মতামত

অস্বাভাবিক মৃত্যু আর সহ্য করা যায় না

শাহদীন মালিক :: বাসের চাকার নিচে প্রাণ গেল আবরারের। ২০ মার্চ পত্রিকাগুলোয় বড় শিরোনামে এই খবর পড়ার সময় কিছু ছোট ছোট শিরোনামও চোখে পড়ল। প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় ‘সিলেটে ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ গেল মা–ছেলের’। মা ইলোরা পারভীন আর তাঁর ছয় বছরের ছেলে সাজিদ আহমেদ নিহত হলো ট্রাকের ধাক্কায়, জাফলং ঘুরে দেখতে গিয়ে। ১৯ মার্চ আরও একটা শিরোনামে প্রথম আলো খবর দিয়েছে, বিভিন্ন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে আরও ১১ জন। ‘সড়কে মৃত্যুর মিছিল’ কথাগুলো আজকাল প্রায় একঘেয়ে হয়ে গেছে। কারণ, আমরা ভীষণভাবে ভোঁতা হয়ে গেছি।

পাহাড়ে ব্রাশফায়ারে নিহত হয়েছেন সাতজন। এক দিনও না পেরোতে ওই এলাকায় খুন হলেন আরও একজন। খুনোখুনি চতুর্দিকে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সারা দেশে খুন হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৮২ জন। এই সংখ্যাকে বার্ষিক গড় হিসাবে রূপান্তর করাটা হবে অসংবেদনশীলতা। কিন্তু বর্তমানকাল হিসাব–নিকাশের কাল। বার্ষিক খুনের গড় দাঁড়ায় ৩ হাজার ৯৯৮। অর্থাৎ গড়পড়তা প্রায় চার হাজার।

অপচিকিৎসা, কাজে দুর্ঘটনা, আগুনে পুড়ে, পানিতে পড়ে মৃত্যু, লঞ্চ-নৌকা ডুবে অনেক প্রাণহানি।

সরাসরি রাষ্ট্রের কারণে মৃত্যু শুরু হয়েছিল ২০০২ সালের শেষের দিকে। দেড় দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। রাষ্ট্র ক্ষান্ত হচ্ছে না, তবে বরাবরই অস্বীকার করে। হার্ট অ্যাটাক, ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, এনকাউন্টার, মাদক কারবারিদের একে অপরকে গুলি করে মারা—এই প্রাণহানিগুলোর ‘টাইটেল’ বদলেছে কয়েকবার। আরও অনেক কিছু আছে। অধমের পরিবারে সদস্যসংখ্যা অল্প। তবে গৃহকর্মী, গাড়িচালক ও অন্য সহযোগীদের নিয়ে সংখ্যাটা নিতান্ত অল্পও না। গত তিন মাসে সম্ভবত একটি দিন যায়নি, যেদিন বাসার অন্তত একজন খুক খুক করে না কেশেছে। চিকিৎসকদের কাছে যাতায়াত, এই ওষুধ, ওই সিরাপ লেগেই আছে।

ঢাকার বায়ু এখন পৃথিবীর অন্যতম নিকৃষ্ট। পানিদূষণ, শব্দদূষণ, পরিবেশগত আরও অনেক বিপদ আর সেই সঙ্গে দুধ-ডিম থেকে শুরু করে
ওষুধ পর্যন্ত সবকিছুতেই ভেজাল। এসব কারণে প্রাণহানির ঘটনা টেলিভিশন বা পত্রিকায় শিরোনামও হয়নি। ছোট খবর হিসেবেও স্থান পায় না। কিন্তু
রাষ্ট্রের অবহেলা, দায়িত্বহীনতা এবং অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি সহযোগিতায় এসব প্রাণহানি থেকে যাচ্ছে হিসাবের বাইরে।

দুই.
মাঝেমধ্যে রাষ্ট্র ‘অভিযান’ চালায়। এখন ভীষণ সব অভিযান চলছে। বুড়িগঙ্গা আর তুরাগ নদের দুই পাড়ে। নিঃসন্দেহে তাঁরা বহু বছর নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। তবে আমাদের কিছুটা হলেও স্বস্তি এই ভেবে যে ক্ষণিকের তরে হলেও তাঁদের ঘুমটা ভেঙেছে। ভেজালবিরোধী অভিযান হয়। পচা ও বিষাক্ত খাবার খাই আমরা, আর জরিমানার টাকাটা যায় রাষ্ট্রের পকেটে। অযাচিতভাবে একটা সুপারিশ করার লোভ সামলাতে পারছি না। ভেজালবিরোধী অভিযানে দোষী প্রতিষ্ঠানের সামনে দুই সপ্তাহ বা এক মাসের জন্য বড় করে নোটিশ অথবা সাইনবোর্ড লাগাতে হবে। সেখানে বলা থাকবে, সরকারের অমুক দপ্তর বা কর্তৃপক্ষের অভিযানের সময় ভেজাল বা অন্য প্রযোজ্য কারণে দোষী সাব্যস্ত করে এত টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অন্যথায় আমরা পত্রিকায় পড়ি, দু-চার দিন পর ভুলে যাই আর রাষ্ট্র লাভ করে লাখ লাখ টাকার জরিমানা। ক্ষতি হয় আমাদের আর লাভবান হয় রাষ্ট্র।

