ফিচার

জিমই জীবন

ব্রিট বাংলা ডেস্ক :: পর্দার তারকারা তখনই কাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠেন, যখন রূপে, গুণে, কাজে হয়ে ওঠেন অনন্য। রূপ তো গড়ে নেওয়া যায়, মেধার চর্চা করতে হয় বছরের পর। তবে একজন তারকাকে সবার আকাঙ্ক্ষার তালিকার শীর্ষে উঠে আসতে হলে থাকতে হয় শারীরিকভাবে সুস্থ ও সুঠাম। এ জন্য নিয়মমাফিক জীবন যাপন করতে হয়, যেতে হয় জিমে। কারও কারও কাছে জিম তো হয়ে যায় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। তারকাদের সেই জিমজীবন নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন। লিখেছেন মনজুর কাদের

বুবলী। ছবি: সংগৃহীতশবনম বুবলী

নিয়মিত জিমে যান এবং বাসায় যোগব্যায়াম করেন ঢালিউড নায়িকা শবনম বুবলী। শুধু জিমে নয়, নিজের বাসার ছাদেও নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করেন তিনি। সাধারণত বাসা থেকে বের হওয়ার আগেই জিম শেষ করে নেন এই নায়িকা। তাঁর মতে, শরীর ও মনকে সুস্থ রাখার জন্য ব্যায়ামের কোনো বিকল্প নেই। তাই প্রতিদিন কমপক্ষে তিন ঘণ্টা ব্যায়াম করেন বুবলী। এর মধ্যে এক ঘণ্টা যোগব্যায়াম আর অ্যারোবিকস, আরেক ঘণ্টা থাকে ট্রেডমিলে হাঁটা–দৌড়ানো–সাইক্লিংসহ বেশ কিছু ব্যায়াম। আর সবশেষ এক ঘণ্টা সাঁতার কেটে কাটান বুবলী। ঢালিউডের এই চিত্রনায়িকা বলেন, ‘সপ্তাহে প্রতিদিনই ব্যায়ামের চেষ্টা করি। খুব বেশি ব্যস্ততা থাকলে তখন বাসায় অন্তত এক ঘণ্টা যোগব্যায়াম করি। প্রায় ৪৫টা যোগাসন আমি জানি, তাই একা করতে কোনো সমস্যা হয় না।’ আট বছর ধরে এই যোগচর্চা করে যাচ্ছেন বুবলী। আর জিমে যাওয়া–আসা পাঁচ বছর ধরে। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে যেহেতু নাচ করতাম তাই স্কুল–কলেজে পড়ার সময় নাচের মধ্য দিয়ে ব্যায়াম হয়ে যেত। এরপর আস্তে আস্তে শরীরচর্চায় নিজের পরিধি বাড়াই।’

বুবলীর টিপস

আমি কখনো জিরো ফিগারে বিশ্বাসী নই। আমি মনে করি, সুস্থতার জন্য ব্যায়ামটি সব সময় সবারই করা উচিত, সেটা যদি ৩০ মিনিট পার্কে বা ছাদে হাঁটাও হয়, তা–ও ভালো। পাশাপাশি শারীরিক শক্তির জন্য উপযুক্ত ডায়েট মেনে চলা উচিত। না খেয়ে শরীরের বাড়তি মেদ কমানো কোনো সমাধান নয়। তাই বলব ব্যায়ামের বিকল্প নেই। এটা মনকে ভালো রাখবে, শরীরও সুস্থ রাখবে।

আরিফিন শুভ। ছবি: আনন্দআরিফিন শুভ

ঢালিউডের সুদর্শন নায়ক আরিফিন শুভ বরাবরই স্বাস্থ্যসচেতন। শুটিং কিংবা আড্ডা যেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়, সবখানে তাঁর ব্যায়ামপ্রীতির কথা শোনা যায়। শুটিং দেশে থাকুক বা দেশের বাইরে, ব্যায়াম তিনি বাদ দেন না। জিমে যেতে না পারলেও দিনে অন্তত ১০ মিনিট কার্ডিও করেন এই নায়ক।

