মতামত

মহামারী ও সংকট মোকাবেলায় বঙ্গবন্ধুর দর্শন

।। অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান।।

মুজিব শতবর্ষে সর্বাগ্রে আমি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি- যার জন্য বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বিশ্বের মানচিত্রে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইতিহাসের সেই মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি।

একই সঙ্গে আমি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি- ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে কিছুসংখ্যক বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার হাতে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ কামাল, মেজোপুত্র শেখ জামাল ও কনিষ্ঠপুত্র শিশু শেখ রাসেলসহ শাহাদতবরণকারী সবার প্রতি।

আজকের আমার লেখার শিরোনাম দিয়েছি- ‘মহামারী ও সংকট মোকাবেলায় বঙ্গবন্ধুর দর্শন।’ উপ-শিরোনাম দিয়েছি- ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী প্রকৃত সৈনিকের পরিচয় দেয়ার এটাই শ্রেষ্ঠ সময়।’

আমি আমার লেখার শুরুতেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কিছু অংশ উল্লেখ না করে পারছি না। জাতিসংঘের ইউনেস্কোর প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ স্থান পাওয়া ছিল যেন সময় কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত এবং ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অবশ্যাম্ভাবী পরিণতি।

প্রকৃতপক্ষে, ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মধ্যে নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। অন্যকথায়, আমি মনে করি- ৭ মার্চের ভাষণই হল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। বঙ্গবন্ধুর সেই অমর ভাষণ আজকের বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটেও আলোর পথ দেখাচ্ছে এবং সমগ্র বিশ্বে মানব জাতিকে দিচ্ছে সঠিক দিক নির্দেশনা ও করণীয় নির্ধারণ করে সঠিক পথে চলার অবিরাম প্রেরণা।
বঙ্গবন্ধু সেই ভাষণে বলেছিলেন- ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা কর।’ বর্তমান বিশ্বে স্বাভাবিক জীবনের গতির চাকাকে থামিয়ে দিয়েছে মানবশত্রু করোনাভাইরাস। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে।

বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণে মহামারী সংকটের এ সময়েও আমরা আমাদের জীবনে বাস্তবে প্রয়োগ করার মতো উপযোগিতা খুঁজে পাই। করোনাভাইরাসের মতো শক্রকে মোকাবেলা করতে আমাদের প্রত্যেককে আজ সুরক্ষার দুর্গ গড়ে তুলতে হবে।

বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের সেই ভাষণ যেন আজও আমাদের উদ্বীপ্ত করে, সাহস জোগায়, দেহ-মনে-প্রাণে শক্তি সঞ্চয় করে করোনার মতো শত্রুর সাথে লড়াই চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করে। সত্যিই করোনার মতো অদৃশ্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে হলে আমাদের প্রত্যেককেই দুর্গ গড়ে তুলতে হবে।

আর সেই দুর্গ কী ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে দিকনির্দেশনামূলক ভাষণসমূহে বারবার উল্লেখ করেছেন। বঙ্গবন্ধু দুর্গ গড়ার সাথে সাথে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে বলেছিলেন।

আজকের করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে সৃষ্ট সংকট ও দুর্দিনে আমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে করোনা নামক শত্রুকে যেমন মোকাবেলা করতে পারি তেমনই এই সংকট উত্তরণে আমরা সবাই ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি। এ সংকট উত্তরণে আমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

আসলে ৭ মার্চের ভাষণ ছিল মহাসংকটে পতিত বাঙালি জাতির মুক্তির বার্তা। বর্তমান সময়ে সমগ্র বিশ্ব ও বিশ্ববাসী মহাসংকটে পতিত। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, বঙ্গবন্ধুর বাণীসমূহ, বঙ্গবন্ধুর জীবন ও দর্শন আজও আমাদের মুক্তির পথ দেখায়। বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শনে রয়েছে কঠিন সময় অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার অমৃততুল্য সঞ্জিবনী শক্তি।

বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক জীবনে প্রায় ৫ হাজার দিন কারাভোগ করেছেন। ১৪টি বছর জেলের মধ্যেই কাটিয়েছেন। কিন্তু কখনও মাথানত করেননি, মনোবল হারাননি, ভীতসন্ত্রস্ত হননি, লক্ষ্যচ্যুত হননি। তাহলে আজ কেন আমরা করোনাভাইরাসের কাছে মাথানত করব? কেন আমরা মনোবল হারাব? কেন আমরা করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাব না?