কারণ এখানে স্পষ্ট। মূলত এই রাষ্ট্রটা আর আমাদের না। একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর। সময় সময় গোষ্ঠীটির পরিচয় বা আকার বদলায়, কিন্তু শেষ বিচারে রাষ্ট্রটা হয়ে গেছে একটা নির্ধারিত গোষ্ঠীর। বিশেষ করে মহাপ্রকল্প বা বড় বড় প্রকল্পকেন্দ্রিক উন্নয়নের অর্থনীতির প্রধান সুবিধাভোগী হয়েছে, হচ্ছে এবং হয় শাসক। একটা নির্দিষ্ট শাসকগোষ্ঠীর সীমিতসংখ্যক ব্যক্তি। বহু দেশে এটা বারবার হয়েছে। এখন জোরেশোরে হচ্ছে আমাদের দেশে। এ দেশে অতি ধনীর সংখ্যা বাড়ার গতি সর্বোচ্চ। অন্যদিকে তিন বেলা পেট ভরে খেতে পায় না এমন মানুষের সংখ্যাও প্রায় সর্বোচ্চ, যদি আমরা হিসাব থেকে দশ-বারোটা দেশকে বাদ দিই।

তিন.
নিহত আবরারের সহপাঠীরা অনেকগুলো যৌক্তিক দাবি তুলেছেন। আবরারও তুলেছিলেন এই রকম দাবি, প্রায় আট মাস আগের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের যেসব বক্তব্য এখন পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমে শুনেছি, তা থেকে স্পষ্ট যে তাঁরা শুধু আশ্বাসে দমে যাবেন না। তাঁরা নিরাপদ সড়কের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চান অবিলম্বে। এই চাওয়া দেশের প্রত্যেক মানুষের। মানুষ মরছে সারা দেশে। রাষ্ট্রকে জাগিয়ে তুলতে পারবেন এই আন্দোলনকারীরা। এটা প্রাণ বাঁচানোর আন্দোলন। দোকানে যাওয়ার পথে মারা পড়া, কাজে বা অফিসের পথে নেমে ফিরে না আসা, পড়াশোনার জন্য স্কুল-কলেজে পৌঁছাতে না পেরে লাশ হয়ে ঘরে ফেরা বা পঙ্গু হয়ে হাসপাতালে কাতরানো, ভ্রমণে গিয়ে বা এমনকি বরযাত্রীর গাড়ি দুমড়েমুচড়ে আনন্দের পরিবর্তে গভীরতম শোক—এসব আর আমাদের জীবনের সঙ্গী হতে পারে না। ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে রাষ্ট্র যেখানে পৌঁছেছে, সেই জায়গা থেকে চাইলেও ফলপ্রসূ ব্যবস্থা নিতে না–ও পারতে পারে। কারণ ব্যবস্থা, পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন প্রায় পঙ্গু। রাষ্ট্র যখন একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ক্ষমতা, স্বার্থ ও হালুয়া-রুটির প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তখন সেই রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে জনগণের জন্য কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আশঙ্কা হয় আমাদের রাষ্ট্রটা সেই জায়গায় পৌঁছে গেছে কি না। কেননা গত বছর যখন নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হয়েছিল, তখনো বোধ হয় রাষ্ট্রের সদিচ্ছা জেগেছিল। তখনকার আরও কম বয়সী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে রাষ্ট্র নিশ্চয় চেয়েছিল ভালো কিছু করতে। কিন্তু মাঝেমধ্যে ট্রাফিক সপ্তাহ বা যানবাহনের কিছু কাগজপত্র পরীক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি। কেননা এর থেকে বেশি কিছু করতে গেলে রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট সুবিধাভোগী অংশের হালুয়া-রুটি প্রাপ্তিতে বিঘ্ন ঘটবে। তাদের বিঘ্ন ঘটাতে না, সুবিধা বাড়াতেই এখন রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। অতএব, গত জুলাই থেকে এই মার্চ পর্যন্ত মোড়ে মোড়ে হুইসেল বাজানো আর মাইকিং করা ছাড়া তেমন কিছুই তো হয়নি। সড়কে গড়পড়তা প্রাণহানির সংখ্যা সম্ভবত একটাও কমেনি।

কিন্তু সড়ক নিরাপদ করতে হবে। নিরাপদ করার জন্য কিছু বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। এত দিন যাঁরা রাষ্ট্রের সহায়তায় পরিবহন খাতে হালুয়া-রুটি লুটেছেন, তাঁদের বাগে আনতে হবে। তা করতে হলে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। সহিংসতা বন্ধের আন্দোলন কখনো সহিংস হতে পারে না। কিন্তু আন্দোলন অবশ্যই অপরিহার্য। ঐতিহাসিকভাবে এ দেশের বড় বড় পরিবর্তনের পেছনে সব সময় প্রধান শক্তি ছিলেন তরুণেরা, শিক্ষার্থীরা। সড়ক নিরাপদ করা সম্ভব। দুনিয়ার অন্যান্য দেশেও যানবাহন আছে, বাস-ট্রাক আছে, পথচারী আছে; তবে সড়ক নিরাপদ। যখন লিখছি, তখন সংবাদমাধ্যমে দেখছি যে আবরারের নামে ফুট ওভারব্রিজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। ভালো কাজ। তাঁকে আমাদের স্মরণে রাখতেই হবে। কিন্তু এখানে একটা আন্ডারপাস, ওখানে জেব্রা ক্রসিংয়ে সাদা রঙের প্রলেপ দেওয়া, অন্য কোথাও তাড়াহুড়ো করে এবং আগপাছ বিবেচনা না করে ফুট ওভারব্রিজ বানালে সড়ক নিরাপদ হবে না। সড়ক থেকে যারা বেআইনিভাবে শত শত কোটি টাকা নিত্য আহরণ করে, তাদের গলায় শিকল বাঁধতে হবে। এই কাজটা করতে পারবেন শিক্ষার্থীরাই। অস্বাভাবিক মৃত্যু আর সহ্য করা যায় না।

Related Articles

Back to top button