ব্যায়ামের প্রতি ভালোবাসা সেই ছোটবেলা থেকে। ময়মনসিংহের ছেলে শুভ যখন ছোট ছিলেন তখন তিনি

বাবার সঙ্গে জিমনেসিয়ামে যেতেন। বন্ধুরা যখন পার্কে কিংবা মাঠে খেলাধুলা করতেন তাঁর সময় কাটত বাবার সঙ্গে ব্যায়ামাগারে। শুভ বলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন একজন পেশাদার ভারোত্তোলক। ছাত্রজীবনে তিনি ময়মনসিংহ মুসলিম ইনস্টিটিউটে নিয়মিত ভারোত্তোলন চর্চা করতেন। দেখা যেত, আমরা ভাইবোনেরা সবাই ছোটবেলায় পার্কে ঘুরতে না গিয়ে খেলতে যেতাম জিমে। অনেকের ধারণা হয়তো আরিফিন শুভ একজন অভিনয়শিল্পী—তাঁকে মানুষের সামনে আসতে হয়, তাঁদের আমাকে দেখে ভালো লাগবে, সে কারণে জিম করি। আসলে মোটেও তা নয়। ছোটবেলা থেকে আমার মধ্যে শরীরচর্চার অভ্যাস তৈরি হয়েছে।’

সপ্তাহে অন্তত চার দিন জিমে সময় কাটান আরিফিন শুভ। রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে ভোগ লাইফস্টাইলে জিম করেন তিনি। তাঁর প্রশিক্ষক সামির আনোয়ার। বাসার কাছে হওয়ায় যখন খুশি এসে জিমে সময় কাটিয়ে যান। শুভ বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ৪০-৪৫ মিনিট তো নিজেকে সময় দেওয়া উচিত।’

সবার একটা লক্ষ্য থাকে, জিমে গিয়ে ওজন কমাব বা বাড়াব বা শুধু পেশি বানাব—এই তিনটাই ভুল। এই ধরনের লক্ষ্য নিয়ে এগোলে দুই থেকে তিন দিন পর জিম ছেড়ে দিতে হবে। শরীরচর্চাকে তারা ধরে রাখতে পারবে যাদের এটা জানার ইচ্ছে থাকে, আমার শরীরের ভেতরটা কীভাবে কাজ করে, আমি তা জানতে চাই। আমি আমার শরীরের সঙ্গে খেলতে চাই।মেয়ের সঙ্গে জিমে বাঁধনআজমেরী হক বাঁধন

‘শারীরিক সুস্থতার চেয়ে বেশি মানসিক প্রশান্তির জন্য আমি জিমে যাওয়া শুরু করেছি। আমি ডিপ্রেশনে ভুগতাম। হতাশা থেকে মুক্তির জন্য ব্যায়াম করাটা আমার জন্য একদম অনিবার্য ছিল। অনেকটা করো বা মরো—এমন অবস্থা।’ কথাগুলো আজমেরী হক বাঁধনের।

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে জিম শুরু করেন বাঁধন। জিম শুরুর সময় তাঁর ওজন ছিল ৭৯ কেজি, এখন ৬০। বনানীতে জিম করেন তিনি। দিনে দুই ঘণ্টা করে সপ্তাহে চার–পাঁচ দিন ব্যায়াম করেন বাঁধন। তিনি বলেন, ‘যাঁরা জিম করেন, সবার কাছে এটা একসময় নেশার মতো হয়ে যায়। আপনি যতই করবেন, ততই ভালো লাগবে। মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য শুরু করলেও শারীরিক গঠনটাকেও আপনার মানসিক অবস্থাকে বদলে দেয়।’

বাঁধনের মতে, ‘অনেককে বলতে শুনি, যাঁরা জিম করেন, তাঁরা মনে হয় না খেয়ে থাকেন। এটা ভুল। যাঁরা জিম করেন, তাঁদের ডায়েট মেনে খেতে হয়। আমাদের প্রশিক্ষক তো বলেন, নিয়মিত ব্যায়ামের পাশাপাশি ভালো ভালো খাবার খেতে। সামুদ্রিক মাছ, মুরগি খেতে বলেন। মাঝেমধ্যে রুটিন করে গরুর মাংসও খেতে বলেন।’

