সিলেট

সিলেটে আরিফ-মুক্তাদিরের নিয়ন্ত্রণে বিএনপির চার সংগঠন

সিলেট অফিস :: সিলেটে বিএনপির চার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করছেন দলের কেন্দ্রীয় ২ নেতা। তাদের দু’জন অনেকটা সিন্ডিকেটের মত দেখভাল করছেন বিএনপির চারটি সহযোগী সংগঠন। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আরিফুল হক চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সিলেট শ্রমিক দল ও কৃষক দলের কমিটি। আর দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের ছায়াতলে রয়েছে ছাত্রদল ও যুবদলের কমিটি। সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির কার্যক্রম চলছে অনেকটা তাদের নিজস্ব আদলে। তবে সুবিধা আদায় করতে বিএনপির অনেকেই মুক্তাদিরের পরামর্শ নিয়ে চলেন বলে জানা গেছে। কারণ দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে খন্দকার মুক্তাদিরের রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে আরিফের সম্পর্কের কমতি ছিলনা। বর্তমানে খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় আরিফ অনেকটা বেকায়দায় পড়েছেন। যার কারণে দলের বিভিন্ন কমিটিতে সুবিধা করতে পারছেন না তিনি।

২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর খন্দকার মুক্তাদিরের তদবিরেই সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের কমিটি আসে এক যুগ পর। ২০০২ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের কমিটি গঠনের পর চলে যায় দীর্ঘ ১২ বছর। এরপরে ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের জন্য সিলেটের অনেক বিএনপি নেতা লবিং কম করেননি। কিন্তু বারবার তারা ব্যর্থ হন। সেই সময়ে নিখোঁজ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী অনেকটা সফলের পথে থাকলেও শেষমেশ কমিটি আটকে যায়। পরে যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি মরহুম কমর উদ্দিনের হাত ধরে সিলেট ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণার দ্বারপ্রান্তে আসলেও অজ্ঞাত কারণে আটকে যায় ছাত্রদলের কমিটি। অবশেষে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের বহুল প্রতীক্ষিত কমিটি আসে কেন্দ্র থেকে। এ কমিটির নেপথ্যে ভূমিকা ছিল দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের। পদবঞ্ছিত নেতারা এ কমিটির নেপথ্যের নায়ক হিসেবে মুক্তাদিরকেই দায়ী করেছেন।

ছাত্রদলের এই কমিটি আসার পর অনেক নেতাকর্মীরা মুক্তাদিরের কাছে ভীড়েন। সিলেটের রাজনীতিতে মুক্তাদিরের অবস্থান তৈরী করতে ছাত্রদল মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। আর ছাত্রদল তাদের অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করে আসছে মুক্তাদিরের বাসার সামনের একটি কক্ষকে। শুধু ছাত্রদলই নয়, নবগঠিত সিলেট যুবদলের দলীয় প্যাডে অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ছাত্রদলের ওই কক্ষকেই দেখানো হয়েছে।

এ বছরের ১৩ জুন সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয় ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ থেকে। আলতাফ হোসেন সুমনকে জেলার সভাপতি আর মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি করা হয় সুদীপ জ্যোতি এষ। জেলার সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন দিনার ও মহানগরের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান ফজলে রাব্বি আফসান। ছাত্রদলের জেলা ও মহানগরের এ কমিটিতেও খন্দকার মুক্তাদিরের হাত রয়েছে শতভাগ। যেটা কমিটি আসার পর দলের নেতারা মুক্তাদিরের বিরুদ্ধ্যে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন।

আর সর্বশেষ গত ২ অক্টোবর সিলেট জেলা ও মহানগর যুবদলের কমিটি আসে দীর্ঘ ১৯ বছর পর। সিলেট জেলা শাখায় সিদ্দিকুর রহমান পাপলুকে আহবায়ক ও মহানগরে আহবায়ক করা হয় নজিবুর রহমান নজীবকে। মহানগর যুবদলের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পান শাহ নেওয়াজ বক্ত চৌধুরী তারেক আর জেলায় সদস্য সচিবের দায়িত্ব পান মকসুদ আহমদ।

১৯ বছর থেকে সিলেটে একটি পূরণো কমিটি দিয়ে চলছিল যুবদলের কার্যক্রম। তাই নতুন কমিটিতে সিলেট বিএনপির অনেক নেতা, কমিটি নিজেদের আদলে নেয়ার চেষ্টা করে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। সিলেট যুবদলের মূল পদে জেলা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাদিকুর রহমানকে পছন্দ ছিল মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর। কিন্তু জেলা ও মহানগর যুবদলের আহবায়ক কমিটি মুক্তাদির তাঁর নিজের আদলেই রেখেছেন। তবে খন্দকার মুক্তাদির ছাত্রদল কিংবা যুবদলের কমিটিতে তাঁর ভূমিকা রয়েছে এটা তিনি মানতে নারাজ। তিনি বারবার বলেছেন, কেন্দ্র থেকে এসব কমিটি দেয়া হয়েছে।

