সিলেটের অভিষেক টেস্টে বাংলাদেশের পরাজয়ের বিষাদ

সিলেট অফিস :: সিলেটের আকাশের আজ মন খারাপ। সকাল থেকেই সাদা-কালো মেঘের ভেলা উড়ছিল আকাশে। যেন মেঘ থমথম করে। আকাশ কী আগেই টের পেয়েছিল কিছু?

বাংলাদেশের পরাজয়ের বিষাদে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষিক্ত হলো সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম। এই বিষাদে যেন সমব্যথী আকাশও!

মঞ্চ প্রস্তুত ছিল। গ্যালারিতে হাজার দশেক দর্শক। ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ বলে স্লোগান। সাজানো মঞ্চে বীরের বেশে অভিবাদন গ্রহণ করবে বাংলাদেশ, এর চেয়ে বেশি চাওয়া ছিল না কারোরই। সেই মঞ্চ তছনছ করে বীরের বেশে উল্লাস করলো জিম্বাবুয়ে!

তাও দীর্ঘ ১৭ বছর পর! ২০০১ সালের পর বিদেশের মাটিতে টেস্ট জয়ের উল্লাস করলো জিম্বাবুয়ে। আর পাঁচ বছর পর জিতলো টেস্ট ম্যাচ।

১৫১ রানের জয়ে দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজে ১-০’তে এগিয়ে গেল জিম্বাবুয়ে। বাংলাদেশের অপেক্ষা এখন টেস্ট সিরিজে হার ঠেকানোর।

প্রথম ইনিংসে ১৪৩ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬৯। ব্যাটসম্যানরা দ্বিতীয় ইনিংসে ২৬ রান বেশি করতে পেরেছেন। বাংলাদেশ তাহলে ব্যাটিংয়ে উন্নতিই করেছে!

জিম্বাবুয়ে প্রথম ইনিংসে করে ২৮২ রান। বাংলাদেশ দুই ইনিংসে জিম্বাবুয়ের চেয়ে মাত্র ৩০ রান বেশি (৩১২) করেছে। তফাৎটুকু এখানেই পরিষ্কার। জিম্বাবুয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ১৮১ রানে অলআউট হলেও প্রথম ইনিংসে এগিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতায় লিড পেয়েছিল ৩২০ রানের।

যে দল প্রথম ইনিংসে ১৪৩ রানে অলআউট হয়, সে দলের কাছে ৩২০ তো পাহাড়সমই হওয়ার কথা। তবু আশায় ছিল বাংলাদেশ, মাহমুদউল্লাহ-লিটনরা দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয়ে রাঙাবেন সিলেটের অভিষেক টেস্ট। আশার বাণী শুনিয়েছিলেন কোচ স্টিভ রোডস, ব্যক্তিগত রেকর্ডে ম্যাচ স্মরণীয় করে রাখা তাইজুল ইসলামরা। কিন্তু আশার বাণী যেন নিরবে নিভৃতেই কাঁদলো!

৩২০ রান তাড়া করতে গিয়ে ১৬৯ রানেই ভেঙে পড়লো বাংলাদেশের ব্যাটিং মেরুদ-। এতে অবশ্য বিস্ময়ের কিছু নেই, যখন জানবেন এই দল সিলেট টেস্টের দুই ইনিংসসহ সর্বশেষ ৮ ইনিংসেই দুইশ’ রানের ঘরেও পৌঁছাতে পারেনি!

এই ব্যাটিং ব্যর্থতার কী কোনো অজুহাত হয়? ম্যাচ শেষে অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ কোনো অজুহাত দাঁড় করাে চাইলেন না, ‘এই ব্যর্থতার কোনো অজুহাত হয় না। আমাদেরকে অবশ্যই ভালো পারফর্ম করতে হবে। কেন এমনটা হচ্ছে, তাও খোঁজে বের করতে হবে।’

টেস্ট ক্রিকেটকে বলা হয় ধৈর্যের চরম পরীক্ষা। চাপের মুখে যারা টিকে থাকতে পারেন, তারাই হন বিজয়ী। বাংলাদেশ সেই চাপই যেন নিতে পারছে না! ধৈর্যের পরীক্ষায় আরো একবার ব্যর্থ হয়ে সিলেট টেস্টে সাড়ে তিন দিনেই বিব্রতকর হার মানতে হয়েছে।

