গণতন্ত্রের স্বার্থে বিএনপির সংসদে আসা উচিত: প্রধানমন্ত্রী

ব্রিট বাংলা ডেস্ক :: গণতন্ত্রের স্বার্থে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে বিজয়ীদের সংসদে এসে কথা বলা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শনিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের উপদেষ্টা পরিষদ ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের যৌথসভার সূচনা বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, প্রার্থী নিয়ে মনোনয়ন বাণিজ্য না করলে বিএনপি হয়তো বা এই নির্বাচনে আরও ভালো ফল করতে পারতো। এর থেকেই তো মানুষ জানতে পেরেছে, তাদের চরিত্রটা কী! এদের চরিত্র শোধরায়নি। তাই বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচনে তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। তারপরও যে কয়টা আসনে তারা জিতেছে, গণতন্ত্রের স্বার্থে তারা যদি চায়, তাদের সংসদে আসা প্রয়োজন।

এবারের নির্বাচনে বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের পরাজয় প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, এখন বিএনপি নির্বাচনে হেরেছে, এই দোষটা তারা কাকে দেবে? দোষ দিলে তাদের নিজেদেরকেই দিতে হয়। কারণ এই নির্বাচনে তাদের কোনো মাথা ছিল না। একটি রাজনৈতিক দলের যদি নেতৃত্ব না থাকে, মাথাই না থাকে, তাহলে সেই রাজনৈতিক দল কীভাবে নির্বাচনে জয়ের কথা চিন্তা করতে পারে?

বিএনপির ‘অপকর্মের’ কারণে নির্বাচনে কিছু প্রাণহানি ঘটেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এবারের নির্বাচনটা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় বিএনপি-জামায়াত জোট মিলে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করতে গেছে। কোথাও তারা নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করেছে। তাদের এই অপকর্মের কারণে বেশ কিছু প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে আমাদের দলীয় নেতাকর্মীদের অনেকই আছেন।’

নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের বিশাল বিজয়ের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্র পরিচালনায় আমরা জনগণের সেবক হিসাবে কাজ করতে পেরেছি। তার ফলে ২০১৮ সালের নির্বাচনেও জয়লাভ করেছি। এমনকি ২০১৪ সালের নির্বাচনেও যারা কী করবেন— এমন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিলেন, তারাও কিন্তু সবাই এগিয়ে এসেছিলেন এই নির্বাচনে আমাদের সমর্থন দেওয়ার জন্য। বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেওয়ার জন্য।’

তিনি বলেন, এখানে ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-শ্রমিক, কামার-কুমার জেলে-তাঁতীসহ মেহনতি মানুষ এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায় থেকে শুরু করে প্রত্যেকের মাঝে একটি আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তারা ভালো থাকবেন। আওয়ামী লীগ এলে দেশটা ভালো চলবে। আওয়ামী লীগ এলে দেশের উন্নতি হবে। এই উপলব্ধিটা তাদের মাঝে ব্যাপকভাবে দানা বেঁধে যায়। এ কারণেই তারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন।

গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠনের পর শনিবারের যৌথসভাই ছিল দলীয় নীতিনির্ধারণী ফোরামের প্রথম কোনো বৈঠক, যেখানে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

বিকেলের এই যৌথসভা ও প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে দুপুর থেকেই দল ও সহযোগী-ভাতৃপ্রতীম সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী বঙ্গবন্ধু এভিনিউর দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সংলগ্ন শহীদ নূর হোসেন স্কয়ারের রাস্তার চারপাশে অবস্থান নেন। ওই রাস্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর যাওয়ার সময় নেতাকর্মীরা বিপুল উচ্ছ্বাস ও স্লোগানের মাধ্যমে স্বাগত জানান তাকে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তারক্ষায় সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরাও সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। পল্টন মোড় হয়ে শহীদ নূর হোসেন স্কয়ার ও গুলিস্তানগামী যানবাহন চলাচল ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ায় দেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ এবং ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে সব থেকে লক্ষ্যণীয় বিষয় ছিল, মানুষের মধ্যে একটা স্বতঃস্ফূর্ততা এবং ভোট দেওয়ার জন্য আগ্রহ ছিল। বিশেষ করে এদেশের তরুণ সমাজ, যারা প্রথম ভোটার এবং নারী সমাজের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ।

