অস্তিত্ব সংকটে এমসি কলেজ ছাত্রদল, নবীনরা দিশেহারা

Posted on by

সিলেট অফিস :: নাম আছে কাম (কাজ) নাই, আর কাম থাকলেও ঘাম (তোড়জোড়) নাই, গ্রাম বাংলার এই ব্যঙ্গাত্মক প্রবাদটির সাথে অনেকটাই মিলে যায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এমসি কলেজ শাখাটি।

সংগঠন আছে, নেতাদের দীর্ঘলিস্টের নামও আছে। তারপরও প্রায় নিস্ক্রিয় এমসি ছাত্রদল।

কলেজে কোন ধরনের কার্যক্রম তো নাই-ই, বিগত কয়েকবছর ধরে ক্যাম্পাসে আসেন না একসময়ের দাপুটে ছাত্র সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। যদিও মাঝে মধ্যে সাধারণ ছাত্র হিসেবে কলেজ আসা হয়, তথাপী ছাত্রদলের নেতাকর্মী বা সমর্থক পরিচয়ে ক্যাম্পাসে ঘুরার মানসিকতা হারিয়ে গেছে তাদের।

২০০৪-৫ সালে কলেজটিতে সংগঠনটির সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়েছিল। এরপর ২০১৫ সালে নতুন কমিটির প্রক্রিয়া শুরু করলেও সরকার দলীয় মামলা, হামলার স্বীকার হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে প্রধান সারীর ছাত্রদল নেতারা। যেকারণে এমসি ছাত্রদলের সাংগঠনিক কাজ শেষ পর্যন্ত আর বেশিদূর আগাতে পারেনি।

পরবর্তীতে অবস্থা কিছুটা স্থবির হলে প্রায় একযুগ পর নতুন কমিটি দেওয়ার জন্য আবারও প্রক্রিয়া শুরু করে এমসি ছাত্রদল। অবশেষে ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি বদরুল আজাদ রানাকে প্রধান করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটির নাম ঘোষণা করে এমসি কলেজ ছাত্রদল। এতে সদস্য সচিব হিসেবে ছিলেন, মো. দেলোয়ার হোসেন এবং একমাত্র সদস্য হিসেবে রাখা হয় রুবেল ইসলামকে।

সরকারের মামলা-হামলা ও হয়রানীর স্বীকার হয়ে দীর্ঘদিন ধরে ছন্নছাড়া সংগঠনটি প্রায় একযুগ পরে ক্যাম্পাসে নিজেদের অবস্থান জানান দিতেই নতুন আহবায়ক কমিটিকে নিয়ে কলেজে এক আনন্দ মিছিল বের করে এমসি ছাত্রদল। কিন্তু ৩০ জানুয়ারি সেই আনন্দ মিছিল করতে দেয়নি ছাত্রলীগ।

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্রদলের আনন্দ মিছিলে হামলা করে তাদের ব্যানার পুড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে দেশীয় অস্ত্র দ্বারা উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বাঁধে। ছাত্রলীগের সেই দাওয়ার পর থেকে এখনও ক্যাম্পাস ছাড়া এমসি কলেজ ছাত্রদল।

এরপর থেকে দলটির নেতাকর্মীরা ছাত্রদলের দৃশ্যমান কার্যক্রম তো দুরের কথা সেই আহবায়ক কমিটি ছাড়া আর কিছুই দেখেনি কলেজের এই ছাত্র সংগঠনটি । নেই কোন সাংগঠনিক তোড়জোড়ও। নেতাদের শীতল মনোভাব আর কর্মহীনতার কারণে বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে এমসি কলেজের অন্যতম প্রধান এই ছাত্র সংগঠনটি।

ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মীর সাথে কথা বললে তারা জানান, যাদের নিয়ে আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তারা এখন ক্যাম্পাস বিমুখ। আর এ কারণে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত রেখে কোন ধরনের সাংগঠনিক কাজও তারা করতে পারছেনা । একারণে বর্তমানে সংগঠনটির এই দুরবস্থার জন্য আহবায়ক কমিটির সাংগঠনিক ব্যর্থতাকেও ছাড় দিতে রাজি নয় নেতকর্মীরা।

নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে এমসি কলেজ ছাত্রদলের প্রধান সারীর এক ছাত্রনেতা বলেন, ছাত্রলীগের আগ্রাসী মনোভাবের সাথে, দায়িত্বশীলদের গা-ঢাকা দেওয়া দায়িত্বহীনতা, অনেকদিন ধরেই কলেজে ছাত্রদলের কোন ধরনের দৃশ্যমান কার্যক্রম দেখা যায়নি। যে কারণে দলটির নতুন সমর্থকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

