আন্তর্জাতিক

পাকিস্তানে ফের রাজনৈতিক দ্বৈরথের পদধ্বনি!

ব্রিট বাংলা ডেস্ক :: দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ধ্রুপদী উদাহরণ পাকিস্তানে বাড়ছে উত্তেজনা। ফের শোনা যাচ্ছে রাজনৈতিক দ্বৈরথের পদধ্বনি। সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কারণ, জোটবদ্ধ হয়ে সরকারের মুখোমুখি হচ্ছে প্রায়-সকল রাজনৈতিক দল। উদ্দেশ্য ক্ষমতার পালাবদল। মূল টার্গেট ইমরান খানকে গদি থেকে নামানো।
বিরোধী দলগুলোর গড়া জোটের নাম দেয়া হয়েছে ‘পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট’ (পিডিএম), যাতে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লিগ (পিএমএল-নওয়াজ) যেমন আছে, তেমনই রয়েছে ভূট্টো পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)। পাঞ্জাবভিত্তিক পিএমএল ও সিন্ধুভিত্তিক পিপিপি পাকিস্তানের রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রধান দাবিদার ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত, যারা এখন ইমরানের বিরুদ্ধে একাট্টা।

চলতি সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের প্রায়-সবগুলো বিরোধী দল নিয়ে গঠিত জোট ইমরান-বিরোধী আন্দোলনের ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে।

অবিলম্বে ইমরান খানের পদত্যাগ ও তাঁর সরকারকে উৎখাতের দাবিতে গঠিত রাজনৈতিক জোটের রূপরেখাও চূড়ান্ত হয়েছে। রূপরেখায় ইমরান বিরোধী আন্দোলনের তিনটি পর্যায়ের কথা জানিয়েছেন নেতৃবৃন্দ।

প্রথম পর্যায়ে আগামী অক্টোবর (২০২০) থেকে পর্যায়ক্রমিকভাব গোটা পাকিস্তানজুড়ে ইমরানের তেহরিক-ই-ইনসাফ দলীয় সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলবে বিরোধী দলগুলো। ডিসেম্বরে হবে দ্বিতীয় পর্যায়ের আন্দোলন, সভা, সমাবেশ ও গণসংযোগ । দাবি আদায়ে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে গোটা দেশ থেকে রাজধানী ইসলামাবাদমুখী বিশাল পদযাত্রার আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে চূড়ান্ত ধাপে। তদুপরি, আইনসভায় বিরোধী জোটের দলগুলো সরকারের সঙ্গে অসহোযিতা নীতি বজায় রাখবে।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে ক্রিকেট ময়দান থেকে ‘প্লেবয় ইমেজ’ নিয়ে ক্ষমতার শীর্ষে আসা পাঞ্জাবি ইমরান খানের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ‘ইমরান খান জালিয়াতি করে নির্বাচনে জিতেছিলেন। জনগণ নয়, খানের ক্ষমতারোহণে সহায়তা করেছিল পাকিস্তানের রাজনীতি-ঘনিষ্ঠ সেনাবাহিনী। ফলে এই সরকার গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত নয়, সামরিক মদদপুষ্ট পুতুল মাত্র।’
পাকিস্তানের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল, যারা ইমরান বিরোধী আন্দোলনে জোটবদ্ধ, তারা মনে করে যে, গণতন্ত্রের স্বার্থে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনার প্রভাব আর চলতে দেয়া উচিত নয়। কারণ, পাকিস্তানের রাজনীতি বার বার সেনা হস্তক্ষেপে ‘বরবাদ’ হয়েছে, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা ‘নাস্তানাবুদ’ হয়েছে। ফলে রাজনীতিতে সামরিক প্রভাব ‘খতম’ (শেষ) করতে হবে।

আন্দোলনে শরিক বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে, ‘পাকিস্তানে গণতন্ত্রের প্রয়োজনে আনতে হবে নতুন দায়বদ্ধতামূলক আইন, যাতে সেনানিবাসের পক্ষে রাজনীতিতে অনুপ্রবেশের রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ হয়।’ পাশাপাশি তারা ‘স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পাকিস্তানের নির্বাচন ব্যবস্থাকেও সংস্কার’ করার জোরালো দাবি উত্থাপন করেছেন।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে পিএমএল-পিপিপি দ্বি-দলীয় মেরুকরণে তৃতীয় শক্তি হিসেবে সামরিক ছত্রছায়ায় ক্ষমতায় এসেছে ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ। এটা সম্ভব হয়েছে পিএমএল ও পিপিপি’র মধ্যকার তীব্র লড়াই ও বৈরীতার সুযোগে। কিন্তু এবার পিএমএল-পিপিপি মিলে ইমরান বিরোধী বৃহত্তর জোট তৈরি করার পর পুরো পাকিস্তানের রাজনৈতিক দৃশ্যপটই পাল্টে গেছে। সেখানে এখন দেখা দিয়েছে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ, যার একদিকে প্রায়-সকল রাজনৈতিক দল আর অন্যদিকে সামরিক সমর্থনপুষ্ট, ক্ষমতাসীন ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টি।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীকে চিহ্নিত করা হয় প্রধান নিয়ামক শক্তি হিসেবে। ‘জনমত বা ভোট নয়, পাকিস্তানের রাজনীতি চালায় আর্মি’, কথাটি পাকিস্তানের ক্ষেত্রে প্রবাদের মতো সত্য। শুধু রাজনীতিই নয়, অর্থনীতির বড় অংশীদারও আর্মি, যাদের কব্জায় দেশের বড় বড় শিল্প ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এমনকি, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র নীতি কেমন হবে, বিশ্বে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব আর কার সঙ্গে শত্রুতা থাকবে, এমন বিষয়ও ঠিক করে দেয় সেনাবাহিনী।