বাঁধনের টিপস

ব্যায়াম করা উচিত নিজের ভালোর জন্য। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ ডায়াবেটিসে ভোগেন। অনেকেই ভোগেন হাইপার টেনশনে, কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকে। একেবারে অল্প বয়সে এসব ধরা পড়ে। এরপরও সারা দিন অফিস ও বাসায় কাজ করে যান তাঁরা। অথচ তাঁর যে সঠিক ও সুন্দর জীবন কাটানো উচিত, এটা নিয়ে ভাবেন না অনেকে। আমাদের এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নিজের শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য সময় বের করতেই হবে।আফরান নিশোআফরান নিশো

আফরান নিশো ব্যায়াম করেন সুস্থ থাকার জন্য। মেটাবলিক সিনড্রোম, উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ টু ডায়াবেটিস, হতাশা, উদ্বিগ্নতা—এসব থেকে মুক্তি ও নিয়ন্ত্রণের মহৌষধ ব্যায়াম—এমনটাই বিশ্বাস নিশোর। তিন মাস ধরে ঢাকার উত্তরার একটি জিমে নিয়মিত ব্যায়াম করছেন তিনি। নিশো বলেন, ‘জিম করছি আমার বাচ্চার জন্য। আমরা যখন বুঝতে শিখেছি, তখন বাবাকে খুব একটা পরিপাটি–ফিটফাট পাইনি। আমার বাচ্চার বয়স সাড়ে চার বছর। সাত-আট বছর বয়সে গিয়ে যখন আমার বাচ্চা বুঝতে শিখবে, তখন যেন তাঁর কাছে “গুড লুকিং বাবা” হই, সেটা আমার ইচ্ছা। আমার বয়স এখন ৪০–এর কাছাকাছি। তাই আমাকে সুস্থ থাকতে জিম করতে হয়।’

সপ্তাহে চার থেকে ছয় দিন ৪০–৫০ মিনিট ওয়েট ট্রেনিং করছেন নিশো। ৩০ মিনিট পর্যন্ত করেন কার্ডিওভাসকুলার ট্রেনিং।

আফরান নিশোর টিপস

নিজের ভুল থেকে শেখো। তিনটি জিনিস খুব জরুরি—নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও নিয়মমাফিক ঘুম। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, সুস্বাস্থ্যের ৮০ ভাগ খাদ্যাভ্যাস আর ২০ ভাগ শরীরচর্চার ওপর নির্ভর করে।

শবনম ফারিয়াশবনম ফারিয়া

শুধু নিজের দেহগড়নকে ঠিক রাখতে নয়, যেকোনো অসুস্থতা থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্যও নিয়মিত ব্যায়ামের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শবনম ফারিয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা যে ধরনের কাজ করি, সেখানে সময়ের ঠিক নেই, খাদ্যাভ্যাসের ঠিক নেই, ঘুমের ঠিক নেই—এ কারণে আমরা খুব অল্পতে ক্লান্ত হয়ে যাই। অসুস্থও হয়ে পড়ি। সব অনিয়মকে শরীরচর্চার মাধ্যমে নিয়মে আনার জন্য তাই জিমে গিয়ে নিজের জন্য একটু সময় ব্যয় করতেই হয়। ব্যক্তিগতভাবে, আমার টাইপ টু ডায়াবেটিস আছে। এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য হলেও ব্যায়াম করতে হয় আমাকে। এটা চিকিৎসকের নির্দেশ। তা ছাড়া পিসিওএস নামে আমার একটা রোগ আছে, যেটার জন্য আমার ওজন বাড়ে দ্রুত। নিয়মিত ব্যায়াম করার সেটাও একটা কারণ।’

