মতামত

ইশতেহারে উপেক্ষিত ক্ষুদ্র জাতিসত্তা

মঙ্গল কুমার চাকমা :: জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল ও জোট একে একে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ঘোষিত ইশতেহারগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ইশতেহার ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রার বাংলাদেশ’। ওই ইশতেহারে ‘৩.২৯ ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অনুন্নত সম্প্রদায়’ শিরোনামে সমস্যার একটি পটভূমি রয়েছে। এ বিষয়ে ছয়টি ‘সাফল্য ও অর্জন’ দেখানো হয়েছে এবং সবশেষে ভবিষ্যৎ ‘লক্ষ্য ও পরিকল্পনা’র অংশে পাঁচটি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য ও পরিকল্পনার অংশে প্রতিশ্রুতির মধ্যে নতুনত্ব হচ্ছে জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন ও সংখ্যালঘু বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন। আর সমতলের নৃগোষ্ঠীর জমি-জলাধার-বনের অধিকার, ভূমি কমিশন গঠন, সব ধরনের বৈষম্যমূলক আইন ও অন্যায় ব্যবস্থার অবসান, সংস্কৃতি ও জীবনধারার স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ ইত্যাদি। এগুলো বস্তুত ২০০৮ ও ২০১৪ সালের আগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির পুনরুল্লেখ মাত্র।

সাফল্য ও অর্জন অংশে ‘সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জমি, জলাধার ও বন এলাকায় অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে’ এবং ‘ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জমি, বসতভিটা, বনাঞ্চল, জলাভূমি ও অন্যান্য সম্পদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে’ মর্মে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে গত ১০ বছরেও সমতলের আদিবাসীদের জন্য ভূমি কমিশন গঠন করা হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে বড় উদ্বেগের বিষয় যে ‘লক্ষ্য ও পরিকল্পনা’র মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ নেই। চুক্তি স্বাক্ষরকারী দলের ইশতেহারে চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি না থাকা উদ্বেগজনক। অপরদিকে সাফল্য ও অর্জন অংশে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে চুক্তির বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী বিভিন্ন বিষয় আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদের নিকট ন্যস্ত করা হয়েছে’ এবং ‘ক্ষমতায়নের এই ধারা চুক্তির শর্তানুযায়ী অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে’ বলে উল্লেখ রয়েছে। অথচ এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে এসব পরিষদে সাধারণ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, পুলিশ (স্থানীয়), ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, বন ও পরিবেশ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদি স্বশাসনের অনেক বিষয় ও কার্যাবলি এখনো ন্যস্ত করা হয়নি। দুঃখের বিষয়, চুক্তির পর ২১ বছর ধরে এসব পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগই নেওয়া হয়নি।

পর্যটনশিল্পসহ পার্বত্য জেলাগুলোর উন্নয়নে ইতিমধ্যে বেশ কিছু প্রকল্প গ্রহণ, পার্বত্য অঞ্চলে ভূমি অধিগ্রহণকালে সমতল ভূমির মতো বাজারমূল্যের তিন গুণ ক্ষতিপূরণ প্রদান সিদ্ধান্তের কথা ‘সাফল্য ও অর্জন’ হিসেবে ইশতেহারে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু যেখানে চুক্তিতে বিধৃত স্বশাসনের অধিকারগুলো বাস্তবায়িত হয়নি এবং পরিপ্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত পরিষদগুলো অনেকটা অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।
সর্বোপরি নৃগোষ্ঠীর স্বভূমি থেকে ক্রমাগত উচ্ছেদ ও ভূমি জবরদখল এবং মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে, সেখানে পার্বত্যাঞ্চলে শুধু উন্নয়নের কথা বলার অর্থ হচ্ছে রাজনৈতিক সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়া।

এক যুগ ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকা অন্যতম দল বিএনপির ইশতেহারে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়’ শিরোনামে দুটি লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলো হলো ‘পাহাড়ি ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম ও মর্যাদা সুরক্ষা করা হবে। অনগ্রসর পাহাড়ি ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর চাকরি ও শিক্ষাক্ষেত্রে সকল সুবিধা এবং পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা হবে’ এবং ‘দল, মত, জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে ক্ষুদ্র-বৃহৎ সকল জাতিগোষ্ঠীর সংবিধান প্রদত্ত সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মকর্মের অধিকার এবং জীবন, সম্ভ্রম ও সম্পদের পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করা হবে। এ লক্ষ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।’

অন্যদিকে আগের মতো এবারের ইশতেহারেও বিএনপি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন, সমতলের নৃগোষ্ঠীর ভূমি অধিকারের মূল বিষয়গুলো সযত্নে এড়িয়ে গেছে। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের বিরোধিতা করেছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে পার্বত্য চুক্তি বাতিল করবে মর্মে ১৯৯৭ সালে চুক্তি স্বাক্ষরকালে ঘোষণা করলেও ২০০১ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে বিএনপি অবশ্য চুক্তিটি বাতিল করেনি। তবে চারদলীয় জোট সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে নানাভাবে ক্ষুণ্ন করে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘২৭. ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শিরোনামে উল্লেখ করা হয়, ‘সংখ্যালঘুদের মানবিক মর্যাদা, অধিকার, নিরাপত্তা এবং সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় ন্যূনতম ঘাটতি খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো রকম হামলার বিচার হবে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সংস্কৃতি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে’। সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো রকম হামলার বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের লক্ষ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক উপায়ে ও জাতীয়ভাবে সমাধানের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়েও ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।

জাতীয় পার্টির (এরশাদ) ১৮ দফা নির্বাচনী ইশতেহারে আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নামে পৃথক কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। তবে ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা’ শিরোনামে ১৮তম দফায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ৩০টি আসন সংরক্ষণ, চাকরি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ, সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় ও কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। জাতীয় পার্টির ইশতেহারেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও আদিবাসীদের অন্যতম প্রধান সমস্যা ভূমি সমস্যার বিষয়টি উল্লেখ নেই।

বাম গণতান্ত্রিক জোটের ইশতেহারে ‘১৮. বিভিন্ন জাতিসত্তা, আদিবাসী সমাজ ও দলিতদের যথাযথ স্বীকৃতি ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করা’ শিরোনামে আদিবাসী হিসেবে বিভিন্ন জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্রের অনুস্বাক্ষর; ভূমি কমিশনের মাধ্যমে আদিবাসীদের জমি ফেরত দেওয়া, পর্যায়ক্রমে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারসহ পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন; সমতলের আদিবাসীদের জন্য ভূমি কমিশন গঠন ও খাসজমি বণ্টনে তাদের অগ্রাধিকারের কথা বলা হয়েছে। বাম গণতান্ত্রিক জোটের এই ইশতেহারে মোটামুটি আদিবাসীদের সমস্যার মৌলিক ইস্যুগুলো সমাধানের প্রতিশ্রুতি যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়েছে বলে বলা যেতে পারে।

এবারের নির্বাচনী ইশতেহারগুলোতে আদিবাসীসহ সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণে জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার পরিষদে আসন সংরক্ষণের জন্য জাতীয় পার্টি ব্যতীত অন্য কোনো দলের ইশতেহারে ঠাঁই পায়নি। বলা বাহুল্য, জাতীয় সংসদে আদিবাসীদের জন্য ১৫টি আসনসহ সংখ্যালঘুদের জন্য ৬০টি আসন সংরক্ষণের জন্য জাতিগত, ভাষাগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা দাবি করে আসছে।

Related Articles

Back to top button