মতামত

করোনার টিকা প্রাপ্তি এবং বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

।। আ ব ম ফারুক ।।

আগামী অক্টোবরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার ও বায়োএনটেকের আবিষ্কৃত টিকা এফডিএর অনুমোদন পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত জুলাই মাসে টাইম ম্যাগাজিনকে ফাইজারের প্রধান নির্বাহী জানিয়েছিলেন, সব কিছু ঠিকঠাক চললে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাঁরা জানতে পারবেন তাঁদের টিকা কার্যকর কি না। ফেজ-৩ স্টাডি প্রায় সমাপ্তির পর এখন তাঁরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাঁদের টিকার কার্যকারিতার ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হয়েছেন।

এসব অগ্রগতির পরিপ্রেক্ষিতে এখন বাংলাদেশ কার কাছ থেকে কী পরিমাণ টিকা পাবে, তার কতগুলো বিনা মূল্যে, কতগুলো স্বল্প দামে আর কতগুলো বহির্বিশ্বের প্রচলিত বাজারদরে কিনতে হবে, তা হিসাব করার সময় চলে এসেছে। আমাদের ১৭ কোটি মানুষের জন্য সরকারের বিপুল পরিমাণ টিকার প্রয়োজন। তা সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কিন্তু মানুষ বাঁচানোর জন্য সরকারকে এই কঠিন কাজটিই সফলতার সঙ্গে করতে হবে। আবার শুধু টিকা সংগ্রহ করলেই হবে না। তার সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ, বিতরণ, টিকা দেওয়ার সিরিঞ্জ সংগ্রহ, দক্ষ লোকবল, আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাপনা—সবই অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।

পৃথিবী এবার যে মহামারির মুখোমুখি হয়েছে, তার বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম হলো যে প্রথমত, এবারের মহামারি পৃথিবীজুড়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে। কিন্তু আগের সবগুলো মহামারি ছিল কোনো কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে বিশ্বের সব দেশ একযোগে টিকা সংগ্রহ করতে মুখিয়ে আছে। ধনী দেশগুলো অগ্রিম টাকা দিয়ে কোটি কোটি ডোজের বিপুল পরিমাণ টিকা কিনে রাখছে, যাতে সেই কম্পানির টিকা বেরোনো মাত্র তারা তাদের দেশের মানুষকে তা দিতে পারে। ফলে আমাদের জন্য নগদ মূল্যে তাৎক্ষণিক টিকা কিনে নেওয়ার সুযোগ অনেক কম। দ্বিতীয়ত, এই টিকার দামও অনেক বেশি। আমাদের এখনো দরিদ্র দেশের কাতারে ধরে নিয়ে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গ্যাভি) এবং কোভ্যাক্স অ্যাডভান্স মার্কেট কমিটমেন্ট (এএমসি) ৫৭টি দেশকে কম মূল্যে অক্সফোর্ডের টিকা সরবরাহ করবে। সরকারের আগে থেকে উদ্যোগ গ্রহণের ফলে এটি একটি ভালো অর্জন। কিন্তু তা-ও দাম পড়বে একেকটি ২৫৪ টাকা। টিকার প্রকৃত দামের চেয়ে এই দাম অনেক কম। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক দরিদ্র মানুষের পক্ষে এই ব্যয় বহন করাও সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। অন্যান্য টিকার দাম আরো বেশি। কোনো কোনোটির দাম এখন পর্যন্ত ২০ থেকে ৩৪ মার্কিন ডলার। তৃতীয়ত, গ্যাভি ৫৭টি গরিব দেশের জন্য অক্সফোর্ড ও নোভাভ্যাক্সের কাছ থেকে ১০ কোটি টিকা কিনবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এই ১০ কোটিকে ৫৭টি দেশের মধ্যে ভাগ করলে আমরা যে পরিমাণ টিকা পাব, তা নিশ্চয়ই বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট নয়। তখন আবার অসাধু লোকজন যেন এ নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু না করে? চতুর্থত, করোনাভাইরাস এ পর্যন্ত সবচেয়ে ছোঁয়াচে এবং এর সংক্রমণের ফলে শরীরে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় তার স্থায়িত্ব নাকি মাত্র তিন মাস বা কিছু বেশি। ফলে যদি জনগণের বেশির ভাগকেও আমরা করোনার টিকা দিতে সক্ষম হই; কিন্তু কিছু মানুষ দারিদ্র্য, টিকার প্রতি অনাস্থা বা অন্য বিবিধ কারণে যদি টিকা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে করোনা আবারও টিকা দেওয়া ও না দেওয়া সবার মাঝে ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই দেশের সবাইকে এই টিকার আওতায় আনতে হবে। সরকারের জন্য কাজটি তাই অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে। তবে আমরা আশাবাদী যে সরকার এরই মধ্যে যতটুকু অগ্রসর হয়েছে এবং বিদেশের বিভিন্ন লবি ও সংস্থায় যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে, তাতে সরকার হয়তো আমাদের দেশে টিকার সর্বজনীন প্রয়োগকে নিশ্চিত করতে পারবে।