করোনাভাইরাসকে পরাজিত করতে যে সাহস, মনোবল ও অবিরাম প্রচেষ্টার প্রয়োজন সেই শিক্ষা তো আমরা বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শন থেকেই নিতে পারি। যেখানে সামান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনেই আমরা করোনাভাইরাস শত্রুকে মোকাবেলা করতে পারি, সেখানে বঙ্গবন্ধু তার জীবনে হাজারও সমস্যা, প্রতিকূলতা, বিপদ, অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে বাংলাদেশ ও বাঙালির চিরশত্রু প্রচণ্ড শক্তিশালী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও সৈনিকদের পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সক্ষম হয়েছিলেন একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। তাহলে আজ কেন আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে কিছু নিয়ম-কানুন ও বিধি-নিষেধ মেনে চলার মাধ্যমে করোনাভাইরাস নামক শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে পারব না?

যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে প্রতিনিয়ত দিকনির্দেশনা প্রদান করছেন দেশের কাণ্ডারি, অন্ধকারের মাঝে আলোর দিশারি- বঙ্গবন্ধুরই সুযোগ্য কন্যা সফল রাষ্ট্রনায়ক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা।

১৯৭২ সালের ৮ অক্টোবর তৎকালীন পিজি হাসপাতাল বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রের শুভ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চিকিৎসকদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু গরিব-দুঃখীসহ সকল রোগীকে সমানদৃষ্টিতে চিকিৎসাসেবা প্রদান করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন।

সকল নাগরিকের জন্য বারংবার বলেছিলেন, মানবতাবোধ জাগ্রত করার কথা, মনুষ্যত্বকে ধারণ করা ও সততার প্রয়োজনীয়তার কথা। বর্তমানে মহামারীর এ সময়ে চিকিৎসকবৃন্দ মানবতাবোধ নিয়ে গরিব-দুঃখীসহ সকল রোগীকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করবেন সেটাই প্রত্যাশা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী চিকিৎসকবৃন্দ জীবনবাজি রেখে রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করবেন সেটাই স্বাভাবিক।

আমি বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে চিকিৎসকরা বঙ্গবন্ধুর মতোই অকুতোভয় বীর সৈনিকের পরিচয় দিবেন। কোনো ভয়ের কাছেই পরাজিত হবেন না। চিকিৎসাসেবা মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য অত্যন্ত একটি জরুরি বিষয়। মানুষের জীবন বাঁচাতে কোনো কিছুর ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে তারা পিছু হঠবেন না।

ইতোমধ্যে অধ্যাপক ডা. গাজী জহুরুল হাসান, ডা. মঈনসহ অনেক চিকিৎসকই রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এটাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রকৃত শিক্ষা ও মহিমা।

বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসেবে আমরা যা করতে পারি: মহামারীর এই সংকট মোকাবেলায় আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে। অপ্রয়োজনে আমরা যেন ঘরের বাইরে বের না হই। ঘরের বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে। উষ্ণ বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারলে ভালো হয়। মৌসুমি ফলমূল খেতে হবে।

ভিটামিন সি যুক্ত শাকসবজি খেতে হবে। মাছ-মাংস-ডিম প্রয়োজন মতো খেতে হবে। আদা চা, রং চা, গ্রিন টি পান করা যেতে পারে। লেবুর শরবত নিয়মিত পান করতে হবে। রান্নায় ও খাবারে অন্য সময়ের থেকে অধিক পরিমাণে রসুন ব্যবহার করা যেতে পারে।
ওষুধের মধ্যে প্রতিদিন একটা করে ভিটামিন ডি, ভিটামিন সি, জিংক যুক্ত ও মন্টিলুকাস্ট গ্রুপের ট্যাবলেট সেবন করা যেতে পারে। খাবারের পাশাপাশি ঘরে থেকে যে ধরনের ব্যায়াম করা সম্ভব প্রতিদিন তা অবশ্যই করতে হবে। সাবান দিয়ে প্রয়োজন মতো যতবার প্রয়োজন ততবারই হাত ধুতে হবে। প্রয়োজনমতো হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে।

জীবাণুনাশক দিয়ে ঘরের ফ্লোর পরিষ্কার করতে হবে। বাইরে থেকে বাসায় ফিরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়াসহ পরিধেয় সব কিছু ধুয়ে ফেলতে হবে। অর্থাৎ আমাদের নিজেদের সুরক্ষা নিজেকেই করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে এ কাজগুলো প্রতিদিন সম্পন্ন করা একটু কঠিন হলেও অসম্ভব নয় বলে আমি মনে করি।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী প্রকৃত সৈনিকের পরিচয় দেয়ার এটাই শ্রেষ্ঠ সময়: বঙ্গবন্ধু ছিলেন মানবিক সংগ্রামী দর্শনের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক। গরিব-দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তার জীবনের অন্যতম দর্শন। ইতিহাসের মহানায়ক বাঙালি জাতির পিতা ছিলেন গণমানুষের শেখ মুজিব।