আজ লাঞ্চের আগেই স্বাগতিকদের পাঁচ উইকেট তুলে নিয়ে জয়ের সুবাতাসই পাচ্ছিল জিম্বাবুয়ে। ১১১ রানে লাঞ্চে যাওয়া বাংলাদেশকে জিততে হলে করতে হতো আরো ২১০ রান। লাঞ্চের পর মুশফিকরা করতে পারলেন আর মাত্র ৫৮ রান! বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটিতে রান এসেছিল ৫৬। এরপর আরো ১১৩ রান যোগ করতেই বাকি ৯ উইকেট শেষ।

কাল সোমবার ম্যাচের তৃতীয় দিন শেষ বিকেলে লিটন দাস আর ইমরুল কায়েস মিলে ২৬ রানের জুটি গড়ে জয়ের লক্ষ্যটা নামিয়ে এনেছিলেন ২৯৫ রানে। আজ মঙ্গলবার পুরো দশ উইকেট নিয়েই খেলতে নামে বাংলাদেশ।

লিটন ব্যক্তিগত ২১ রানে সিকান্দার রাজার বাড়তি টার্নের বলে শর্ট লেগে ক্যাচ দিয়েছিলেন। নিতে পারেননি ব্রায়ান চারি। আর ইমরুল যখন ২২ রানে, কাইল জার্ভিসের বলে ঠিকমতো কাট করতে না পেরে ক্যাচ দিয়েছিলেন প্রথম স্লিপে। মুঠোয় নিতে পারেননি হ্যামিল্টন মাসাকাদজা।

তবে জীবন পেয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। দলের রান তখন ৫৬, ইমরুল-লিটনের উদ্বোধনী জুটিও জমে ওঠেছিল। অফ স্পিনার সিকান্দার রাজার স্টাম্পের বল মিড উইকেট দিয়ে পুল করতে চেয়েছিলেন লিটন। মিস করে বসেন। এলবিডব্লিউর আবেদনে আম্পায়ার নিরব থাকলে রিভিউ নেয় জিম্বাবুয়ে। সফল রিভিউয়ে উল্লাসে মাতে সফরকারীরা।

যে বল ছাড়তে পারতেন, সেই বলে ব্যাট পেতে দিলেন মুমিনুল হক। কানায় লেগে বল ভেঙে দেয় স্টাম্প। মুমিনুল ফিরলেন ৯ রানে, দলের রান তখন ৬৭।

জীবন পাওয়ার পর সতর্ক হয়েই খেলছিলেন ইমরুল কায়েস। কিন্তু ধৈর্য ধরে রাখতে পারলেন না তিনিও। সিকান্দার রাজার ফুল লেংথ বলে অপ্রয়োজনীয় প্যাডেল সুইপ করতে গিয়ে ব্যর্থ হন ইমরুল। তার গ্লাভসে লেগে বল স্টাম্প ছত্রখান করে দেয়। দলের ৮৩ রানে ফেরা ইমরুলের রান তখন ৪৩।

এরপর দলের ১০২ রানে আরো একবার আত্মহুতি দিলেন দলনায়ক মাহমুদউল্লাহ। সিকান্দার রাজার বলে সুইপ করবেন নাকি ডিফেন্ড, এই দ্বিধায় অদ্ভূতুড়ে শট খেলতে যেয়ে ব্যাটে-বলে করতে পারেননি। তার গ্লাভসে ছুঁয়ে শরীরে লেগে বল যায় শর্ট লেগে থাকা বদলি ফিল্ডার ক্রেইগ আরভিনের কাছে। ভুল হয়নি আরভিনের, বিদায় নেন মাহমুদউল্লাহ (১৬)।

গেল বছরের জানুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে অভিষেক হয়েছিল শান্তর। এরপর দীর্ঘদিন শেষে তিনি এবার ফিরেছেন স্কোয়াডে। সুযোগ ছিল কাজে লাগানোর কিন্তু তিনিও ব্যর্থ। প্রথম ইনিংসে ৫ রান করা শান্ত এবার ১৩ রান। লাঞ্চের ঠিক আগে ব্রেন্ডন মাভুটার বলে বাজে শটে সিকান্দার রাজার হাতে ক্যাচ দিয়ে দলকে আরো বিপদে ডুবিয়ে যান শান্ত।

