একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়

মামুনুর রশীদ ::
মাইলখানেক হেঁটে স্কুলে যেতাম। বর্ষাকালে নৌকায়। দুটিই আনন্দ ভ্রমণ। স্কুলের সামনে একটা নদী। আর পেছনে একটা খাল। টিনের চালা স্কুলে। বর্ষাকালে অবিরাম বর্ষণ। কখনও ভিজতে ভিজতে স্কুলে যাওয়া। ভেজা কাপড়েই স্কুলে বসে যেতাম। গায়ের গরমে যতটুকু শুকোয়। তার মধ্য দিয়েই ক্লাস চলছে। স্কুলের বিশাল মাঠ। কখনও মনে হতো বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আমিও খেলতে থাকি। তখন হয়তো অঙ্কের ক্লাস। সতীনাথ স্যার সরল অঙ্ক শেখাচ্ছেন। এমন সুললিত তার কণ্ঠস্বর এবং অঙ্ক বোঝানোর কায়দা যে, সেটাও খুব আনন্দদায়ক। এরপর হয়তো বাংলা, লতিফ স্যারের। লতিফ স্যার আবার আমাদের নায়ক। নায়কোচিত কণ্ঠস্বর। গাঁয়ে কোথাও আগুন লাগলে বা ডাকাত পড়ল অথবা সড়ক দুর্ঘটনা হলো- লতিফ স্যার চোঙ্গা নিয়ে পথে নেমে পড়লেন, চিৎকার করে গ্রামবাসীকে জানিয়ে দিলেন। সেই স্যারের ক্লাস হচ্ছে, বাইরে বৃষ্টি, টিনের চালের ওপর বৃষ্টির সঙ্গীত। পাশে খালের পানিতে ডুমুর গাছ থেকে মাঝেমধ্যে ডুমুরগুলো পড়ছে, টুপটুপ আওয়াজ। বর্ষা পেরিয়ে শরৎকাল, হেমন্তকাল নানা ধরনের উৎসবের কাল। কখনও কাদা পেরিয়ে মাছ ধরা দেখতে দেখতে, ঢাকের শব্দ শুনতে শুনতে স্কুলে যাওয়া-আসা।
শীতে পরীক্ষা। বিকেলের খেলাধুলা সেরে বিদ্যুৎবিহীন গ্রামে হারিকেন মুছে লেখাপড়া। রাতে আর ভোরবেলায় উঠে আবার লেখাপড়া এবং পরীক্ষা। পরীক্ষার শেষ দিনই বিকেলে দুয়ারে প্রস্তুত গরুর গাড়ি। মামাবাড়ি যাওয়ার ধুম। শীতের পিঠা খেয়ে আবার ফিরে আসা পিত্রালয়ে। জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে ফল প্রকাশ এবং ক্লাস শুরু নতুন বইয়ের সুগন্ধি দিয়ে। এমনি করেই শিক্ষা জীবনের চলাচল। শিক্ষকের স্নেহে প্রকৃতির আঁচলে লালিত হয়ে গ্রামের স্কুলটা শেষ করে অশ্রুজলেই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শুরু। গ্রাম থেকে বড় একটা গ্রাম ঢাকা শহরে পরবর্তী শিক্ষাজীবন শুরু। সে সময়টাও এ রকমই। একটা আনন্দের সঙ্গেই আমাদের শিক্ষাজীবনের সমাপনী। এর মধ্যে এসেছে অনেক আন্দোলন, বিক্ষোভ; কিন্তু শিক্ষার আনন্দ বিযুক্ত হয়নি। যখন পিতা হয়েছি, তখন সন্তানকে স্কুলে দিয়েছি। স্কুল দেখে ভয় পেয়েছি। এত বই তো আমরা পড়িনি। আমার কৃষকায় পুত্র সে বই বহন করতেই পারে না। আর আমি স্কুলে সেই সতীনাথ স্যার, দখিনা স্যার, লতিফ স্যারকে খুঁজেও পাচ্ছি না। তারপর আমার সন্তানরা বড় হতে থাকে আর বইয়ের বোঝা শুধু বাড়ে না, আনন্দহীন শিক্ষার পরিবেশে প্রবেশ করে কোচিং সেন্টার। তারপর পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত চাপের মুখে দিশেহারা আমাদের সন্তানরা। শুধু পরীক্ষা পাস আর কাজের সন্ধান। মানবিক মূল্যবোধ ক্রমে ক্রমে অবক্ষয়ের পথে।

