মতামত

প্রানের শহর সিলেট

শেখর ভট্টাচার্য

মধ্য বয়স পেরিয়ে গেলেই মানুষ কিছুটা স্মৃতি কাতর হয়ে পড়ে। এরকম নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত মানুষদের নানা ভাবে মুল্যায়ন করা যায়। ইতিবাচক মানুষেরা হয়তো বলবেন লোকটা প্রচ- রোমান্টিক, প্রানশক্তিতে ভরপুর প্রচ- আশাবাদী এক ব্যক্তিত্ব। কেউ হয়তো বলবেন জীবনের সব সৃষ্টিশীলতার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়াতে স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার মুল্যহীন চেষ্টা করে যাচ্ছে মানুষটা। যে, যেভাবেই বিশ্লেষণ করুন না কেনো, মানুষ তাঁর অতীতের হিরন্ময় সময়কে নিংড়েই ভবিষ্যতের পথরেখা তৈরি করে, এ কথা তো উড়িয়ে দেয়া যাবে না।
জীবিকার প্রয়োজনে ঢাকাতে স্থায়ী ভাবে বসবাস করতে হচ্ছে সপরিবারে। রাজধানী ঢাকার শিশায় ভরপুর বাতাস, জ্যামে অচল পরিবেশে থাকতে থাকতে ইদানিং হাপিয়ে উঠেছি। মনে হয় পালিয়ে যাই, উন্মুক্ত বিশুদ্ধ অক্সিজেনের নির্মল কোন শহরে। কিন্তু জীবন যুদ্ধের ময়দান থেকেতো পালাবার পথ নেই। এ কারণেই মনে হয় চোখ বুজে স্মৃতির জানালা খুলে দিলে, নাড়ি পুতে রাখা শহরের কথা খুব মনে পড়ে আজকাল। যে শহর আমাকে খুব কাছে টানে, যে শহরের অলি গলির ধুলা মেখে আমার শৈশব, কৈশোর এবং প্রাক যৌবনের কিছু কাল পর্যন্ত কেটেছে, সে শহর কিন্তু আজকের সিলেট শহর নয়। আমি চোখ বুজলেই দেখি ষাট, সত্তর দশকের পাড়া গাঁয়ের মত একটি শহরকে। আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ, আনন্দময় শৈশব উপহার দেয়ার মত উপযুক্ত একটা শহর। যে শহরে অসংখ্য দীঘি, বড় বড় খেলার মাঠ, পথের দুই পাশে কৃষ্ণ চূড়া, শিরিষ, তমাল, বটের মতো শত শত গাছে ঘেরা ছবির মতো গোছানো এক শহর। চৌহাট্টা মোড় থেকে রিকাবী বাজার হয়ে মধুশহীদ পর্যন্ত পথের দুপাশে কৃষ্ণচুড়া, পলাশের গাছ গুলো পথিকের মনের ক্ষুধা, চোখের প্রশান্তি দুটোই মিটাতো। প্রকৃতির কোলে, প্রকৃতির ছায়ায় বেড়ে ওঠার অপার সুযোগ ছিল “আমার সিলেট শহরে”। নিরীহ ও অপার সৌন্দর্যের আধার, গাছগুলো নিঃশেষ হয়ে গেলো অগোচরে। নাগরিক সমাজ, সিটি কর্পোরেশন কারো মধ্যে কি সেরকম উদ্বেগ আছে? বৃক্ষ শোভিত অনিন্দ্য সুন্দর রূপটিকে কি আমরা আবার ফিরিয়ে আনতে পারিনা। এরকম পথ দিয়ে চলা বড়ই বেদনাদায়ক আমাদের জন্য, আমরা যারা এ পথের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করেছি, আমাদের শৈশব, কৈশোরে।
সিলেট শহরের তালতলাতে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের সুরম্য অট্টালিকা যেখানে হয়েছে, সেখানে একটি চমৎকার দীঘি ছিল। দীঘিটার কথা ভুলতে পারিনা, তাপদগ্ধ গ্রীষ্মের অনেক দুপুর, অনেক সকাল সেখানে ডুব সাতার,উলটো সাতার, প্রজাপতি সাঁতার দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটেছে। আহারে শৈশব, প্রকৃতির মধ্যে বেড়ে উঠার অপার আনন্দের শৈশব। শুধু কি