মতামত

শিক্ষক মানেই কি “শিক্ষাবিদ” ?

শমশের আলম ::

এইতো অল্প কিছুদিন হয় , ফেইসবুকে কোথায় যেন পড়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের মিলনমেলার কথা । সেখানে দুই প্রজন্মের মিলনমেলা উপলক্ষ্যে যে অনুষ্ঠানটি হলো, তার স্লোগানটি ছিল প্রায় এরকমই যে – “শিক্ষাবিষয়ে ডিগ্রি না থাকলে কাউকে শিক্ষাবিদ বলা যাবে না।”

যতটুকু জানা যায়, শিক্ষাবিজ্ঞানে যে সমস্ত সিলেবাস রয়েছে, সেখানে আবশ্যিকভাবেই শিক্ষা নিয়ে প্লেটো-সক্রেটিস কী বলেছেন ও শিক্ষার উপর তাদের দর্শন , অ্যারিস্টটল শিক্ষাকে কীভাবে ভাবতেন তার বিশদ রূপরেখা আলোচনা , রুশো-ভলতেয়ার কোন ধারণা থেকে শিক্ষা প্রক্রিয়াকে কীভাবে সাজাতে চেয়েছিলেন ও সে সর্ম্পর্কে তাদের দর্শন ও ভাবধারা কেমন ? রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা বিষয়ে ভাবধারা কেমন ছিল ? ‘মারিয়া মন্তেসরির’ শিক্ষাচিন্তা কীভাবে শিশুদের শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে ইত্যাদি নানা বিষয় পড়ানো হয় এবং নানা মনিষীর নানান সংজ্ঞা ও কর্মযজ্ঞের সাথে পরিচিত হতে হয়।

কঠিন সত্য হলেও বলতে হয়, যে মহাপুরুষদের শিক্ষার সংজ্ঞা অধ্যয়ন করে আজকের অনেক শিক্ষক নিজেদের ‘শিক্ষাবিদ’ বলে দাবি করতে চান, তাদের অনেকেরই কিন্তু শিক্ষাসম্পর্কে কোনো ডিগ্রি ছিল না , অর্থাৎ তারা কেউই ঐ স্লোগান অনুসারে শিক্ষাবিদ ছিলেন না ।

এই পৃথিবীতে কেউই অজ্ঞান নয় । প্রত্যেকের মধ্যে কোনো না কোনো বিষয়ে জ্ঞান আছে এবং সেই জ্ঞান যদি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম থেকেই অর্জিত হতে হয় তবে শিক্ষা অর্জনের যে অন্য মাধ্যমগুলো যেমন – আনুষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক সবগুলোই একজন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে কি কোনই গুরুত্ব বহন করবে না ?

এ বিষয়ে অনেকেই যুক্তি দাড় করিয়েছেন যে, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা না করলে যেমন কৃষিবিদ হওয়া যায় না , মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ না করলে যেমন ডাক্তার হওয়া যায় না , ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে পড়াশুনা না করলে যেমন প্রকৌশলী হওয়া যায় না , পদার্থবিজ্ঞানে পড়ালেখা না করলে যেমন পদার্থবিদ হওয়া যায় না, ঠিক তেমনি শিক্ষাবিজ্ঞান থেকে ডিগ্রি না নিলে কাউকে ‘শিক্ষাবিদ’ বলা যাবে না ।

এখানে অল্প দ্বিমত পোষণ না করে পারছি না যে ‘শিক্ষাবিদ’ উপাধী যুক্তিযুক্ত করার ক্ষেত্রে এসব উদাহরণ কতটুকু যৌক্তিক ? শিক্ষা বিষয়টি বৃহত্তর অর্থে সামাজিক বিজ্ঞানের অাওতায় একটি জটিল বিষয় এবং এর সাথে ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার বেশ কিছু ব্যবধান আছে ।

যে উদাহরণগুলো দেয়া হয়েছে, সেগুলো মূলত নির্দিষ্ট কিছু শর্ত নির্ভর এবং এই বিষয়গুলো শর্ত ও কার্যকারণকে কেন্দ্র করেই বিকশিত এবং এক্ষেত্রে বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রাধান্য অনেক বেশি, যা সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ততটুকু প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

