মতামত

মানবিক বাংলাদেশের জন্য প্রার্থনা

।। রামেন্দু মজুমদার ।।

আনন্দ-বেদনার স্মৃতি নিয়ে আমাদের জীবনে ফিরে এসেছে বিজয় দিবস। আনন্দ— পাকিস্তানিদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, স্বাধীন বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার জন্য। আর বেদনা—স্বজন হারানোর শোকে। সেদিন বাংলাদেশে এমন পরিবার কমই ছিল, যারা তাদের কাউকে না কাউকে হারিয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে, সেসব দুঃসহ স্মৃতি আমরা কত অল্প দিনেই ভুলে গেছি।

গত ৪৮ বছরে কত পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করলাম আমরা। রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ইতিহাস বদলে গেল। যে সাম্প্রদায়িকতাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে চিরতরে নির্মূল করতে পেরেছি ভাবলাম, ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িকতা আবার সমাজকে গ্রাস করল। তার হাত ধরে এলো জঙ্গিবাদ। আর সবই হয়েছে ক্ষমতাসীনদের কখনো সরাসরি মদদে আবার কখনো উদাসীনতায়। আমাদের জাতিগত পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিল আমাদের ধর্মীয় পরিচয়।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতির অন্যতম ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। মতলববাজরা তাকে ব্যাখ্যা করল ধর্মহীনতা বলে। কিন্তু আমরা তো সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরা সবাই নিজ নিজ ধর্ম পালন করেই ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণ করেছি। একজন প্রকৃত ধার্মিক মানুষই তো অসাম্প্রদায়িক। ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে আমরা বোঝাতে চেয়েছি, রাষ্ট্র সব ধর্মকে সমান মর্যাদা দেবে, কোনো বিশেষ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করবে না। সবচেয়ে বড় কথা, ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা রাখা হবে। ধর্ম আমাদের ব্যক্তিগত বিষয়।

আজ যদি আমরা বিশ্বের দিকে তাকাই তবে দেখব, ধর্ম এখন মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ধর্মীয় উন্মাদনায় কী রক্তক্ষয়ী সংঘাত, জাতিগত নিপীড়ন। আমাদের এ অঞ্চলের কথাই যদি বলি, তবে দেখব ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিবেশী দেশ ভারতে কিভাবে সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। সেদিন ভারতেরই এক পত্রিকায় পড়লাম, গবেষকরা দেখিয়েছেন ভারতে লক্ষাধিক বৌদ্ধমন্দির ধ্বংস করে সেখানে হিন্দু মন্দির গড়ে তোলা হয়েছে। সেসব জায়গায় কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ওই সব মন্দিরের স্থাপনা ধ্বংস করার দাবি তোলেনি কিংবা ভেঙে ফেলতে উদ্যত হয়নি। কিন্তু বাবরি মসজিদের ক্ষেত্রে আমরা কী দেখলাম? কর সেবকদের ধর্মীয় উন্মাদনায় একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।

সাম্প্রতিক সময়ে আরেক প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন চালিয়েছে, তার প্রতিক্রিয়ায় বিপদে পড়েছে বাংলাদেশ। একাত্তরের কথা মনে করে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক বিবেচনায় এগারো লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছেন। কিন্তু অবস্থা যে দিকে যাচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে এদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ বিষয়ে বিশ্ববিবেক যেভাবে জাগ্রত হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশ কত দিন এ বোঝা বহন করবে? আর পরিবেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রতিদিনই নতুন শিশুর জন্ম হচ্ছে। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে কী এ বিপুলসংখ্যক কর্মহীন মানুষকে আটকে রাখা সম্ভব? এক অজানা শঙ্কার মধ্যে রয়েছি আমরা।

প্রায় অর্ধশতাব্দী আমরা পার করেছি স্বাধীন বাংলাদেশে। সব সূচকেই বাংলাদেশের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হয়েছে। আমাদের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তি আমাদের দেশে বিপ্লব ঘটিয়েছে। কিন্তু হতাশ হই তখন, যখন দেখি বৈষয়িক উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের নৈতিক অবনতি হয়েছে চরম। নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতন, শিশু ধর্ষণ, তুচ্ছ ঘটনার জন্য মানুষ হত্যা—এসব ঘটনা যখন প্রতিদিনের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় তখন মনে হয় আমরা কি সত্যিই সভ্য সমাজের মানুষ বলে দাবি করতে পারি?

এবারের বিজয় দিবসে আমাদের প্রার্থনা হোক, আমরা যেন মানুষ হয়ে উঠি। বাংলাদেশ হয়ে উঠুক একটি যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক, প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক বাংলাদেশ। তবেই তো বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন অর্থবহ হবে।

লেখক: সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

Related Articles

Back to top button