করোনামতামত

দান খয়রাতের প্রতি অতি নির্ভরশীলতাই প্রান্তিক মানুষের ভঙ্গুর অর্থনীতির মূল কারণ

বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় সকল বাংলাদেশিরা ইতিমধ্যে অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে শংকিত

                    : শাকির আলম কোরেশী : 

কিভাবে শুরু করি কথাটা বুঝতেছিনা ! লেখার বিষয় কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে ততটা নয়, যতটা না ব্যক্তিকেন্দ্রিক ।

একটা ফোন কল পেলাম দেশ থেকে দুর্ভোগ, দুর্যোগের শঙ্কায় বলতেই হল, কি আর করার আছে ,তাদেরকে সুযোগটা দিয়ে দাও ।

একেতো করোনার মহামারি, আয় উপার্জন নাই বললেই চলে, তার উপর রমজান মাস, কিছু ত্রাণ সংগ্রহ করতে পারলে খারাপ কি ? রমজান পরে বাকি কাজটা যেন শেষ করে ,কথাটা জানিয়ে রাখো l 

কথা বলছিলাম গ্রামের গার্লস স্কুলের পেইন্টিং কাজে তদারকির দায়িত্বে থাকা এক ভাতিজার সাথে।

পেইন্টাররা নাকি এখন আর কাজ করবে না  ত্রাণ নিয়ে দেশি বিদেশি দানবীররা দৌড়াদৌড়ি করছেন তাই তাদেরকে লাইনে দাঁড়াতে হবে ।

কাজে থাকলে কর্মক্ষম বলে হয়তো করোনায় ততটা করুনা মিলবে না, এই ভয়ে কর্মহীনদের লিস্টে থাকাই শ্রেয়। তাই সাময়িক কর্মবিরতি  তাদের এই কর্মবিমুখতা যেন আজন্ম না হয় সেটাই হোক সবার প্রত্যাশা ।

মাশা’ল্লাহ এবার করোনার দুর্যোগ মহামারীতে সামাজিক দায়িত্ববোধে দেশি বিদেশীদের মহানুভব সুদৃষ্টির কথা স্মরণীয় হয়ে থাকবে দীর্ঘকাল ।

তবে বিশেষ কোন পরিস্থিতি ব্যাতিরেকে এ রকম দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা অর্থাৎ খয়রাত প্রাপ্তির ধারাবাহিক প্রত্যাশা খুবই দুঃখজনক ।

কখনো তেমন কোন ব্যতিক্রম পরিস্থিতির উদ্ভব হলে অবশ্যই আমাদের সবাইকে একে অন্যের তরে এগিয়ে আসতে হবে এটা যে শুধু ইসলামে সওয়াবের কাজ এমন না, ধর্ম, বর্ণ ও জাতি নির্বিশেষে দুর্যোগকালীন সময়ে একে অন্যের প্রতি হাত বাড়ানো আমাদের বহুমাত্রিক সমাজে সামাজিক দায়বদ্ধতাও বটে ।

তবে এই প্রত্যাশায় যথারীতি দীর্ঘকাল কর্মহীন বনে যাওয়ার প্রচেষ্টা কিন্তু আর্থসামাজিক অবক্ষয়ের পথে হাঁটার নামান্তর ।

প্রাসঙ্গিকতায় আমার এক প্রবাসী বন্ধুর সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরছি এখানে প্রায়ই তার কাছে নিজ এলাকার কিছু যুবক দেশ থেকে সাহায্য প্রার্থী হয় ।

একই ব্যাক্তি বছরে বার কয়েক বিভিন্ন অজুহাতে আবদার নিয়ে আসায় তাদেরকে আত্মনির্ভরশীল করার উদ্যোগ নেয় সে ।

বেশ ক’বছর ধরে ব্রিটেনে গার্মেন্টস পণ্য সামগ্রী এশিয়ান কমিউনিটির বুটিক হাউস গুলিতে সাপ্লাই করে বেশ বড় ধরণের বাজার তৈরী করেছে ।

আট দশজন কর্মী বারোমাস কাজ করে এমন একটি সেলাই কারখানা দেশে বছর দুয়েক ধরে চালাচ্ছে l বেশ ভালোই চলছে অদূর ভবিষতে খানিকটা বড় আঙ্গিকে কারখানাটিকে সম্প্রসারণের ইচ্ছা রয়েছে তার ।

সব কিছুই কিন্তু নিকট আত্বীয় বেকার তরুণ যুবকদের স্বনির্ভরতাকে ঘিরে , তাদের পরিবারকে কিছুটা দারিদ্রমুক্ত করার উচ্চাকাঙ্খা নিয়ে । স্বপ্ন বাস্তবায়নে সে ইতিমধ্যে কারখানাটি গ্রামের বাজারে স্থানান্তর করেছে ।

দুই তিন সপ্তাহের ট্রেনিং শেষে মাসিক দশ হাজার টাকার অফার দিয়েও বেকার কাউকে চাকরিতে আনতে পারেনি বরং অপ্রত্যাশিত এক বাহানায় তারা সবাই অপারগতা প্রকাশ করে ।

সমস্যা কিন্তু অন্য জায়গায় বিষয়টির একটু গভীরে গেলেই দেখবেন এর পিছনের ভিন্ন কারণ ।

বহুলাংশে দায়ী কিন্তু আমরা বিদেশীরাই সকাল হলেই বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানো,আর বিকেলে নৌকা- ধানেরশীষ নিয়ে বাজার গরম করাই তো তাদের দৈনিন্দন কাজ ।