আমরা জেনেছি, সরকার দেশের কমপক্ষে ৮০ শতাংশ মানুষকে করোনার টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিজ্ঞানের নিয়মে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জন করতে হলে তা প্রয়োজন। কিন্তু ১৭ কোটি মানুষের জন্য ‘হার্ড ইমিউনিটি’ পেতে হলে ৮০ শতাংশ হিসাবে কমপক্ষে ১৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষকে টিকা দিতে হবে। সঙ্গে যদি স্বাভাবিক অবচয় হিসেবে কমপক্ষে আরো এক বা দুই কোটি টিকা যোগ করতে হয়, তাহলে পরিমাণটি প্রায় ১৫ বা ১৬ কোটিতে গিয়ে দাঁড়ায়। বিপুল এই পরিমাণের টিকা সংগ্রহ করা বর্তমানের বিরাজমান অবস্থায় আপাতদৃষ্টিতে হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ। সরকারকে এই হিমালয়সম সমস্যার সমাধান করতে হবে আবার সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে। সরকার যে ১০ হাজার কোটি টাকা রেখেছে করোনা ব্যবস্থাপনার জরুরি ব্যয় নির্বাহের জন্য, তা হয়তো প্রায় পুরোটাই লেগে যাবে। তারপর আনুষঙ্গিক ও অবকাঠামো তৈরির খরচ তো রয়েছেই। এই বিপুল পরিমাণ টিকা সংরক্ষণের প্রস্তুতির কাজটিও কিন্তু এখনই শুরু করতে হবে। কিন্তু টাকা থাকলেও এতগুলো টিকা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কিনতে পাব তো?

এ পরিপ্রেক্ষিতে বেক্সিমকো ফার্মা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একটি কাজ করেছে। এই সংকটের সময় তারা সিরাম ইন্ডিয়ার সঙ্গে অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা ‘কোভিশিল্ড’ আনার জন্য চুক্তি করেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য তাদের টিকা উৎপাদন করতে অ্যাস্ট্রাজেনেকা সিরাম ইন্ডিয়াকে দায়িত্ব দিয়েছে। বেক্সিমকো সিরামের কাছ থেকে বাংলাদেশের জন্য এক্সক্লুসিভ ডিস্ট্রিবিউটরশিপ পেয়েছে। তারা সারা বাংলাদেশের জন্য সিরাম ইন্ডিয়ার কাছ থেকে টিকা আনবে। এ জন্য সিরাম ইন্ডিয়াকে বেক্সিমকো ফার্মা অগ্রিমও প্রদান করেছে। সরকারি খাতের চাহিদার হিসাব তৈরি হচ্ছে। এরই মধ্যে বেসরকারি খাতে বিক্রি এবং মেডিক্যাল সেক্টরে চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তার-ফার্মাসিস্ট-নার্স-প্যারামেডিক্সদের জন্য বেক্সিমকো আপাতত পাঁচ কোটি টিকা আনার ব্যবস্থা করছে। সরকারের পক্ষ থেকে চাহিদার পুরো হিসাব করার পর তারা পরে আরো টিকা আনবে।

সিরাম ইন্ডিয়ার সঙ্গে বেক্সিমকো ফার্মার এক্সক্লুসিভ ডিস্ট্রিবিউটরশিপের আরো একটা ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সিরাম ইন্ডিয়া শুধু অক্সফোর্ডের টিকা নিয়েই নয়, তারা করোনারই আরো তিনটি টিকা উৎপাদন করবে। বেক্সিমকো সেসব টিকাও আনতে পারবে। ফলে বাংলাদেশে টিকার প্রাপ্তি নিয়ে দুশ্চিন্তা কিছুটা হলেও কমবে।

সরকার এরই মধ্যে আরেকটি ভালো কাজ করেছে। চীনের সিনোভ্যাক বায়োটেকের তৈরি করোনার টিকার ফেজ-৩ ট্রায়ালের একটি অংশ বাংলাদেশের ওপর করার জন্য তারা অনুমতি দিয়েছে। ঢাকার আইসিডিডিআরবি এই ট্রায়ালটি পরিচালনা করবে। এর ফলে চীন সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ট্রায়ালের পর ফলাফল সন্তোষজনক হলে এই টিকা অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও তার ব্যবহারের জন্য পাবে।

