কথা বলা বাহুল্য যে, স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না যে, স্বাধীনতা পরবর্তী এই দীর্ঘ সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য বড় সময় বৈরী পরিবেশের ভেতর দিয়ে পার হয়েছে। যখন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন অনেক দূরের কথা, বঙ্গবন্ধুর নামটিই ভুলিয়ে দেওয়ার সব ধরনের আয়োজন ছিল। বারবার আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ভুল মানুষ। শেখানো হয়েছে ভুল ইতিহাস এবং তার ফল হিসেবে দেশে জন্ম হয়েছে একটি বিভ্রান্ত প্রজন্মের। তবে এসব অজুহাত সামনে এনে আর বক্তৃতা বিবৃতিতে বারবার সেসব প্রসঙ্গ তুলে আমরা আমাদের দায় এড়াতে পারি না, যে প্রয়াস প্রায়সই আমাদের নেতা নেত্রীদের মধ্যে দেখি। নিজেদের দায় নিজেদের কাঁধে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
এই সময়ে দাঁড়িয়ে শুধু সমালোচনার জন্য সমালোচনা না করে আমাদের অর্জনগুলোকেও সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমরা অপ্রত্যাশিত সাফল্য লাভ করেছি। নিজস্ব ‌অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো একটি বিশাল প্রকল্প হাতে নেওয়ার মতো সাহস দেখাতে পারি আমরা। ঢাকা শহরে উড়ালসড়ক ও মেট্রোরেল এখন আর কোনো স্বপ্ন নয়। যে দেশে এক সময় মাত্র সাত কোটি মানুষের সারা বছরের খাদ্য উৎপাদন হতো না, সেখানে এখন সতেরো কোটি মানুষের মুখে খাবার তুলেও খাবার উদ্বৃত্ত থাকে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আমাদের শিক্ষার হার, মাথা পিছু গড় আয় ও গড় আয়ু বেড়েছে। আমাদের শিশু মৃত্যুহার কমেছে। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে অগ্রগতি প্রশংসনীয়। তবে ভুলে গেলে চলবে না যে, এসব সাফল্যের একটি উল্টো দিকও আছে। যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়নের আড়ালে রয়েছে এক বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা। গুটিকয়েক মানুষের হাতে অঢেল সম্পদ। অথচ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে পিছিয়ে পড়েছে এই উন্নয়নের ধারা থেকে। ভুলে গেলে চলবে না যে, বঙ্গবন্ধুর জীবনের লক্ষ্যই ছিল বাঙালি জাতিকে বৈষম্য ও বঞ্চনার হাত থেকে মুক্তি দেওয়া। কৃষকের উৎপাদন বেড়েছে, অথচ দেশে তা সংরক্ষণ ও বাজারজাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে সুফল চলে যাচ্ছে মুনাফাভোগীদের ঘরে। দেশের শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও কুক্ষিগত হচ্ছে মুনাফাভোগীদের হাতে। বঞ্চনার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এসব অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনা ও বৈষম্য থেকে বাংলার কৃষক-শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের মুক্তি ও একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার।

Related Articles

Back to top button