দশ হাজার টাকা বেতনে তারা রুটিনের বেড়াজালে চাকরি করবে কেন, যেখানে প্রতি মাসে দশ পনেরো হাজার টাকা বিভিন্ন অজুহাতে দান খয়রাত হিসেবে তাদের পকেটে আসে।

নিজের অনুসারী বা নিজের নামে শ্লোগান তোলার জন্যই তো সময়ে সময়ে আমরা অনেকেই তাদেরকে পকেটমানি দিয়ে পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা তা থেকে সরিয়ে রাখছি

কেনইবা অন্যের নামে কুৎসা রটানোর জন্য নিয়মিতভাবে হাত খরচা দিয়ে নিজের নামে গ্রুপ তৈরী করছি। আমরা কি কখনো চিন্তা করছি যে তারও একটি পরিবার আছে, সংসার আছে  মা-বাবা, ভাই-বোন নিয়ে জীবন সংগ্রামে তাকে তো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে ।

প্রয়োজন ফুরালে তাদের খোজ নেওয়ার অভ্যাস কি আছে আমাদের ? এই সামান্য জ্ঞান বুদ্ধিটুকুও যেন আমাদের চিন্তা চেতনায় অবশিষ্ট আছে বলে মনে হয়না ।

দারিদ্রতার হাত থেকে রক্ষা পেতে তাকেও তো স্হায়ীভাবে কিছু একটা করতে জীবন সংগ্রামে নামতে হবে ।

আমরা কি তাদেরকে সেভাবে দারিদ্রমুক্ত করতে সহায়তা করছি ? পরিবার কেন্দ্রিক অতি দরিদ্র পর্যায়ে প্রান্তিক মানুষকে কৃষিবান্ধব করতে “একটি বাড়ি একটি খামার “এর ধারণায় কি তাদেরকে সহায়তা দিয়ে উদ্বুদ্ধ করছি ? ভবঘুরে স্বভাবের জন্য তারাও যে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য দায়ী, বিষয়টি অস্বীকার করার অবশ্য কোন সুযোগ নেই ।

এমন কি তাদের পরিবারের কর্তাব্যক্তি পর্যন্ত নিজের পায়ে দাঁড়াবার নূন্যতম চেষ্টাটুকু করতে চায় না l দান খয়রাতের প্রতি তাদের এত নির্ভরশীলতা যেন একটি অনুমোদিত পেশা হিসেবে স্বীকৃতি নিতে যাচ্ছে ।

সাম্প্রতিক কভিড-19 মহামারীতে কিন্তু নির্দিষ্ট কোন দেশ, জাতি বা বর্ণভিত্তিক কোন গোষ্ঠী এককভাবে আক্তান্ত হয়নি l বরং এটি একটি বৈশ্বিক মহামারী l সবচেয়ে বড় উদ্বেগের ব্যাপার আমাদের মতো অনুন্নত দেশের বিভিন্ন পেশার শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে , যেখানে উন্নত বিশ্বই করোনার ভয়াবহ ছোবলে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত, অসহায় ও আতঙ্কগ্রস্থ ।

বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় সকল বাংলাদেশিরা ইতিমধ্যে অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে শংকিত l উন্নত বিশ্বের স্টেট পলিসির বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আজ আমাদের প্রায় সবাইকে মর্টগেজ, রেন্ট, রেইট সহ সব দেনা বন্ধ করে পেমেন্ট হলিডে নিতে হয়েছে। যেখানে মাত্র তিন মাসের কর্মহীনতায় অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ সকল মানুষই স্থবির হয়ে পড়েছে, সেখানে কর্মহীন মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে নিজেকে এখনই ভেবে দেখতে হবে । মানুষ কি নিজের আত্বকর্মসংস্থানের ব্যাপারে সচেষ্ট হবে না ? চ্যারিটির চাকা যে অনন্তকাল নাও ঘুরতে পারে, সেটা কি ভাবনায় আছে ? যারা সাধারণত দান খয়রাত করেন, ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দিয়ে থাকেন, সামান্য ক’দিনের মহামারীতে তো আজ তারাই অনেকটা কুপোকাত ।

দুর্ভাগ্যক্রমে যদি এ মহামারী কিছুটা দীর্ঘস্হায়ী হয়, থমকে যাওয়া অর্থনীতিতে সমাজ সভ্যতায় আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত পরিবার ও প্রতিষ্ষ্ঠানকে ঠিকে থাকতে হলে নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থানের ব্যাবস্হা করতে হবে ।

অন্তত বেকার তরুণ যুবকদের সকল ঋতুর প্রান্তিক কৃষিতে মনোযোগী হতে হবে । ভবঘুরে স্বভাব পরিহার করে পতিত জমি, বাড়ির অব্যবহৃত জায়গা, পরিত্যাক্ত জলাশয় ও পুকুরকে ঘিরে “একটি বাড়ি একটি খামার ” এই ধারণার আওতায় মৎস্য, কৃষি ও রবি শস্য উৎপাদন ব্যাতিরেকে সম্ভাব্য দুর্যোগ দুর্ভিক্ষে পরিবার নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবার কোন সুযোগ আছে বলে মনে হয় না l কাজেই আমরা সবাই ব্যাক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নিজেদের স্বার্থেই ইনকাম জেনারেটের দিকে যেন অবশ্যই মনোযোগী হই।

লেখক :শাকির আলম কোরেশী , সমাজ কর্মী ও সংগঠক ।

Related Articles

Back to top button