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী যেসব দেশের মাথাপিছু আয় বছরে চার হাজার মার্কিন ডলারের বেশি, তারা টিকা কিনে নেবে। আর যাদের তার চেয়ে কম তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছ থেকে বিনা মূল্যে টিকা পাবে। সেই হিসাবে বাংলাদেশের বিনা মূল্যেই করোনার টিকা পাওয়ার কথা। কিন্তু সমস্যা হলো, এখনো কোনো টিকা মানবশরীরে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়নি। তা ছাড়া যেহেতু সারা পৃথিবীর সব দেশই আক্রান্ত এবং ধনী দেশগুলো টিকার জন্য কম্পানিগুলোর কাছে অগ্রিম টাকা দিচ্ছে, অনেকটা আমাদের দেশের দাদন দেওয়ার মতো, সেহেতু টিকা বেরোলে আগে তারা পাবে, এরপর পাব আমরা বিনা মূল্যের দেশগুলো। যেহেতু কম্পানিগুলোর উৎপাদনের পরিমাণ ব্যাপক চাহিদার তুলনায় সীমিত, তাই এই টিকা পেতে অনেক দেরি হয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়। ফলে হয়তো বিনা মূল্যের টিকা এ বছর না-ও আসতে পারে।

কিন্তু বাংলাদেশ সরকার একটা কৌশলী কাজ করেছে। গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গ্যাভি) সংগঠনটির সদস্যপদ নিয়েছে এবং এর তহবিল গঠনে কিছু অনুদান দিয়েছে। এই তহবিল দিয়ে গ্যাভি কিছু টিকা কিনে তা গরিব দেশগুলোর মধ্যে বিনা মূল্যে বা স্বল্পমূল্যে বিতরণ করবে। এরই মধ্যে এখানে বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন উন্নত দেশ অনুদান দিয়েছে এবং তারা এই তহবিল দিয়ে অ্যাস্ট্রাজেনেকা এবং নভোভ্যাক্স থেকে টিকা কেনার উদ্যোগ নিয়েছে, যা ৫৭টি গরিব দেশের মধ্যে বিতরণ করা হবে। তার মানে, টিকা আবিষ্কারের পরপরই বাংলাদেশ প্রথম দিককার কিছু টিকা গ্যাভির মাধ্যমে পেয়ে যাবে।

সেই সঙ্গে যে ভারতের সঙ্গে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন রক্তের বন্ধন, তাদের কাছ থেকে তিনটি টিকার কিছু কিছু করে অনুদান আমরা নিশ্চয়ই প্রত্যাশা করি। গণচীনের যে টিকাটির ক্লিনিক্যাল স্টাডি এখানে করার জন্য সরকার অনুমোদন দিয়েছে, ফলাফল ইতিবাচক হলে সেটি এবং আরো যে দুটি টিকা চীনে পরীক্ষাধীন আছে, সেগুলো থেকেও কিছু টিকা আমরা বিনা মূল্যে পাওয়ার আশা করি। সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের কারণেই আমাদের এই প্রত্যাশা।

বাংলাদেশ সরকারের কাছে নিশ্চয়ই আমাদের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য রয়েছে এবং বিশ্বাস করি যে তারা সেভাবে উপরোক্ত সবগুলো সম্ভাব্য উৎসর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। এর বাইরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর ও কানাডার যে টিকাগুলো মানবশরীরে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে পরীক্ষাধীন রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কেও সরকার নিশ্চয়ই খোঁজখবর রাখছে।

করোনা মহামারির কারণে বিশ্ব একটা কঠিন সময় পার করছে। নতুন উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমরা বাংলাদেশও এর বাইরে নই। এই কঠিন সময়ে প্রতিটি দিন অত্যন্ত মূল্যবান। বিশেষ করে যখন বিভিন্ন দেশের টিকাগুলো আগামী মাস থেকে একে একে বাজারে আসার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। আমরা যতটুকু পারি কৌশলী হয়ে সময় ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারলে দেশের মানুষের জন্য টিকা সংগ্রহে বাংলাদেশ নিশ্চয়ই সফল হবে। সরকারের ওপর সে আস্থাটুকু আমরা রাখতেই পারি।

লেখক : অধ্যাপক ও পরিচালক, বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার; সাবেক চেয়ারম্যান, ফার্মেসি বিভাগ; সাবেক চেয়ারম্যান, ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ; সাবেক ডিন, ফার্মেসি অনুষদ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Related Articles

Back to top button