মতামত

করোনায় ২০২০ সালের করুণ ঈদ : নেই আনন্দ উল্লাস, নেই ঈদ জামাত

॥ মো: রেজাউল করিম মৃধা ॥

ঈদের মহাআনন্দ আজ আর নেই। করোনাভাইরস মহামারিতে ম্লান হয়েছে আনন্দ। নেই ঈদে নতুন জামা, নেই বাহারি খাবারের মহা আয়োজন। ঈদের আয়োজনে পরিবার থেকে শুরু করে  মসজিদ, ঈদ গাঁ, খোলা মাঠে ঈদের জামাত নিয়ে সবাই ব্যাস্ত সময় কাটাতো সব খানে। কিন্তু এবারের ঈদে নেই ব্যাস্ততা, নেই আনন্দ উল্লাস নেই।

রমজান মাস শুরু হতে না হতেই পরিবারগুলির মধ্যে শুরু হতো ঈদের বাজেট । বিশেষ করে ১৫ রোজার পর থেকে মার্কেটে পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের শপিং এ বেশী সময় কেঁটে যেতো। এক মার্কেট থেকে অন্য মার্কেট এ পছন্দের পোষাক কিনতে দুপুর থেকে সন্ধ্যা গড়িয়ে যেতো, কিন্তু এবার সেই সুযোগ থেকে বন্চিত। আর ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা  নতুন জামা কাপড় না পেয়ে ঈদ যেনো করো মনেই হচ্ছে না।

আর আমরা যারা সংবাদ কর্মী আমাদের ব্যস্ততা থাকতো প্রেস কন্ফারেন্সে, মিটিং আর আলোচনা সভায়। কোন পার্কে কয়টায় জামাত, কোন খোলা মাঠে বা স্টেডিয়ামে কয়টায় জামাত হবে? কোন মসজিদে ৪/৫ জামাত হবে সেই সময়গুলিও ধারা বাহিকভাবে জানাতে হবে।

এছাড়া কোন জামাত কে পড়াবেন? কোন জামাতে মেয়র আসবেন? কোন জামাতে এমপি, মন্ত্রী আসবেন?  হাই কমিশনার আসবেন?  অথবা রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতা আসবেন? সেই হিসাব রেখে আমাদের কাজের শিডিউল করতে হতো। এবার অবশ্য সেই শিডিউল নেই করোনায় সব স্তব্ধ করে দিয়েছে। কোথাও ঈদের জামাত হচ্ছেনা। যার যার ঘরে বসে ঈদের নামাজ আদায় করতে হবে। সবার আগে জীবন বাঁচানো ফরজ।

ইসলামি শরিয়তে ঈদগাহ বা খোলা জায়গায় পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজের জামাত আদায়ের ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির কারণে মুসল্লিদের জীবনের ঝুঁকি বিবেচনা করে এ বছর ঈদগাহ বা খোলা জায়গার পরিবর্তে ঈদের নামাজের জামাতনা করা এবং গন জামায়েত না হওয়া বা নামাজ শেষে কুলাকুলি না করা সরকারি বিধিনিষেধ আমাদের সবাইকে মেনে চলতে হবে।

করোনাভাইরাস অতিমাত্রায় সংক্রামক বলে সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান. অফিস-আদালত ও বার, রেস্টুরেন্ট বন্ধ রাখা হয়েছে গত মার্চের মাঝামাঝি  থেকে। সেই সাথে গণজামায়েত। এই সময় সবাইকে বাসায় থাকার, জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হলে শারীরিক ও সামাজিক  দূরত্ব বজায় রাখার এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশ কিছুটা শিথিল হলেও এখনও বহাল রয়েছে হোম এলার্ট। সামাজিক দূরুত্ব ও গন জামায়েত নিষিদ্ধ । তাই ঈদের জামাতের মত মুসলমানদের বৃহৎ ধর্মীয় অনুস্টান থেকে আমরা সহ সারা বিশ্ব ঘরে বন্দি।

ঘরে ঘরে একা একা অথবা পরিবার নিয়ে ঈদের নামাজ।তাতে হয়তো ইসলামের একটি ওয়াজিব নামাজ আদায় হবে? সমান সওয়াব পাওয়া যাবে, কিন্তু ঈদের ইমেজ বা আনন্দ পাওয়া যাবে না।