লাঞ্চের পর লেগ স্পিনার ব্রেন্ডন মাভুটাকে সুইপ করতে গিয়ে ডিপ স্কয়ার লেগে ওয়েলিংটন মাসাকাদজার হাতে ক্যাচ তুলে দেন মুশফিক (১৩)। মাভুটার বলেই রেজিস চাকাভার হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরেন মেহেদি হাসান মিরাজও (৭)। ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে লং অনে ওয়েলিংটন মাসাকাদজার বলে ব্রেন্ডন টেইলরের হাতে ক্যাচ তুলে দেন তাইজুল ইসলাম (০)। ওয়েলিংটনের এটি প্রথম টেস্ট উইকেট। উইকেটে এসে প্রথম বলেই মাভুটার চতুর্থ শিকারে পরিণত হন নাজমুল ইসলাম অপু।

প্রথম ইনিংসের মতো দৃঢ়তা দেখিয়ে যাচ্ছিলেন অভিষিক্ত আরিফুল হক। কিন্তু ৯ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর স্কোরবোর্ডে বাড়তি কিছু রান যোগ করতে গিয়ে ওয়েলিংটনের দ্বিতীয় শিকার হন তিনিও (৩৮)।

ব্যাটিং ব্যর্থতায় পরাজয়। তবে ম্যাচে ১১ উইকেট নিয়ে এই টেস্টকে স্মরণীয় করে রেখেছেন তাইজুল ইসলাম।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:
জিম্বাবুয়ে প্রথম ইনিংস: ২৮২/১০, ১১৭.৩ ওভার। শেন উইলিয়ামস ৮৮, পিটার মুর ৬৩*, হ্যামিল্টন মাসাকাদজা ৫২, চাকাভা ২৮, সিকান্দার রাজা ১৯, ব্রায়ান চারি ১৩, ব্রেন্ডন টেইলর ৬, ওয়েলিংটন মাসাকাদজা ৪, ব্রেন্ডন মাভুটা ৩, কাইল জার্ভিস ৪, চাতারা ০। তাইজুল ইসলাম ৬/১০৮, নাজমুল ইসলাম অপু ২/৪৯, আবু জায়েদ রাহী ১/৬৮, মাহমুদউল্লাহ ১/৩।

বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ১৪৩/১০, ৫১ ওভার। লিটন দাস ৯, ইমরুল কায়েস ৫, মুমিনুল হক ১১, নাজমুল হোসাইন শান্ত ৫, মাহমুদউল্লাহ ০,মুশফিকুর রহিম ৩১, আরিফুল হক ৪১*, মিরাজ ২১, তাইজুল ইসলাম ৫, নাজমুল ইসলাম অপু ৪, আবু জায়েদ রাহী ০। কাইল জার্ভিস ২/২৮, চাতারা ৩/১৯, সিকান্দার রাজা ৩/৩৫, শেন উইলিয়ামসন ১/৫।

জিম্বাবুয়ে দ্বিতীয় ইনিংস: ১৮১/১০, ৬৫.৪ ওভার। হ্যামিল্টন মাসাকাদজা ৪৮, ব্রায়ান চারি ৪, ব্রেন্ডন টেইলর ২৪, শেন উইলিয়ামস ২০, সিকান্দার রাজা ২৫, পিটার মুর ০, চাকাভা ২০, ওয়েলিংটন মাসাকাদজা ১৭, মাভুটা ৬, কাইল জার্ভিস ১*, চাতারা ৮। মিরাজ ৩/৪৮, তাইজুল ৫/৬২, অপু ২/২৭।

বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস: ১৬৯/১০, ৬৩.১ ওভার। লিটন ২৩, ইমরুল ৪৩, মুমিনুল ৯, মাহমুদউল্লাহ ১৬, শান্ত ১৩, মুশফিক ১৩, আরিফুল হক ৩৮, মিরাজ ৭, তাইজুল ০, অপু ০, রাহী ০*। সিকান্দার রাজা ৩/৪১, জার্ভিস ১/২৯, মাভুটা ৪/২১, ওয়েলিংটন ২/৩৩।

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x