মতামত

২৩ শে জুন ও আগামীর প্রত্যাশা

॥ জুয়েল রাজ ॥

মানব সভ্যতার ধারাবাহিকতায় একেকটি দিন মাইল ফলক হয়ে থাকে। সংখ্যা তত্ব যারা বিশ্বাস করেন,  অথবা জ্যোতিষ শাস্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাঁদের কাছে এই সংখ্যা তত্ব  বিশেষ অর্থ বহন করে। কারো কাছে নিতান্তই কাকতালীয়, কারো কাছে বা অলৌকিক। বাঙালির জীবনে কিছু কিছু সংখ্যা ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সেই দিনগুলোকে যেভাবেই বিচার করা হোক,  এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, কোন ভাবেই। বায়ান্নের  একুশে ফেব্রুয়ারী, ১৯৭১ ছাব্বিশে মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর, ৭৬ ১৫ আগষ্ট, তেমনি একটি সংখ্যা ২৩ শে জুন।

২৩ শে জুন সংখ্যাটিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও   বাংলাদেশে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।  যেমন অস্বীকার করা যাবে না ১৯৭১ কে। কাকতালীয়ভাবে এই বছরই আওয়ামী লীগ ও পাড়ি দিল ৭০  বছর। ৭১ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন করল, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।  ২৩ শে জুন ১৯৪৯ সালেই মূলত রোপিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ। আমাদের উপমহাদেশে কোন  রাজনৈতিক দলের  ৭১ বছরে পা দেয়া খুব সহজ বিষয় নয়। বাংলাদেশেই কয়েক শত রাজনৈতিক দল রয়েছে, যাদের নাম পর্যন্ত আমরা জানি না। ২৩ জুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৪৯ সালের এই দিনে ঢাকার রোজ গার্ডেনে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও সামসুল হক  সাহেবকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে হুসেন শহীদ সোহারাওয়ার্দী, তরুন নেতা শেখ মুজিব, আতাউর রহমান খান, মাওলানা তর্গবাগিশ ও ইয়ার মোহাম্মদ খান সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত এ দলটি বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম,স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে এদেশের গণমানুষের সংগঠনে পরিণত হয়েছে। আজকের আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ যার হাত ধরে অনন্য হয়ে উঠেছে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুক, আমি খুব সহজ সমীকরণে বিশ্বাস করি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুইটি ধারা বহমান, একটি আওয়ামী লীগ এবং অন্যটি আওয়ামী লীগ বিরোধী। নানা মতে, নানা নামে যেভাবেই আসুক তারা মূলত এক। আর আহামদ ছফার সেই বিখ্যাত উক্তি,  আওয়ামী লীগ জিতলে একাই জিতে আর হারলে সবাইকে নিয়ে হারে।

এই দুইটা বিষয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে শ্বাশত রূপে প্রতীয়মান। আমাদের সময়ের ভিতর আমরা জাতীয় পার্টির সেনা শাসন কিছুকাল, বিএনপির দুই দুইবারের শাসন এবং আওয়ামী লীগের ৯৬ এর শাসন কাল দেখেছি।  আর সর্বশেষ চলমান রাষ্ট্র ক্ষমতা।  উন্নয়নের মহাসড়কে ছুটে চলা বাংলাদেশের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ট নেতৃত্ব আজ বিশ্ব  স্বীকৃত। এই নেতৃত্ব নিয়ে এখন আর প্রশ্ন করার কোন অবকাশ নেই।

পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে এই দলের আত্মপ্রকাশ ঘটলেও  ১৯৫৫ সালে  শুধু আওয়ামী লীগ নাম নিয়ে অসাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে বিকাশ লাভ করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ দেশে পাকিস্তানি সামরিক শাসন, জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন ও শোষণের বিরুদ্ধে সকল আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে দলটি।

 

’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৫৮ এর আইয়ুবের সামরিক শাসন-বিরোধী আন্দোলন, ’৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন ’৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন ও ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান,  ৭০ এর নির্বাচনে নিরংকুশ বিজয়ের পথ বেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ২৪ বছরের আপোষহীন সংগ্রাম-লড়াই এবং ১৯৭১ সালের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ তথা সশস্ত্র জনযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পেছনের প্রধান শক্তি হল আওয়ামীলীগ।

 

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারী এদেশের রাজনীতির ইতিহাসে রচিত হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়ের।  বঙ্গবন্ধু যার নাম দিয়েছিলেন দ্বিতীয় বিপ্লব।  ওইদিন সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পেশকৃত চতুর্থ সংশোধনী বিল পাস হয়। জন্ম নেয় বাকশাল। কিন্তু বাকশাল কার্যকর হওয়ার আগেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে সপরিবারে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। সেই কাকতালীয় বা ভাগ্যগুণে হউক সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। তাঁদের বেঁচে যাওয়ার কল্যাণে আজ আওয়ামী লীগের ৭০ বছরের সাফল্যের ইতিহাস লিখা সম্ভব হচ্ছে। তা না হলে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট পরবর্তী আওয়ামী লীগের উপর যে নির্যাতন নিপীড়ন হয়েছে, নেতাদের যে বিভাজন হয়েছে, আওয়ামী লীগ,  বঙ্গবন্ধুক এবং তাঁর পরিবার পরিজন নিয়ে যে পরিমান মিথ্যাচার হয়েছে, হয়তো ইতাহাসের অতলে হারিয়ে যেত আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে  বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ যেদিন  দেশের ভার হাতে তুলে নেয়,  সেই দিনটি ও ছিল ২৩ শে জুন।