১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই বার বার রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ ও আর্মি কর্তৃক ক্ষমতা দখলের কারণে পাকিস্তানে গণতন্ত্র বিকশিত হতে ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পেতে পারেনি। অনেকবার সামরিক-বেসামরিক চক্রান্তে ভণ্ডুল হয়েছে পাকিস্তানের গণতন্ত্রের সম্ভাবনা ও জনগণের অধিকার। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাস গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে সামরিক দৌরাত্ম্যে কলুষিত।

১৯৭১-পরবর্তী পর্যায়েও সামরিক প্রাধান্য পাকিস্তানে হ্রাস না পেয়ে বরং বেড়েছে। অনেক নির্বাচিত নেতা জান্তার হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। নির্বাচনের গণরায় বারবার পদদলিত করা হয়েছে সামরিক বুটের তলায়। আর্মির পছন্দ না হলে বা আর্মির সঙ্গে ‘জ্বি-হুজুর’ আচরণের সম্পর্ক না রাখা হলে সরকার ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার অনেক দৃষ্টান্ত আছে পাকিস্তানে। সরাসরি ক্ষমতা দখল ছাড়াও সরকারকে প্রচ্ছন্নভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাকিস্তান আর্মি কখনোই ভুল করে না । ভুট্টো, বেনজির এবং নওয়াজ শরিফের সঙ্গে তেমনি আচরণ করেছে আর্মি এবং নিজেদের আস্থার মানুষ হওয়ায় জনপ্রিয় খেলোয়াড় অথচ অখ্যাত রাজনীতিবিদ ইমরান খানকে তুলে এনেছে ক্ষমতার শীর্ষে।

ইমরান-বিরোধী আন্দোলনে ব্যক্তি ইমরানের পতনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতি থেকে সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণ হ্রাসের নীতিগত বিষয়টিও জড়িত। যাতে মতপার্থক্যের দূরত্ব ডিঙিয়ে একসাথে হয়েছে প্রায়-সকল রাজনৈতিক দল। জোটের আত্মপ্রকাশের সভায় নওয়াজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লিগ বড় শরিক হলেও দলের নেতা নওয়াজ শরিফ উপস্থিত ছিলেন না। কারণ তিনি দেশছাড়া এবং গত বছরের নভেম্বর থেকে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে। ভিডিওর মাধ্যমে ভাষণ দিয়েছেন তিনি। তার পক্ষে বৈঠকে ছিলেন তার মেয়ে মরিয়ম নওয়াজ। হাজির ছিলেন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি এবং জেইউআইএফ-এর প্রতিনিধিও।

জোট গঠন ও আন্দোলন সম্পর্কে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বক্তব্য। নওয়াজ শরিফ বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার দেশ চালাবে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। তারাই দেশের অর্থনীতি ঠিক করবে। বিদেশ নীতিও তারা ঠিক করবে। প্রধানমন্ত্রীর পদে ইমরান অযোগ্য। তাঁকে সেনাবাহিনীই প্রধানমন্ত্রী করেছে এবং দেশ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। তাই আমরা আগে সেনার কবল থেকে দেশকে উদ্ধার করতে চাই।’ পিপিপি নেতা প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি বলেছেন, ‘বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করতেই যাবতীয় পদক্ষেপ করছে ইমরান প্রশাসন। তাই আন্দেলনের বিকল্প নেই।’ অন্যদিকে তরুণ, উদীয়মান নেতা বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির সাফ বক্তব্য হলো, ‘রাজনীতিতে সেনার কোনো ভূমিকা থাকবে না।’

ফলে ইমরান শাসিত সরকার ও সামরিক প্রাধান্যের বিরুদ্ধে পাকিস্তানে জোরদার আন্দোলন হচ্ছে বলেই ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকগণ। কিন্তু একটি আশঙ্কা কাজ করছে সবার মধ্যেই। তা হলো, পাকিস্তানের অভিজ্ঞতায় কে কখন আর্মির ‘টোপ গিলে’ তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। তখন আন্দোলন মাঠে মারা যায় আর নতুন দোসর নিয়ে আর্মি পর্দার আড়ালে থেকে ঠিকই কলকাঠি নাড়ে। বন্ধ হয় না ক্ষমতার রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ।

সামনে দিনগুলোতে স্পষ্ট হবে পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলোর সদ্য-জোটবদ্ধ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য । প্রমাণ হবে, তারা সত্যিসত্যিই রাজনীতি থেকে সামরিক হস্তক্ষেপের চির অবসান চান, নাকি আন্দোলনের মাঠ গরম করে আর্মির পার্টনার হয়ে ক্ষমতার ভাগ চান!

Related Articles

Back to top button