বিশ্বে প্রতিবছরই ঘরে ঘরে রোজা-ইফতার, চাঁনরাত, ঈদের জামাত ও ঈদ উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে দিনটি সুদীর্ঘ কাল ধরে পালিত হয়ে আসছে। আজ বিশ্বব্যাপী করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় ঈদ হয়ে যাবে নিরানন্দের প্রতীক এবং ঈদে যুগ যুগ ধরে যে আতিথেয়তার প্রচলন ছিল, এবার শুধু গৃহঅন্তরীণ মানুষেরাই নিজ নিজ ঘরে বসেই ঈদ উদ্‌যাপন করবে, ভুলেও কারও বাসায় যাওয়া যাবে না, কারও সঙ্গে কোলাকুলি করতে পারব না এবং কোন অতিথি এলে মনে ভাবনা হবে—এসেছে করোনা, এ যে কি নিদারুণ কষ্ট! ঈদের ঐতিহ্য অনুযায়ী নতুন জামা-কাপড় পরতে হয়, এবারের ঈদে অনেকেই পুরোনো কাপড় পরে ঈদের আনন্দ করবো।বৈশ্বিক কোভিড-১৯ এর কারণে।

আমার লন্ডনের ঈদের দিনের আনন্দ উৎসব হলো সকালে পাশের মসজিদে প্রথম জামাত সকাল ৭.৩০ টায় ঈদের নামাজ আদায় করে ,সোজা ইস্ট লন্ডন মসজিদের নামাজ কভার করে সকাল ৯.০০টায় মাইলএন্ড স্টেডিয়ামের ঈদের  নামাজ কভার করে মেয়র বা এম পির ইন্টারভিউ করেই সরাসরি ব্রিক লেইন মসজিদে সেখানে হাইকমিশনের ইন্টারভিউ এর পর বন্ধুদের সাথে আড্ডা। খাওয়া দাওয়া আর ক্যারল ভাইর ঐতিহাসিক কাসাব্লাংকা আলাউদ্দিনে ঈদের কেক কাঁটা এ সময় ল্ন্ডনের প্রায় সব সাংবাদিকগনরাই উপস্থিত হন। চলে সেলফিও ফটো তোলা। এবার অনেক মিস করছি। এর পর বাসায় এসে দুপুরের খাবার পরিবারের সবার সাথে। এর সোজা অফিসে গিয়ে কার্ড রেখেই আমার ছুটি ।

বাসায় ফিরে এসে পরিবার সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এবং ঘোরাঘুরি করা। বন্ধু এবং আত্বীয়দের বাসায় দাওয়াৎ খাওয়া বা অনেক ঈদে নিজের বাসাতেই বন্ধুদের স্বপরিবার দাওয়াৎ এর সারা রাত আড্ডা দেওয়া, আনন্দ উল্লাস করা। অনুষ্ঠিত ঈদ অনুষ্ঠানের কথা এবার কল্পনাও করা যায়না।

সারা রাত জেগে সব বন্ধু-বান্ধব মিলে মেহেদি লাগিয়ে পিঠা খাওয়া, সেটা হয়তো শৈশবের স্মৃতি হিসেবেই থেকে যাবে বহুকাল। কিন্তু আনন্দবিহীন হাতের ছোঁয়ায় হয়তো মেহেদীর আলপনা আঁকা হবে ‘করোনামুক্তবিশ্ব’।

এবার মুসলিম বিশ্বে করোনাকালের ঈদ একবিভীষিকাময় উৎসব হয়ে থাকবে। এই ঈদেবিশ্ব মুসলিমের একটিই প্রার্থনা হোক, ঈদের জামাত যেখানেই আমরা পড়ি না কেন, আমরা যেন সৃষ্টিকর্তার কাছে দ্রুত বিশ্বকরোনামুক্ত করার জন্য দোয়া করি এবং আমরা যেন জীবনের পরবর্তী ঈদগুলো করতে পারি মহা আনন্দে।

যে যেখানে আছেন । ভালো থাকবেন।সুস্থ্য থাকবেন। আমার জন্য, আমাদের জন্য এবং সবার জন্য দোওয়া করবেন। সবার জন্য ঈদের অনেক অনেক শুভেচ্ছা, ঈদমোবারক। ঈদ মোবারক।।

Related Articles

Back to top button