তালতলার দীঘি, আমি এক নিশ্বাসে সেকালের সিলেট শহরের অন্তত এক ডজন দীঘির নাম বলে যেতে পারবো । এই দীঘি গুলো ছিল, এ শহরের এক একটি সৌন্দর্য তিলক, থোকা থোকা ফুলের স্তবক, যে স্তবক দিয়ে শহরটি তাঁর গলায় পরত অপরুপ সৌন্দর্য ম-িত একটি মালা। আমাদের চোখে হয়তো বিশেষ ভাবে এ সৌন্দর্য ধরা পড়তো না, সিলেটে যারা বেড়াতে আসতেন তারা সকলেই সিলেটের দীঘিগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করতেন। কোথায় গেলো ঐ দীঘিগুলো, সুযোগ পেলেই সিলেটে যখন বেড়াতে যাই, বুকের ভিতর এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করি। সকলের কাছে আন্তরিক অনুরোধ, দাবী, আবেদন বাকী দীঘিগুলোকে আর হত্যা করবেন না, নগরপিতা সহ সকলের সুদৃষ্টি থাকলে অবশিষ্ট দীঘিগুলোকে অবশ্যই আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারবো।
শহরের কোল ঘেঁষে, একে বেকে চলে যাওয়া চিত্র শিল্পীর আঁকা ছবির মতো সুন্দর একটা নদী, এরকম নদী পাওয়া কয়টি শহরের ভাগ্যে থাকে? বন্যা সতরকীকরন বিভাগে কিংবা আবহাওয়া বিভাগের নথিতে কি লেখা আছে আমি জানি না, কিন্তু আমার স্মৃতির ঝাপি খুলে দেখেছি, সুরমা নদীর যে অংশ সিলেট শহর দিয়ে গিয়েছে ষাট কিংবা সত্তরের দশকে সুরমার কুল উপচে ঐ অংশ দিয়ে কখনো নদীর পানি শহরে ঢুকতে দেখিনি। বড়ই শান্ত, ভাবগম্ভীর এক অনিন্দ্যসুন্দর নদী সুরমা। চাঁদনিঘাটের পার ঘেঁষে কাজীবাজার দিয়ে সুরমা নদীর পারে ষাটের দশকে আজকালের জবরদস্তি সংস্কৃতি অর্থাৎ “নদী দখল” দেখিনি কখনো। নদীর পারে হাতে গোনা কয়েকটি নারাকেল, দা, ঝাড়ুর দোকান ছিল, পারে দাঁড়িয়ে সুরমার সৌন্দর্য উপভোগে কোন বাধা ছিলোনা। অনেকেই নদীর পারে বিকেল বেলা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে নদীর সৌন্দর্য ও বিশুদ্ধ বাতাসে সতেজ হয়ে আসতেন। চাঁদনি ঘাটের পাশেই ক্বীন ব্রীজ, যাকে সিলেটের ঐতিহ্যের প্রতীক হিসাবে ধরে নেয়া হয়, তাঁর উপর থেকে সুরমার সৌন্দর্য উপভোগ তা ছিল ভিন্নমাত্রার বিনোদন। গণমানুষের কবি দিলওয়ার ক্বিন ব্রীজ থেকে সুরমার গভীর থেকে ভেসে উঠা সূর্যের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে তাঁর বিখ্যাত কবিতা “ক্বীন ব্রিজে সূর্যোদয়” লিখে ফেলেন। কবি, কবিতা ও নদী সকলেই অমর হয়ে আছেন, সুরমার নান্দনিক মাধুর্যের মধ্যে। আমরা আমাদের সুরমাকে কি চোখের সুরমার মতো যতœ করে সাজিয়ে রাখতে পেরেছি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পেলাম একদল ব্রিটীশ এমপি’ সিলেটে সুরমা নদীতে নেমে আমাদের ফেলা বর্জ্য অপসারন করে নদীকে দোষণমুক্ত, সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য অত্যন্ত আন্তরিক ভাবে কাজ করছেন। বর্জ্য অপসারনের ছবি ও সংবাদটি আমার কাছে যুগপৎ বেদনা দায়ক ও লজ্জাজনক। আমরাতো কতো পরিকল্পনাই করে থাকি, আমরা সকলের পরামর্শে, সকল নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সুরমাকে