আইএফসির ‘বাংলাদেশীয় প্রধান’ ১৬ বছরের মহুয়া

ব্রিট বাংলা ডেস্ক :: আইএফসির পুরো অর্থ হলো ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আর্থিক প্রতিষ্ঠান এটি। বিশ্বের নানা দেশে এর কাজ। ঢাকার গুলশানে সুরম্য এক বাড়িতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়। বাংলাদেশে এ সংস্থার প্রধান ওয়েন্ডি ওয়ার্নার। তিনি মার্কিন নাগরিক। তাঁর এ পদেই কিনা বসল ঢাকার শ্যামপুরের ম্যাচ ফ্যাক্টরি এলাকার মেয়ে একাদশ শ্রেণির ছাত্রী মহুয়া আকতার! ওর ডাকনাম লতা। ১৬ বছরের মেয়েটির আইএফসির প্রধান হওয়া ওর নিজের কাছেই ছিল বিস্ময়ের ব্যাপার।

মহুয়া আখতার কিন্তু আইএফসির প্রধান হয়েছিল এক দিনের জন্য। তাতে কী? বিশাল অফিসটির এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া কি চাট্টিখানি কথা। মহুয়াও বলছিল, ‘কখনো ভাবিনি এমন সুযোগ হবে।’

মহুয়ার মতো অসংখ্য কিশোরীর স্বপ্নসম্ভব বিষয়কে বাস্তব রূপ দিতেই এই আয়োজন। আয়োজক, শিশুদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল। ৪ অক্টোবর মহুয়া দায়িত্ব নিয়েছিল আইএফসির। উপলক্ষ, আজ ১১ অক্টোবরের আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। আর এই আয়োজনকে প্ল্যান বলছে ‘গার্লস টেকওভার’। এটি একটি বৈশ্বিক কার্যক্রম। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ ১১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকেই বিশ্বব্যাপী ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস হিসেবে পালন উপলক্ষে গার্লস টেকওভারের আয়োজন করা হয়ে থাকে। ২০১৬ সাল থেকে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল এই কার্যক্রম শুরু করেছে।

প্ল্যানের কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট আলিম বারী বললেন, ‘এই “গার্লস টেকওভার” কর্মসূচির মাধ্যমে একজন কিশোরী অথবা যুবা নারীকে নেতৃত্ব প্রদানকারীর ভূমিকা পালন করতে সহায়তা করা হয়। যাতে তার মধ্যে একটি স্বপ্ন তৈরি হয়, তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে, সে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। যখন সে পেশাগত দায়িত্ব গ্রহণ করবে, তখন যেন ওই নেতৃত্ব প্রদানকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে।’

আলিম জানান, বিশ্বব্যাপী ৬০টি দেশে হাজারের বেশি গার্লস টেকওভার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যার মূল উদ্দেশ্যই মেয়ে ও যুবা নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, নেতৃত্বদানকারী এবং পরিবর্তনের রূপকার হিসেবে একজন মেয়ে বা যুবা নারী কী করতে পারেন, তা তুলে ধরা। আর মেয়েদের এসব জায়গায় দেখতে যাতে সমাজের মানুষের মানসিকতারও পরিবর্তন হয়, সেটাও একটি উদ্দেশ্য।

প্ল্যানের ঢাকা কার্যালয় এ কাজ করার জন্য আইএফসিকে অনুরোধ করলে তারা সাদরে প্রস্তাব গ্রহণ করে। রাজি হয় নারায়ণগঞ্জ সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী মহুয়াকে আইএফসির এক দিনের প্রধান করতে।

মহুয়া আগে থেকেই প্ল্যানের শিশু সুরক্ষা দলের সঙ্গে ছিল। কিশোরীদের নিয়ে প্ল্যান এমন দল গঠন করে। বাল্যবিবাহ রোধ, মেয়েশিশুর অধিকার নিয়ে এসব দল কাজ করে। সেই মহুয়াকে খানিকটা শিখিয়ে-পড়িয়েই আনিয়েছিল প্ল্যান কর্তৃপক্ষ আইএফসির ‘দেশীয় প্রধান’ হওয়ার জন্য। তবে যতই শেখানো-পড়ানো হোক, নানা নিরাপত্তায় ঘেরা ঝকঝকে অফিসটিতে ঢুকে মহুয়ার কিন্তু বুক দুরুদুরু করছিল। মহুয়া তা স্বীকার করে বলল, ‘একটু ভয় তো লাগছেই।’

৪ অক্টোবর সকালে আইএফসির কার্যালয়ে ঢোকার খানিক পরে মহুয়ার এই ভীতি কিন্তু কমে যায়। যাঁর পদ সে ‘দখল’ করবে, সেই ওয়েন্ডি ওয়ার্নার খোদ এসে বরণ করলেন নতুন দেশীয় প্রধানকে। মহুয়াকে বললেন, ‘তোমার মতো কিশোরী তো আমিও ছিলাম। আজ এ পদে এসেছি। তুমিও পারবে।’আইএফসির বাংলাদেশীয় প্রধান ওয়েন্ডি ওয়ার্নারের চেয়ারে বসে আছে কিশোরী মহুয়া আকতার। ছবি: প্রথম আলোকথা বলে ওয়েন্ডি চলে গেলেন। আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ তখনো শুরু হয়নি। মহুয়া এবার ‘তার অফিস’ ঘুরে ঘুরে আইএফসির ঢাকা কার্যালয়ের কর্মীদের সঙ্গে পরিচিত হতে লাগল। খুদে নতুন অফিসপ্রধান পেয়ে খুশি আইএফসির প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট নাদিয়া ইসলাম। বললেন, ‘ধারণাটি অভিনব আর এর বড় একটি প্রভাব আছে। নিশ্চয়ই মহুয়াকে দেখে অন্যরা অনুপ্রাণিত হবে।’

