সুলতান মনসুরকে ঘিরে দুই প্রশ্ন

Posted on by

সিলেট অফিস :: তুমুল আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে গণফোরামের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর। শপথ নিয়েই তিনি যোগ দেন সংসদের অধিবেশনে। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে বহিষ্কার করে গণফোরাম। এরপর সুলতানকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে।

এরকম অবস্থায় সুলতান মনসুরের সংসদ সদস্য পদ থাকবে কিনা এবং তিনি কি আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছেন- এ দুই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।

একসময় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মনসুর। তবে ওয়ান-ইলেভেনের সময় দলে সংস্কারের ধুয়া তুলে পরবর্তীতে গুরুত্ব হারান তিনি। কয়েক বছর নিরব থাকার পর একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে গণফোরামে যোগ দেন সুলতান। গণফোরামের প্রার্থী হলেও নির্বাচনে তিনি বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে সুলতানের আসন আর সিলেট-২ আসনে গণফোরামের হাত ধরে জয় পায় ঐক্যফ্রন্ট।

নির্বাচনের পর ‘ভোট ডাকাতি’ ‘আগের রাতে ব্যালটে সিল’সহ নানা অভিযোগ তুলে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তাদের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হয়, ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত ৮ সাংসদ শপথ গ্রহণ করবেন না। কিন্তু সুলতান মনসুর ও সিলেট-২ আসনে গণফোরাম থেকে নির্বাচিত মোকাব্বির খান শপথ নিতে তোড়জোড় শুরু করেন। ৭ মার্চ শপথ নিতে তারা স্পিকারকে চিঠি দেন। তবে ৬ মার্চ দলীয় চাপে মত পাল্টান মোকাব্বির, আপাতত শপথ গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু সুলতান মনসুর ৭ মার্চই শপথ গ্রহণ করেন। ওইদিন বিকেলে তিনি যোগ দেন সংসদের অধিবেশনে। সন্ধ্যায় গণফোরাম সংবাদ সম্মেলন করে সুলতানকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানায়। তার সংসদ সদস্য পদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও জানানো হয়।

শপথের পর সুলতান মনসুর সংসদ অধিবেশনে বক্তব্যে ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি’ বলে মন্তব্য করেন। এরপর কাল রবিবার (১০ মার্চ) তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে।

এরকম অবস্থায় সুলতান মনসুরের সংসদ সদস্য পদ বাতিলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পথে হাঁটছে ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ গ্রহণ এবং সংসদে যোগ দেয়ার মধ্য দিয়ে সুলতান ‘সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আইন ভঙ্গ করার পাশাপাশি নৈতিকতাও বিসর্জন দিয়েছেন’- এমন অভিযোগ এনে তার পদ বাতিল চেয়ে স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে চিঠি দিচ্ছে দলটি। ইতিমধ্যেই কয়েকজন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের সাথে কথা বলে চিঠির খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। মূলত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আলোকে সুলতানের পদ বাতিল চায় গণফোরাম।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, ‘কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হয়ে কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি যদি- (ক) ওই দল থেকে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন; তবে তার আসন শূন্য হবে। তবে এক্ষেত্রে পরবর্তী কোনো নির্বাচনের জন্য তিনি অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না।’

এ বিষয়ে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী একটি জাতীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ কতোদূর যাবে? এখন যা বলা আছে, তাতে আমার ব্যাখ্যা হচ্ছে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারবে না। আমি ব্যাখ্যা করছি, দলীয় সিদ্ধান্ত ভায়োলেট করে তিনি সংসদে যাচ্ছেন। আমরা তাকে বরখাস্ত করেছি। তাহলে তিনি কোন দল থেকে নির্বাচিত? তার তো কোনো দলই নেই। ফলে তিনি ধানের শীষেরও এমপি নন, আবার গণফোরামেরও নন। যদিও তিনি ভোট করেছেন বিএনপির ধানের শীষ নিয়ে, গণফোরাম থেকে মনোনীত হয়ে। আমাদের সিদ্ধান্ত অমান্য করায় এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রয়োগযোগ্য। আর নীতিনৈতিকতার প্রশ্ন তো আছেই।’

এদিকে, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য, প্রবল সমালোচনা এবং বহিষ্কার হওয়ার শঙ্কা নিয়েই সাংসদ হিসেবে শপথ নেন সুলতান মনসুর। বহিষ্কারের শঙ্কা পরে বাস্তবেই ধরা দিয়েছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন ওঠছে, শুধুই কি সংসদ সদস্য হওয়ার আশাতেই শপথ নিয়েছেন সুলতান, নাকি তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। সুলতান কি ফের আওয়ামী লীগে ফিরতে চাইছেন, যে কারণে তিনি এখনও ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আছেন’ বলে মন্তব্য করেছেন।

শপথ নিলে গণফোরাম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে সংসদ সদস্য পদ ঝুঁকিতে পড়তে পারে, এমন শঙ্কা মাথায় নিয়েই সুলতান মনসুরের শপথ গ্রহণকে ‘সহজ সমীকরণ’ হিসেবে দেখতে নারাজ অনেকেই। তবে আপাতত এসব বিষয় নিয়ে নিরব সুলতান মনসুর।

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x