আবার শিক্ষাবিজ্ঞানে যে সমস্ত কোর্স পড়ানো হয়, সেগুলো কোন প্রতিভাবান ব্যক্তি যদি নিজে থেকেই পড়াশুনা করেন, তাহলেও শিক্ষা সম্পর্কে তার জ্ঞান একজন আই,ই,আর গ্র্যাজুয়েটের চেয়ে কম হবে না।

শিক্ষাবিষয়ে ধারাবাহিক কর্ম ও গবেষণা , শিক্ষা বিষয়ে মৌলিক চিন্তা ভাবনা এমনকি মৌলিক চিন্তা না থাকলেও অন্তত বিষয়ভিত্তিক ও প্রেক্ষাপট নির্ভর চিন্তা যা প্রচলিত শিক্ষার নীতি ও ধারাকে উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সেটিকেও যদি ‘শিক্ষাবিদ’ হওয়ার যোগ্যতা হিসেবে ধরে নেয়া হয় তাহলে অনেকের প্রশ্ন প্রফেসর জাফর ইকবাল কেন শিক্ষাবিদ নন ?

দেশের শিক্ষা নিয়ে জনাব জাফর ইকবাল যে পর্যন্ত কাজ করেছেন, শিক্ষায় ডিগ্রি নেয়া অনেক শিক্ষাবিদরা কিংবা শিক্ষাবিজ্ঞানের ডিগ্রিধারীদের চেয়ে কি তিনি কোন অংশে কম ?

তবে এ ও সত্য যে, বর্তমান যুগের শিক্ষা ব্যবস্থা একান্ত সার্টিফিকেটমুখী হওয়াতে একজন ব্যক্তি যে বিষয়ে শিক্ষালাভ করেন সেই বিষয়েই তার কদর বেশি। বিশেষতঃ এই বিশেষজ্ঞ-বিষয়ক-যুগে ব্যক্তি যে বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করবেন সেই বিষয়ে তার কর্মের সুযোগও বেশি। ফলে তার ক্ষেত্রে ওই বিষয়ে ‘বিদ’ হওয়ার সুযোগ ও যোগ্যতা অনেকখানি বেড়ে যায়।

তবে এ বিষয়টিও যথার্থ যে, শিক্ষাবিষয়ে পাঁচ বছর পড়াশুনার কারণে একজন আই,ই,আরের শিক্ষার্থী শিক্ষা বিষয়টি যেভাবে আয়ত্ত করবেন, বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যত পড়াশুনা ও কাজ করতে উদ্যোগী হবেন, তেমনটি অন্যদের ক্ষেত্রে না ঘটার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু তাই বলে অন্য কেউ যে শিক্ষা নিয়ে মৌলিক কিছু করতে পারবেন না এমন ভাবাও উচিত নয় ।

আবার এটাও ঠিক যে, আমাদের দেশে নাম ও পদবীর ক্ষেত্রে এক ধরনের নির্লজ্জ প্রতিযোগীতা দেখা যায় , যে যার মতো পদবী-পরিচয় নিজের নামের শেষে বসিয়ে দেয়ার একটা প্রবনতায় অনেকে পিছিয়ে থাকতে রাজী নন ।

বাস্তবিকতা এখানে যে, একজন শিক্ষক মানেই তিনি শিক্ষাবিদ নন । অন্য কোনো বিশেষজ্ঞতা কিংবা শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের কোন স্বীকৃতি না রেখে কেবল অর্থনীতি পড়ালে তিনি সাধারনত অথর্নীতির শিক্ষক । তিনি কোনক্রমেই অর্থনীতিবিদ হতে পারেন না । কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক প্রভাষক আজকাল আর নিজেকে যেমন কৃষিবিদ বলতে দ্বিধা করেন না , ঠিক তেমনি একজন হাইস্কুলের শিক্ষকও নিজের নামের আগে ‘শিক্ষাবিদ’ লিখতে তাঁর কোন দ্বিধা বা জড়তা নেই ।