বিএনপি-জামায়াত জোটের বিরুদ্ধে নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টার অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে সব ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করা আছে। আপনারা মাঠেঘাটে দেখেছেন, টেলিভিশনেও দেখেছেন কীভাবে তারা প্রচেষ্টা চালিয়েছিল কোনোমতে নির্বাচনটা যেন বানচাল করা যায়। কিন্তু সেটি তারা করতে পারেনি।’

২০০৮ সালের নির্বাচনেও মহাজোটগভাবে জয়ী হওয়া এবং সরকার গঠনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০০৮ সালের নির্বাচনে কিন্তু ভোটের হার এখন ২০১৮ সালের নির্বাচন থেকে বেশি ছিল। সেবারও কিন্তু অনেক বেশি ভোট পড়েছিল। ২০০৮ এর নির্বাচনে জনগণ আমাদের বিপুল ভোটে বিজয়ী ও সরকার গঠনের সুযোগ করে দেয়। আর সেবার সরকার গঠন করার পর থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ে তুলবো। দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে স্বাধীনতার সুফলটা যেন পৌঁছাতে পারি, সেভাবে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেছি।’

তিনি বলেন, ‘আর এটা করেছি বলেই মানুষের মধ্যে এই উপলব্ধিটা এসে গেছে যে, আওয়ামী লীগ সরকার থাকলে তারা ভালো থাকে, তাদের জীবনমান উন্নত হয়। তাদের দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হতে হয় না। তারা শান্তিতে থাকতে পারে। তাদের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়— এটাও তারা উপলব্ধি করতে পারে।’

২০১৪ সালের নির্বাচন বানচাল এবং সরকার উৎখাদের আন্দোলনের নামে ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের অগ্নিসন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা দেশের মানুষ কখনোই মেনে নিতে পারেনি। আর পারেনি বলেই ২০১৪ সালে আবারও আমরা সরকার গঠন করতে পেরেছি। আমাদের সৌভাগ্য যে আমরা এক টানা দশ বছর হাতে সময় পেয়েছিলাম, যার ফলে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে উন্নয়নের একটা রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।’

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানের বিভিন্ন দুর্নীতি ও অপকর্মের পাশাপাশি ক্ষমতায় থাকতে বিএনপি নেতাদের অর্থপাচার, মানিলন্ডারিং, ঘুষ-দুর্নীতি ও দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান করার কথা তুলে ধরের শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপির মত একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে নেমেছে! কিন্তু তাদের নেতৃত্ব হচ্ছে দুর্নীতি, হত্যা মামলা, অস্ত্র চোরা কারবার ও অর্থপাচার মামলার আসামি। আর যিনি তাদের মূল নেতা (খালেদা জিয়া) তিনি এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করায় মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। যিনি ভারপ্রাপ্ত (তারেক রহমান) তিনিও কিন্তু বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত এবং পলাতক আসামি।

তিনি বলেন, পলাতক আসামিকে দিয়ে রাজনীতি করতে গেলে একটি রাজনৈতিক দলের কী ফলাফল হয়, সেটাই তারা এবারের নির্বাচনে পেয়েছে। তাও হতো না, যদি তারা নির্বাচনে প্রার্থী নিয়ে মনোনয়ন বাণিজ্যটা না করতো।

মনোনয়ন বাণিজ্য নিয়ে বিএনপির মধ্যে বিশৃঙ্খলার কথা তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘আমরা এটুকু বলতে পারি যে, আমরা যখন সরকারে এসেছি, আমরা দেশের জন্য কাজ করেছি। জনগণের জন্য কাজ করেছি। আমরা কিন্তু কোনো রিভেঞ্জ (প্রতিশোধ) নিতে চাইনি কিংবা আমরা কাউকে কোনো হয়রানিও করতে যাইনি। বিএনপি নেতাদের কৃতকর্মের জন্য কিংবা দুর্নীতির জন্য যেসব মামলা হয়েছে, সেসব মামলা আপন গতিতেই চলবে। বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন, কাজেই সেভাবেই চলবে।’

বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী সদ্যপ্রয়াত দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে এই জননেতার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে গভীর শোক প্রকাশ করেন তিনি।

শেখ হাসিনার সূচনা বক্তব্য শেষে তার সভাপতিত্বে রুদ্ধদ্বার যৌথসভা শুরু হয়। এর আগে দলের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সভার এজেন্ডা তুলে ধরেন। যৌথভার শুরুতে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন দলের দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। এরপর সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনসহ দলের সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষিয় এবং দেশের সর্বশেষ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x