গত বছরের অক্টোবর থেকে জিমে যাওয়া শুরু করেন শবনম ফারিয়া। কয়েক মাস বিরতি দিয়ে ঈদের পর আবারও শুরু করেছেন শরীরচর্চা। ঢাকার বনানীর একটি জিমে প্রতিদিন অন্তত দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা ব্যায়াম করেন তিনি। ফারিয়া বলেন, ‘আমার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। শুটিং থাকলে একসময় যাই, না থাকলে আরেক সময়। চেষ্টা করি, প্রতিদিন একটু সময়ের জন্য হলেও ওয়ার্কআউট করতে।’

শবনম ফারিয়ার টিপস

মানুষের মাথায় থাকতে হবে, ‘আমি ওজন কমাব, ফিট থাকব। আমাকে ফিট থাকাই লাগবে।’ মাথায় থাকলে, যে কেউ সময় বের করতে পারবেই।

বিদ্যা সিনহা মিমবিদ্যা সিনহা মিম

লাক্স–চ্যানেল আই সুপারস্টার মিম বিজ্ঞাপনচিত্র ও চলচ্চিত্রের কাজে ব্যস্ত আছেন। তাই পর্দায় নিজেকে উপস্থাপনের জন্য ফিট থাকা নিয়েও তাঁর যত চিন্তা। মিম বলেন, ‘পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে অনিয়মিতভাবে ব্যায়াম করেছি। কিন্তু তিন বছর ধরে জিমে গিয়ে নিয়মিত ব্যায়াম করছি। শুরুতে শখে ব্যায়াম করতাম। দেখা যেত একটু হাঁটতাম, অ্যাবসের ব্যায়াম করতাম, ট্রেডমিলে দৌড়াতাম—এই। কিন্তু এখন আমি অনেক বেশি সিরিয়াস।’

মিমও শুভর মতো ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে ভোগ লাইফস্টাইলে ব্যায়াম করেন। মিম বলেন, ‘প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে ব্যায়াম করি। এই সময়টা আমি ভীষণ উপভোগ করি।’

মিমের টিপস

আমি যখন ব্যায়াম বন্ধ রাখি, তখন ডিপ্রেস থাকি। আবার যখন জিম করি, খুব সতেজ হয়ে যাই। প্রত্যেক মানুষের তাই ব্যায়াম করা উচিত। অন্তত সুস্থ জীবনযাপনের জন্য এক ঘণ্টাই যথেষ্ট।

বাপ্পী চৌধুরীবাপ্পী চৌধুরী

নারায়ণগঞ্জের ছেলে বাপ্পী চৌধুরী বাবার সঙ্গে ছোটবেলায় হাঁটতে বের হতেন। সেটা থেকেই শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে ওঠে তাঁর।

নিজেকে সুস্থ রাখতে প্রতিদিন ফ্রিহ্যান্ড ব্যায়াম করেন বাপ্পী। তিনি বলেন, ‘ব্যায়ামের পর শরীরটা সক্রিয় থাকে, আর তখন যেকোনো কাজ চাইলেই আরামে করা যায়। ক্লান্তি ভর করে না।’

বাপ্পী চৌধুরী বলেন, ‘এখন প্রতিদিন তিন ঘণ্টা ওয়ার্কআউট করি। তবে আমি বেশি জোর দিই ফ্রিহ্যান্ড ব্যায়ামের ওপর।’

বাপ্পী এখন ঢাকার বাসিন্দা। ঢাকার বনানীর একটা জিমে কয়েক বছর ধরে নিয়মিত ব্যায়াম করেন।

বাপ্পীর টিপস

সুস্থ থাকতে হলে ব্যায়ামের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসও নিয়মের মধ্যে আনতে হবে। বাইরের খাবার খাওয়া যাবে না। সাধ্যমতো প্রতিদিন কমপক্ষে এক ঘণ্টা ফ্রিহ্যান্ড ব্যায়াম এবং হাঁটা খুব কার্যকর। তাহলেই নিজেই উপলব্ধি করতে পারবেন, আপনি ভালো আছেন।

Related Articles

Back to top button