তার আদি ও অকৃত্রিম রুপে নিয়ে এসে, সুরমার সৌন্দর্যকে আরও নয়ন মনোহর করে তুলতে পারি না। আমার মনে হয় এ কাজের জন্য সিটি কর্পোরেশন ও নগরবাসীর কার্যকরী উদ্যোগ প্রয়োজন। গতানুগতিক প্রচেষ্টা এ ‘ক্ষেত্রে তেমন সুফল নিয়ে আনতে পারবে না। আমরা চাই না আবার ব্রিটিশ এমপি দের মতো অন্য কোন অতিথি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে যাক, তোমাদের বর্জ্য তোমাদেরকেই অপসারণ করতে হবে। প্রকৃতির অপার দান সুরমা নদী, তাকে যদি আমরা রক্ষা না করি, তাহলে এর দায় আমাদেরকে বহন করতে হবে। পরবর্তী প্রজন্মকে যথাযথ উত্তর দিতে হবে বর্তমান নগরবাসীদের।
এরকম প্রকৃতি শোভিত শহর কতোটি আছে বাংলাদেশে? আম্বরখানা মোড় থেকে মালনীছড়ার পাশ ঘেঁসে যে রাস্তাটি গিয়েছে, তাঁর দুপাশে চা বাগান, চা গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ছায়া বৃক্ষ, ঢেউ খেলানো পাহাড়, তাঁর মুল্য কি আমরা অনুধাবন করতে পারি? জানিনা। এই রাস্তাটি অন্তত এখন একই রকম আছে। আমাদেরকে দৃষ্টি রাখতে হবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ধ্বংস করে আমরা যেন কোন উন্নয়ন কর্মকা- না করি। আমাদের সংস্কৃতি বোধ, রুচি, ঐতিহ্যের প্রতি ভালবাসা সব কিছু কি নিম্নগামী হচ্ছে দ্রুত? আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো যেমন পাপ, নাগরিকদের প্রতি আস্থা হারানো অন্যায্য। আমাদের শহরে মানবিক গুণে পরিপূর্ণ, উচ্চ সাংস্কৃতিক মানের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের অভাব ছিলোনা কোন কালে, এখনো নেই তা’ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
আমাদের নদী, আমাদের বৃক্ষ, আমাদের দীঘি, আমাদের টিলাগুলোকে রক্ষা করে, আমাদের প্রানের নগরীকে সৌন্দর্য, সুষমায় উচ্চমানের নগরী হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। প্রকৃতির অপার ও অকৃত্রিম দান সমুহকে রাক্ষা করতে না পারলে আমাদের বিবেকের কাছে ও আমাদের জবাবদিহি করতে হবে যেমন করতে হবে উত্তর প্রজন্মের নাগরিকদের কাছে। এজন্য নাগরিক সমাজকে যেভাবে এগিয়ে আসতে হবে একই ভাবে সেবাদানকারী সংস্থা সমুহকে ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। নাগরিক সমাজ সহযোগী বন্ধু, দার্শনিক ও পথ প্রদর্শক হিসাবে কাজ করবেন , আর সেবা সংস্থাগুলো সিটি কর্পোরেশনের নেতৃত্বে পরিকল্পিত ও কার্যকরী উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যাবে। শুভ বুদ্ধি সম্পন মানুষ ও সেবাদান কারী সংস্থা গুলোর মহৎ উদ্দেশ্য সমুহের যদি সমন্বয় ঘটে তাহলে কোন কিছুর অর্জন’ই অসম্ভেব নয় ।সব দল, সব মত, সব আদর্শকে এক মোহনায় মিলিত হতে হবে। আশা করি শুভ বুদ্ধির সমন্বিত শক্তির জয় ঘটবে অচিরেই। সিলেটতো শুধু সিলেট নগরবাসির সম্পদ নয়, সিলেট নগরী বাংলাদেশেরও গর্বের ধন।
লেখক : কলামিস্ট।

Related Articles

Back to top button