দীর্ঘ ৭০ বছরের পথ চলায়, নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে  আজকের অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে  আওয়ামী লীগ।  বিশেষ করে ৭৫ পরবর্তী দুঃসময় ভাঙন, কোন কোন নেতাদের আপোষ সব মিলিয়ে  বহুদা বিভক্ত আওয়া লীগ ফিনিক্স পাখির মতো সূর্যের অভিমূখে যাত্রা করেছে। আর যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত সব কিছু তিনি শেখ হাসিনা। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে পুণর্জন্ম লাভ করেছিল আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা সেই ফিনিক্স পাখি।

পৃথিবী ব্যাপী যে ক্রান্তিকাল চলছে, করোনা মহামারীতে নাস্তানাবুদ তাবৎ বিশ্ব, বাংলাদেশের মত জনবহুল একটি দেশ তা নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে।  সরকারের যাবতীয় উদ্যেগ ব্যার্থ হচ্ছে দায়িত্বশীল ব্যাক্তিদের দূর্নীতিতে।   করোনা কালে স্বাস্থ্যখাতের ব্যার্থতা ও দূর্নীতি সেই সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। যা এড়িয়ে যাওয়া বা অস্বীকার করা যাবে না। সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্ধ শুধু মাত্র প্রশাসনিক দূর্নীতির কারণে হাওয়া হয়ে গেছে।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সকল ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মূলনীতি।

যে মূলনীতি এবং বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত  হয়েছিল, আজকের আওয়ামী লীগ নৈতিকভাবে বা আদর্শিকভাবে এখন আর সেই অবস্থানে নেই। সেই বিষয়টি ও অস্বীকার করা যাবে না। কারণ গণ মানুষের দল আওয়ামী লীগ দিনদিন এলিট শ্রেণীর দলে পরিণত হচ্ছে। তৃণিমূল থেকে উঠে আসা নেতারা মন্ত্রী এম পি হয়ে রাতারাতি টাকা তৈরীর মেশিন হয়ে যাচ্ছেন। দলের আদর্শিক জায়গা থেকে সরে এসে ত্যাগী নেতা কর্মীদের  সরিয়ে দিয়ে সুযোগ সন্ধানী দলছুটদের স্থানীয় নেতৃত্বে নিয়ে আসছেন। তাদের দূর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেই  প্রশাসন কে দিয়ে হামলা,  মামলা,  জেল  দিয়ে হয়রানী করা হচ্ছে। কর্মী নির্ভর দলটি পরিণত হচ্ছে প্রশাসন নির্ভর দলে।

১১ বছর টানা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ, রাজনৈতিক ভাবে এখন পূর্ণ বসন্ত আওয়ামী লীগের  সেখানে চারপাশে  বসন্তের কোকিলের  কুহু কুহু, এই কুহতানে ৭০ বছরের আওয়ামী লীগের কন্ঠস্বরকে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। আমলা এবং অরাজনৈতিক ব্যাক্তিরা এখন সবচেয়ে শক্তিশালী। গণ মানুষের রাজনীতি থেকে ক্রমশ দূরে সরে গেছে আওয়ামী লীগ। অনেকেই আফসোস করেন,  বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ এখন আর নেই।

৭১ বছরের আওয়ামী লীগের কাছে প্রত্যাশা, যে নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল সংগঠন,  যার সফল অর্জন একটি দেশ একটি জাতি স্বত্ত্বা, রক্তের অক্ষরে লেখা একটি সংবিধান। সেই ৭২ এর মূল  সংবিধানে ফিরে আসবে দলটি । শুধুমাত্র কাগজে কলমে নয় কার্যকর ভাবে।বাকশাল নিয়ে,  বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব, বাকশাল নিয়ে ভ্রান্তি দূর করতে হবে।  নতুন প্রজন্মকে  জানাতে হবে বাকশাল ধারণা টি কি ছিল। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু যে চরম আঘাত করতে চেয়েছিলেন সেটি বাস্তবায়ন হবে।

আর শেখ হাসিনাকেই সেই ইতিহাস রচনা করতে হবে। আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম, ফিনিক্স হয়ে ঘুরে দাঁড়ানো  তলাবিহীন ঝুঁড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে আজকের বাংলাদেশ। এই দুঃসময় যিনি পাড়ি দিয়েছেন, শক্ত হাতে নৌকার হাল ধরেছেন ইতিহাস তাঁকে  অমর করে রাখবে। তিনি শেখ হাসিনা।

গণমানুষের দাবী আদায় ও স্বাধীনতার স্বপ্ন  বাস্তবায়নে আওয়ামীলীগের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক ।  বাংলাদেশের শেষ আশ্রয় হয়েই থাকুক  বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। দূর্নীতির রাহুগ্রাসে  যেন  তলিয়ে না যায় ৭০ বছরের ত্যাগ ও রক্তাক্ত সংগ্রামের ইতিহাস।

 

লেখকঃ লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট।  

Related Articles

Back to top button