আইএফসির কার্যালয়ে দেশীয় প্রধান ওয়েন্ডির ঘরে ঢুকে পড়ল মহুয়া। ওয়েন্ডি এসে ওকে অভিনন্দন জানালেন। ছেড়ে দিলেন নিজের আসন। ওয়েন্ডির আসনে বসে মহুয়া জানতে পারল আইএফসির নানা কার্যক্রম। মহুয়ার শুনেছে, আইএফসি বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান। কিশোরীর তাই প্রশ্ন, ‘আমরা যেমন ব্যাংকে টাকা রাখি, এখানেও কি এভাবে রাখা যায়?’

ওয়েন্ডি জানান, আইএফসি এমন ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর বেসরকারি পর্যায়ে উন্নয়ন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ ও পরামর্শ দেয়। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে, তৈরি পোশাক খাতে এবং ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কাজ করে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে অনেক বিনিয়োগ করেছে সংস্থাটি। ওয়েন্ডি বছর ১৫ আগেও আইএফসিরই অন্য দায়িত্বে এই বাংলাদেশেই ছিলেন। বলেন, ‘সেই সময়ের বাংলাদেশের সঙ্গে আজকের বাংলাদেশের অনেক পার্থক্য। এ সময়ে বাংলাদেশ আর্থসামাজিক নানা খাতে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে।’

প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানার পর মহুয়া নিজের সম্পর্কেও জানায়। কেমন করে নগরের একটি প্রান্তে বাস করে ওরা নানা সচেতনতামূলক কাজ করে তা শোনায়। জানায়, ওদের দল দুটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছে। এ কথা শুনে ওয়েন্ডির চোখ কপালে ওঠে। এই সাহসী আচরণ বজায় রাখতে বলে মহুয়াকে।

পদ ছেড়ে দিয়ে কেমন লাগছে? হাস্যোজ্জ্বল ওয়েন্ডির উত্তর, ‘নতুন দেশীয় প্রধান অনেক স্মার্ট।’ ওয়েন্ডি বিশ্বের নানা দেশে কাজ করেছেন। তবে এমন অভিজ্ঞতা তাঁর এই প্রথম বলে জানালেন। বললেন, ‘এটি প্রতীকী হলেও এর গুরুত্ব অনেক। আজ মহুয়ার এ ঘটনা অনেক শিশুকে অনুপ্রাণিত করবে।’

যেদিন মহুয়া আইএফসির দায়িত্ব পেল, সেদিনই একটি হোটেলে (যেখানে আইএফসির বিনিয়োগ আছে) দেশীয় প্রধানের পরিদর্শন ছিল। নতুন দেশীয় প্রধান মহুয়া সেখানে যায়। দেখভাল করে তাদের প্রকল্প। এ ছাড়া ওয়েন্ডি সারা দিন সচরাচর যা করেন, তার সঙ্গেও পরিচিত হয়।

দিনভর নতুন এই দেশীয় প্রধান পেয়ে খুশি আইএফসির কমিউনিকেশন অফিসার শেহ্জীন চৌধুরী। তিনি বলছিলেন, ‘সবচেয়ে ভালো লেগেছ মহুয়ার আত্মবিশ্বাস। মহুয়া সমাজের খুব সুবিধাভোগী অংশের প্রতিনিধিত্ব করে না। কিন্তু ওর গ্রহণ করার ক্ষমতা, শেখার আগ্রহ আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করেছে।’

প্ল্যান সূত্র জানায়, গত বছর প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ দেশব্যাপী ১৮টি গার্লস টেকওভার কার্যক্রমে সহায়তা করেছে। এর মধ্যে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী লার্স লেকে রাসমুসেনের দায়িত্ব প্রতীকীভাবে নেয় বাংলাদেশে প্ল্যানের দুই যুবা কর্মী মাইশা ও ফারজানা। এ ছাড়া বিভিন্ন স্তরের সরকারি কর্মকর্তা, সংবাদপত্রের সম্পাদক, প্রেসক্লাব সভাপতি, শিক্ষকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পদে ভূমিকা পালন করেছে মহুয়ার মতো কিশোরীরা।

আইএফসিতে সারা দিন দায়িত্ব পালন করে কেমন লাগল? মহুয়ার উত্তর, ‘আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। এখন বন্ধুদের অভিজ্ঞতার কথা বলব। এত বড় জায়গায় আমরা যে–কেউ আসলে যেতে পারি।’

Leave a Reply

More News from জাতীয়

More News

Developed by: TechLoge

x