একসময় মনে হতে থাকে, এসব শিক্ষার বুদ্ধি কোথা থেকে আসে? পরে জানতে পারি বিশ্বব্যাংক নাকি এসবের মধ্যে ঢুকেছে। বিশ্বব্যাংক কেন ঢুকবে? কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে তারা শিক্ষার মেরুদণ্ডটাকে ভেঙে দিতে চায়। আবার ধর্মে যারা রাজনৈতিক ব্যবহার করে, তারাও ঢুকে যায় তার মধ্যে। আমাদের সনাতন এবং স্থানিক বিবেচনার যে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তাকে ভেঙে দিতে হবে। এর মধ্যে ঢুকে গেছে ভাষা আন্দোলনের জন্য প্রাণ দেওয়া দেশের মানুষের মধ্যে ‘ও’ লেভেল আর ‘এ’ লেভেল- জাতিবিনাশী এই ব্যবস্থা ঢুকে যায়। এরই মধ্যে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে যায় এক ধরনের অন্য রাজনীতি। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন তার সমর্থিত ছাত্রদের রাজনীতি। শিক্ষকরাও সেখানে ঢুকে যান। তাতে আপত্তি নেই। মানুষ তো একটা না একটা রাজনীতির সমর্থক হবেই। কিন্তু ভাষা আন্দোলন থেকে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান অথবা মুক্তিযুদ্ধ বা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধভাবে একটা ভূমিকা পালন করেছিল এবং জনগণের শ্রদ্ধার জায়গায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। অতঃপর সেটাও দলীয় রাজনীতির কাছে হেরে গেল। হোস্টেলে বা হলে সিটের ব্যাপারটা দেখে ছাত্ররা আর পরীক্ষার বিষয়টা দেখে শিক্ষকরা। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের বিষয়টি কীরকম একটা বিকৃতির দিকে যেতে শুরু করল। শিক্ষকদের আচরণ ছাত্রদের প্রতি যেখানে ছিল পিতা-পুত্র-কন্যার মতো, তা পাল্টে দিয়ে দাঁড়াল অন্য বিন্যাসে। কোনো কোনো শিক্ষক যুক্ত হলেন যৌন আচরণে, সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে ছাত্র সংগঠনের কিছু বিকৃত নেতৃত্বও এর মধ্যে ঢুকে গেল। শিক্ষার জীবনটাই হয়ে পড়ল আনন্দহীন একটা বিভীষিকার মতো। ছাত্রীরা ধর্ষিত হয়, তা নিয়ে নানা কথা পত্রপত্রিকায়-মিডিয়ায় আসে। মাদ্রাসার ছাত্রদের অবস্থা কিছু ক্ষেত্রে আরও অমানবিক। তাহলে কী থাকল শিক্ষার পরিবেশে?

শিক্ষাজীবন শেষে অনেক ছাত্রছাত্রী তাদের ক্যাম্পাসের দিনগুলোকে একটা অস্বস্তিকর এবং প্রায় মানবেতর জীবন বলে বর্ণনা করেছে। হতে পারে বর্তমানে মিডিয়ার কল্যাণে অনেক কিছু জানতে পারছি; কিন্তু আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এসব কিছু আমরা দেখিনি। শিক্ষাজীবন বা শিশু-কিশোর ও বয়ঃসন্ধিকালের এসব অভিজ্ঞতার কথাও আমরা জানি না। একটি ছাত্র বা ছাত্রী যদি কোনো কারণে তার যথার্থ মূল্যায়ন না পায়, তাহলে বাকি জীবন তার দুঃসহ হয়ে ওঠে। সে রকম দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে কোনো মানুষের কি পরবর্তী জীবন সুন্দর হতে পারে? জাপান ও পাশ্চাত্য দেশে শিক্ষাব্যবস্থায় কী ধরনের সংস্কৃতি আছে যে ছাত্ররা শিক্ষাজীবনের পরে তার স্কুলটির জন্য কাঁদে এবং স্কুলের উন্নয়নে অংশ নেয়। আমি নিজে আমার স্কুলের জন্য কেঁদেছি এবং স্কুলের শতবর্ষ পালনের সময় যখন দেখলাম স্কুলটিতে দালান উঠে গেছে ও স্কুলের দেয়ালে ফাটল দেখা যাচ্ছে, তখন আমারও কান্না পেয়েছে। পেছনের সেই খালটি ও সামনের নদীটিও ভরাট হয়ে গেছে এবং ঘরবাড়ি, দোকানপাট নিসর্গকে গ্রাস করেছে, তখন আমার বুকটা হাহাকার করে উঠেছে। বিষয়টি যেহেতু গভীরভাবে রাজনৈতিক, তাই এর সমাধান রাজনৈতিকভাবে করাই সমীচীন। শিক্ষানীতির সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদেরকে বিষয়টি ভেবে দেখতে অনুরোধ করব।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x