সিলেট ছাত্রদলের পূরণো কমিটি(সাঈদ-রাহাত, খালেদ-লোকমান)’র সময় দেখা গেছে বড় বড় মিছিল খন্দকার মুক্তাদিরের বাসার সামনে থেকে বের হতো। বর্তমান কমিটির নেতারাও কাজির বাজার থেকে মিছিল বের করতে দেখা গেছে। এজন্যই অনেকে মন্তব্য করতে দেখা গেছে, সিলেট ছাত্রদল ও যুবদল নিয়ন্ত্রণ করেন দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

সিলেট যুবদলের নতুন কমিটি ঘোষণার পর সদর উপজেলা যুবদলের কর্মী সমাবেশ অনুষ্টিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। মুক্তাদিরকে কেন প্রধান অতিথি করা হয় এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা যুবদলের আহবায়ক সিদ্দিকুর রহমান পাপলু বলেন, তিনি (মুক্তাদির) সিলেট ১ আসন থেকে নির্বাচন করেছেন। এই আসনে দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন মুক্তাদির। সুতরাং তাঁকে প্রধান অতিথি করা হয়েছে।

তবে গত ২৭ অক্টোবর যুবদলের ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সদ্য বিলুপ্ত কমিটির নেতারা সিলেটে সভা করেন। এতে সকল বিএনপি নেতাদের দাওয়াত দেয়া হলেও খন্দকার মুক্তাদিরকে দাওয়াত দেননি আয়োজকরা। আরিফ পন্থী হিসেবে পরিচিত জেলা যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, সিলেটে অবস্থান করেন দলের যেসব কেন্দ্রীয় নেতা, শুধু তাদেরকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে। মুক্তাদির ঢাকায় অবস্থান করেন বিধায় তাঁকে সভায় আমন্ত্রণ করা হয়নি।

অপরদিকে সিলেটে কৃষক ও শ্রমিক দলের কমিটি গঠনের বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আরিফুল হক চৌধুরীর একক হাত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ছাত্রদল ও যুবদলের কমিটি মুক্তাদিরের নিয়ন্ত্রণে থাকায় আরিফ ভাগ বসান কৃষক ও শ্রমিক দলের কমিটিতে। মেয়র আরিফকে দলের তেমন কোন কার্যক্রমে দেখা না গেলেও এই দুই সংগঠনের সভায় বেশিরভাগ সময় তাঁকে দেখা যায়।

গত ২৫ নভেম্বর সিলেটে কৃষক দলের কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক কমিটির সভায় আরিফুল হক চৌধুরী প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। জেলা কৃষক দলের আহবায়ক শহীদ আহমদ চেয়ারম্যান জানান, মেয়র আরিফ কৃষক দলের সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন। তাছাড়া তিনি কেন্দ্রীয় কৃষক দলের যুগ্ন আহবায়ক থাকায় তাঁকে অতিথি করা হয়েছে। কৃষক দলের অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে দেখানো হয় মেয়র আরিফের কুমারপাড়ার বাসা। এ ব্যাপারে শহীদ আহমদ চেয়ারম্যান বলেন, দলের স্থায়ী কোন কার্যালয় না থাকায় মেয়রের বাসাকে অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। চেয়ারম্যান শহীদ আরো বলেন, আমি কোন ব্যক্তি বিশেষের কাছে দায়বদ্ধ নয়। দলের প্রয়োজনে যিনি ডাকবেন তাঁকে পাশে পাবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর শহীদ আহমদ চেয়ারম্যানকে আহবায়ক করে করে জেলা কৃষক দলের ৫১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি করা হয়। আর ২৬ সেপ্টেম্বর আব্দুল মান্নান পুতুলকে আহবায়ক করে মহানগর কৃষক দলের ৩৩ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। এতে প্রথম সদস্য রাখা হয়েছে আরিফুল হক চৌধুরীকে।

এর আগে গত ৬ জুলাই মেয়র আরিফের বাসায় জেলা ও মহানগর শ্রমিক দলের কমিটি গঠনের লক্ষ্যে সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি সালা উদ্দিন সরকার। ঐ সভায় সোরমান আলীকে জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করা হয় আব্দুর রহমানকে। আর মহানগর শ্রমিক দলে ইউনুস মিয়াকে সভাপতি ও মঞ্জুর আহমদ চৌধুরী লিটনকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়।

গত ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবসের আলোচনা সভার আয়োজন করে জেলা ও মহানগর শ্রমিক দল। আরিফের কুমারপাড়াস্থ বাসায় এ সভা সম্পন্ন হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন আরিফুল হক চৌধুরী।

কৃষক ও শ্রমিক দলের কমিটি তাঁর(আরিফ)নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কি-না জানতে ফোন করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সিলেটে বিএনপি ঘরণার নেতারা বলে থাকেন, আরিফের কৃষক-শ্রমিক দল আর মুক্তাদিরের ছাত্র ও যুবদল। তাদের দু’জনের সিন্ডিকেটে চলছে এই চারটি সংগঠন।

Related Articles

Back to top button