বঙ্গবন্ধু জীবন দর্শন ও কর্ম আমাদের চিন্তা-চেতনাকে করে উন্নত, দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করে এবং সংকট মোকাবেলায় অসীম সাহস জোগায়। যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করে বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতে, ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন নির্লোভ, সৎ, ত্যাগী, সাহসী, মানবতাবাদী, সংগ্রামী, সাম্যবাদী এক মহান বিশ্বনেতা।

বঙ্গবন্ধুর সবচাইতে বড়গুণ ছিল সীমাহীন সাহসের সাথে সাথে মানুষের প্রতি অসীম ভালোবাসা, মমত্ববোধ, সহমর্মিতা, মহানুভবতা, মানুষের প্রতি আস্থা ও অগাধ বিশ্বাস।

১৯৭৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জের এক জনসেবায় বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে যর্থাথই বলেছিলেন- ‘মানুষকে ভালোবাসতে শেখো, দেশের মানুষকে ভালোবাস। এ ভালোবাসার মধ্যে কোনো স্বার্থ রেখো না।’

আজকে যারা নিজেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী সৈনিক বলে মনে করি, করোনাভাইরাসের মতো সংকট মোকাবেলায় সত্যিই তাদের অনেক কিছুই করণীয় রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের মতো বাংলাদেশের মানুষও করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট অজানা সংকটে পড়ে কষ্টের মধ্যে রয়েছেন।

আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ভালোবাসা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সাহায্য করা। যে যেভাবে পারি সেভাবেই মানুষকে সাহায্য করতে হবে।

মানুষের মাঝে করোনাভাইরাসের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে আত্মনিয়োগ করতে হবে। সাথে সাথে প্রত্যেকে তার নিজ নিজ দায়িত্ব কর্তব্য অবশ্যই নিষ্ঠার সাথে পালন করতে হবে। সত্যিই দেশ ও দেশের মানুষ আজ এক মহাসংকটে পতিত। এ অবস্থায় শুধুমাত্র সরকারের ওপর নির্ভর না করে আমাদের সবাইকে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

এ সময় নিজেদের স্বার্থের কথা ভাবার সময় না, হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার সময় না। মানুষকে বাঁচাতে বাস্তবতার নিরিখে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বর্তমান পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করতে হবে। রক্ষা করতে হবে নিজেকে, রক্ষা করতে হবে নিজের পরিবারকে, প্রতিবেশীদের, আত্মীয়স্বজনকে। বাঁচাতে হবে অসহায় গরিব-দুঃখী মানুষকে, বাঁচাতে হবে করোনা আক্রান্ত রোগীদের। সত্যিকারের সাহসী বীর যোদ্ধাদের মতোই চিকিৎসাসেবা প্রদান করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জীবন রক্ষা করতে হবে।

জনসচেতনতার মাধ্যমে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হওয়া থেকে মানুষকে রক্ষা করতে হবে। এভাবেই আমাদের রক্ষা করতে হবে ও বাঁচাতে হবে দেশ ও দেশের মানুষকে। আর এসব করার মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী প্রকৃত সৈনিকের পরিচয় দেয়া সম্ভব। সেজন্য আমি বলেছি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিশ্বাসী প্রকৃত সৈনিকের পরিচয় দেয়ার এটাই শ্রেষ্ঠ সময়।

এ সময়ে নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করে সততার সাথে মানুষকে বাঁচানোর জন্য আত্মনিয়োগ করতে হবে। মানুষকে সেবা করতে গিয়ে এবং দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমরা যেনো কোন ধরনের দুর্নীতি, চুরি ও অর্থ আত্মসাতের মতো অসদুপায় অবলম্বন না করি এবং এই সময় কোনো ধরনের অনৈতিক কাজ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যথার্থই বলেছেন- করোনাভাইরাস মোকাবেলা একটি যুদ্ধ: সত্যিই করোনাভাইরাসের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া একটি যুদ্ধ। কোনো একটি জাতি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় যুদ্ধ করে কিন্তু তারা জানে না কবে তারা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। করোনাভাইরাসের মতো অদৃশ্য শত্রুর সাথেও আমরা যুদ্ধ করে যাচ্ছি। কিন্তু আমরা জানি না কবে এ সংকট থেকে মুক্তি পাব।
বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জীবন ও জীবিকার অভূতপূর্ব সমন্বয় করে সুদক্ষ নেতৃত্বদানের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মানুষের স্বাভাবিক জীবনের গতিপ্রবাহ সচল রাখার। আমাদের অবশ্যই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মানুষের জীবনকে বাঁচাতে হবে ও জীবিকাকে রক্ষা করতে হবে।

জননেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর মতোই মহামারীর এ সময়ে সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের বসবাস বাংলাদেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সাথে সাথে জনগণকেও বাঁচাতে করণীয় সব কিছুই করে যাচ্ছেন।

বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণই সমগ্র বাঙালি জাতিকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং যার শেষ পরিণতি বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন রক্তিম স্বাধীনতা।

আজ বঙ্গবন্ধুরই কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ঘোষণা দিয়েছেন- আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস এই যুদ্ধেও আমরা বিজয়ী হব। করোনাভাইরাস নামক শত্রু থেকে সমগ্র মানবজাতি স্বাধীন হবে, মুক্ত হবে। মুক্তির আনন্দ বার্তা ছড়িয়ে পড়বে বাংলার আকাশ-বাতাস থেকে সমগ্র বিশ্বে।

বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র সাড়ে তিন বছরে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে তিনি স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে শামিল করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশসমূহের গর্বিত অংশীদার।
দেশরত্ন শেখ হাসিনা মহামারী এই সংকট কাটিয়ে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশসমূহের মযার্দাপূর্ণ কাতারে শামিল করতে সক্ষম হবেন বলে আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস। বঙ্গবন্ধু সারাজীবন মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। হাজারও প্রতিকূলতা, সীমাহীন অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেও মানুষকে ভালোবেসে একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন।

তিনি বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রধান কারিগর। অসীম সাহস, ত্যাগ, নিঃস্বার্থপরতা, অসম্ভব সহ্য ক্ষমতা, ধৈর্য, দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি ভালোবাসা বঙ্গবন্ধুর জীবনের অন্যতম দর্শন ও শিক্ষা। এই দর্শন ও শিক্ষা করোনাকালীন সংকট কাটিয়ে উঠতে বিশেষভাবে প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে অবশ্যই মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। এই বিপদে মানুষকে সাহায্য করতে হবে।

চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের দায়িত্ব পালন করবেন। সাধারণ মানুষ ঘরে থাকবেন এবং যারা বাইরে বের হবেন তারা অবশ্যই স্বাস্থবিধি মেনে চলবেন। এ সময়ের জন্য এসবই বঙ্গবন্ধুর জীবনের রাজনৈতিক দর্শন ও শিক্ষা বা এ সময়ের জন্য এসবই বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শনের মূল উপযোগিতা; যা এই মুহূর্তে আমাদের সবারই অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি।

বঙ্গবন্ধু যেমন আজীবন যে কোনো সংকটে মানুষের সেবায় পাশে দাঁড়িয়েছেন আমাদেরকেও সেভাবেই আজকের এ বিপদের দিনে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। বঙ্গবন্ধু যেকোনো সংকট মোকাবেলায় বিচলিত না হয়ে সাহসিকতার সাথে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে সঠিক নেতৃত্বদানের মাধ্যমে সেই সংকট কাটিয়ে উঠেছেন।

বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাও বর্তমান সংকট মোকাবেলায় সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে জাতির পিতার মতোই যোগ্য নেতৃত্বদানের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের সবারই উচিত জাতির পিতার জীবন দর্শন থেকে শিক্ষা নিয়ে বিচলিত না হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপসমূহ বাস্তবায়নে সহায়তা করা।

বঙ্গবন্ধুকে যেমন কোনো বাধা, ভয়-আতঙ্ক, আঘাত, প্রতিকূলতা তাকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর যাত্রাপথ থেকে সরাতে পারেনি, আমাদেরও তেমনিভাবে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের লড়াইয়ের পথ থেকে সরাতে পারবে না। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু যেমন কোনোকিছুতে ভীতসন্ত্রস্ত না হয়ে একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার জন্য অবিরাম লড়াই সংগ্রাম করে গেছেন এবং সফল হয়েছেন- আমাদেরও করোনাভাইরাস নিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত না হয়ে এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে এবং সফল হতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শন ও শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের করোনাভাইরাসকে পরাজিত করতেই হবে এবং মুক্ত হতে হবে এ ভাইরাস থেকে। করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত করতে হবে বাংলাদেশ ও বিশ্বকে। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শন ও শিক্ষা আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে বিশেষভাবে সহায়তা করতে পারে বলেই আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস।

পরিশেষে ২০২০ সাল মুজিব শতবর্ষে জাতির পিতার প্রতি ও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে শাহাদতবরণকারী সব শহীদদের প্রতি আবারও বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি- করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী সব রাজনৈতিক নেতা, চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীসহ সবার প্রতি।

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে যেভাবে বঙ্গবন্ধু একটি সচল, কার্যকরী, মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন, সেভাবেই বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন মাদার অব হিউম্যানিটি বিশ্বনেতা শেখ হাসিনা করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে মহাসংকটে পতিত বাংলাদেশকেও অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবেন; আলোর পথ দেখাবেন বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বকে- সেই প্রত্যাশা করি।

লেখক: অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগ ও কোষাধ্যক্ষ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

Related Articles

Back to top button