আসলে কোনটি পদবী, আর কখন কোথায় কি বলা দরকার সেই পার্থক্যটুকু করার মতো বিবেক কি এই শিক্ষিত সমাজের আদৌ নেই ? তাঁরা আজকাল এমন একটি অসম প্রতিযোগীতায় নেমেছেন যে তাঁরা গোটা সমাজকে বোকা ভাবছেন ।

অবশ্য শুধু ব্যক্তিকে দোষ দিচ্ছি না । আমাদের মিডিয়া দেখুন ! বক্তৃতার মঞ্চ অথবা আলোচনার টেবিল দেখুন! বিশেষণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা এতটাই উদার যে , পত্রিকায় দু-একটা লাইন লিখলেই একজন কলামিস্ট হয়ে যান, একটু বয়স বাড়লেই তিনিই হয়ে যান গবেষক । পরিবেশ নিয়ে লিখলে তিনি ‘পরিবেশবিদ’, শিক্ষা নিয়ে লিখলে তিনি ‘শিক্ষাবিদ’। সমাজ নিয়ে লিখলে তিনি সমাজবিদ । ‘ বিদ’ এখন বলতে গেলে অনেকটা নাজুক অবস্থায় মধ্যে আবর্তিত।

সুতরাং সবকিছু বিবেচনা করে পরিশেষে বলা যায় , যারা আজকে শিক্ষায় ডিগ্রি ছাড়া শিক্ষাবিদ হওয়া যাবে না বলে দাবি তুলেছেন , তারাও সম্ভবত এই বিষয়টি খেয়াল করেই দাবিটি উত্থাপন করেছেন ।

নিশ্চিত বলা যায় ও এমনটি যথার্থ উদাহরণস্বরূপ প্রমানিত যে অন্য মারফত কিংবা নিজে নিজে আজকাল অনেকে শিক্ষাবিদ হয়ে গেছেন এমন মানুষের সংখ্যাও এদেশে কম নয় । দেশের শিক্ষার কী অবস্থা তা তাদের দেখলেই বুঝা যায় । কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো যারা শিক্ষা নিয়ে পড়াশুনা করছেন, তারা এই স্লোগান দিবেন কেন ?

‘শিক্ষাবিদ’ শব্দটি যতোটুকু না অহংকারী তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এটি একটি স্বীকৃতি ও সম্মান । তা হতে হবে হয় রাষ্ট্রীয় অথবা সামাজিক স্বীকৃত কোন প্রতিষ্ঠানের অানুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে দেয়া একটি সার্বজনীন স্বীকৃতি ।

আমি মনে করি সার্টিফিকেট দিয়ে এ স্বীকৃতি অর্জন করা যায় না । কাজের মাধ্যমই ফুটে উঠবে একজন শিক্ষক জাতীয় কাজের মাধ্যমে আদৌ শিক্ষাবিদ হওয়ার এই সম্মানটুকু অর্জন করেছেন কিনা ? তা না হলে মনের জোরে শিক্ষাবিদ হওয়ার দাবিটুকু কেবল অসার ও হাস্যকর হয়েই থাকবে । সুতরাং আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে যে , ‘উপাধী’ শব্দটি আদান করা হয় না ; ইহা প্রদান করার বিষয় বটে ।

ফেইসবুকে কোন এক শিক্ষার্থী ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, “শিক্ষাবিদ হওয়ার স্বপ্ন আমি অবশ্যই দেখি কেননা শিক্ষা বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান এবং এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ ও গবেষণা করার অভিজ্ঞতা যার আছে তিনিই তো প্রকৃত শিক্ষাবিদ ।

আসুন আজ থেকে আমরা আর কোন
ভূয়া নামসর্বস্ব শিক্ষাবিদকে শিক্ষাবিদ না বলি, এমনকি এদেরকে নিজেদের শিক্ষাবিদ হিসেবে দাবি করতেও না দেই । না হলে কদিন পরে আমিও কিন্তু আমার নামের সাথে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা অর্থনীতিবিদ টাইটেল লাগিয়ে বসব, তখন আবার আমাকে পাগল বলে মারতে আসবেন না কিন্তু !”

Related Articles

Back to top button