তিনি বলেন, সংগঠনের এই অচলাবস্থার কারণে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পেতে ছাত্রদলের অনেক নেতাকর্মী ক্যাম্পাসে সক্রিয় অবস্থানে থাকা ছাত্রলীগের পতাকাতলে ভিড়ছেন।

ছাত্রলীগে সদ্যযোগ দেওয়া সুফিয়ান (ছন্দ নাম) নামের একজন বলেন, পরিবার সূত্রেই আমরা বিএনপির সমর্থক। যেকারণে কলেজে এসে ছাত্রদল করার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ক্যাম্পাসে এসে দেখি দৃশ্যমান কার্যক্রমতো দুরের কথা, কলেজে ছাত্রদলের কোন নাম গন্ধই নেই। এমনকি কোন নেতার সাক্ষাতও আজ অবধি পাইনি। সুফিয়ান বলেন, অবশেষে সংগঠন করার তাগিদে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছাত্রলীগে যোগ দিতে হল।

ছাত্রদলের এই দুরবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে, এমসি ছাত্রদলের ৩ সদস্যবিশিষ্ট আহবায়ক কমিটির প্রধান, বদরুল আজাদ রানা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার আসার পর থেকেই বিভিন্ন সময় অকারণে মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের জেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে ।

সাংগঠনিক ব্যর্থতার প্রশ্নে রানা বলেন, পুলিশ ও সরকার দলীয় ক্যাডারদের কারণে ঘর থেকেই বের হওয়া যায় না, সাংগঠনিক কাজ করব কিভাবে? তাছাড়া ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের একক আধিপত্য ও বিদ্বেষমূলক মনোভাবের কারণে কলেজেও যাওয়া না অভিযোগ করে রানা বলেন, মূলতঃ একারণে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের সাংগঠনিক তেমন তোড়জোড় দেখা যায় না। ছাত্রদল নেতাকর্মীদের হতাশ না হয়ে একটু ধৈর্য ধরার ইঙ্গিত দিয়ে এসময় তিনি বলেন, শীঘ্রই সংগঠনকে গোছানোর কাজ শুরু হবে।

এদিকে, ছাত্রদলের প্রতি ক্ষমতাসীন দলের বিদ্বেষমূলক আচরণ ও ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নেই এমন অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে এমসি কলেজ ছাত্রলীগের অন্যতম সংগঠক দেলোয়ার হোসাইন বলেন, ছাত্রদলের এসব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। সুষ্ঠু ছাত্ররাজনীতির জন্য কলেজ সবার জন্যই উন্মুক্ত। ক্যাম্পাসে আসা না আসা তাদের বিষয়। এরপরও ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ই তাদেরকে ক্যাম্পাসে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তারপরও তারা আসেনা। দেলোয়ার বলেন, মুলতঃ তাদের সাংগঠনিক ব্যর্থতার জন্যই ক্যাম্পাস ছাড়া ছাত্রদল, অথচ দোষ চাপাচ্ছে ছাত্রলীগের উপর।

এমসি কলেজ ছাত্রদলের অস্তিত্ব সংকট সম্পর্কে জানতে, সংগঠনটির সিলেট মহানগর শাখার সভাপতি স্যুদিপ জ্যোতি এ্যাষের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

পরে সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ফজলে আহসান রাব্বি কাছে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বললে তিনি বললে, সরকারের বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের কারণে আমাদেরকে কোন ধরনের কাজ করতে দেয়া হয়না। সারাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সর্বত্রই বিএনপি, ছাত্রদল বা আমাদের অন্যান্য সংগঠনের সমর্থক ও নেতাকর্মীদের উপর হামলা -মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এ অবস্থায় অনেকে ঘর থেকেই বের হতে পারছেন না। মাঝে-মধ্যে কর্মসূচী দিলে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী বাহিনী ও পুলিশী আক্রমণের শিকার হতে হয়। মিথ্যা মামলায় জেলে যেতে হয়। যেকারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সাংগঠনিক কাজ করার তেমন সুযোগ নেই।

এসময় এমসি ছাত্রদলের দুরবস্থার প্রশ্নে কলেজের নেতাকর্মীদের সাংগঠনিক ব্যর্থতা স্বীকার করে তিনি বলেন, মূলতঃ ছাত্রলীগের অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণে নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারেনা। এ অচলাবস্থা থেকে সংগঠনকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর কাজ শুরুর ইঙ্গিত দিয়ে ফজলে আহসান রাব্বি বলেন, সকলের সহযোগিতায় ধীরেধীরে সংগঠনটিকে আরো গতিশীল করা হচ্ছে।

রাব্বি বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটি গঠণের পরই সারাদেশের সবগুলো ইউনিটকে আবারও উজ্জীবিত করা হবে। নতুন রুপে ফিরে আসবে এমসি ছাত্রদল।

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x