মতামত

আসলেই কি যুদ্ধ চান না ট্রাম্প

।। ড. তারেক শামসুর রেহমান ।। পারস্যীয় উপসাগরীয় অঞ্চল আপাতত শান্ত। ইরাকে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির ওপর ইরানি মিসাইল হামলার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে প্রেস ব্রিফিং করেছেন, তার পর থেকেই পারস্যীয় উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ নয়, তিনি শান্তি চান! যারা ট্রাম্পকে চেনেন ও জানেন, তারা তার এই বক্তব্যে কিছুটা অবাকই হয়েছিলেন। তিনি কি সত্যি সত্যিই শান্তি চান? আমেরিকার মতো বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি আক্রান্ত হবে আর দেশটি তার ‘প্রতিশোধ’ নেবে না, কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাবে না, ‘শান্তির বাণী’ শোনাবে- এটা কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য? তাই উপসাগরীয় অঞ্চল বর্তমানে ‘শান্ত’ রয়েছে। তবে কত দিনের জন্য, সে প্রশ্নই এখন উঠেছে।

যে প্রশ্নটি এখন অনেক বিশ্নেষকের লেখনীতে এসেছে, তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রতিশোধ’ নিল না কেন? তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ভয় পায়? নাকি সম্ভাব্য একটি ‘যুদ্ধে’ চীন ও রাশিয়ার জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল, যা পরোক্ষভাবে তথাকথিত ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’র সূচনা করতে পারত? যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন যে খুব সহজে ‘শান্তির বাণী’ শোনায় না, তা সবাই জানেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে অবস্থিত ‘টুইন টাওয়ারে’ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল। ওই সন্ত্রাসী হামলায় ভবন দুটি ধ্বংস হয়েছিল। বলা হয়েছিল, আল কায়দা নামে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। ১৮ বছর পর ওই ঘটনার ‘পেছনের কাহিনি’ এখনও আলোচিত হয়

ওই ঘটনার রেশ ধরে আফগানিস্তান ‘দখল’ হয়ে গিয়েছিল ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর। আর সেই ‘দখলি স্বত্ব’ আজও রয়ে গেছে। ২০০৩ সালে ইরাকের কাছে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র রয়েছে- এ অভিযোগে ইরাক আক্রমণ ও ইরাক দখল হয়ে গিয়েছিল। ইরাকে আজও শান্তি আসেনি। এর পরের ইতিহাস ২০১১ সালে। দৃশ্যপট লিবিয়া। উৎখাত ও হত্যা করা হয়েছিল গাদ্দাফিকে। লিবিয়া আজ অকার্যকর একটি রাষ্ট্র, সেখানে নেই কোনো কার্যকরী সরকার। পরের দৃশ্য সিরিয়া, ২০১৪। জন্ম হলো আইএস নামে একটি জঙ্গি সংগঠনের। তারা প্রতিষ্ঠা করল একটি ‘জিহাদি রাষ্ট্র’- অনেক মুসলমান দেশের তরুণরা আকৃষ্ট হলো আইএসের মতাদর্শে। তারা ‘যুদ্ধে’ গেল। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান আক্রমণ চালাল সিরিয়ায় কিন্তু সিরিয়া আর ইরাক এক ছিল না। সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত ও হত্যা করা সম্ভব হলেও, বাশার আল আসাদকে ‘হত্যা’ ও উৎখাত করা গেল না। রাশিয়ার হস্তক্ষেপে ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর ঘটনা ঘটল না সিরিয়াতে। এই প্রথম মার্কিন নীতি ‘ধাক্কা’ খেলো সিরিয়াতে! পরের পরীক্ষা সোলাইমানিকে নিয়ে। মার্কিন ড্রোন বিমান ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ড কমান্ডার সোলাইমানিকে খুঁজে বের করে তাকে হত্যা করল। এর ‘প্রতিশোধে’ ইরানি হামলা হলো ইরাকে অবস্থিত মার্কিনি স্থাপনায়। একটা যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল আবার মধ্যপ্রাচ্যে। বিশ্বের মিডিয়া যখন তাকিয়ে ছিল উপমহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে, তখন সবাইকে অবাক করে দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বললেন তিনি শান্তি চান! আসলেই কি তিনি শান্তি চান? নিজের দেশের ভেতরে নানা কারণে তিনি বিতর্কিত। প্রতিনিধি সভায় ইতোমধ্যে তিনি অভিশংসিত হয়েছেন। এই জানুয়ারিতে সিনেটে অভিশংসনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। চীনের সঙ্গে ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ আপাতত ‘স্থগিত’। এমন এক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করে তিনি নিজে ‘হুকুম’ দিলেন সোলাইমানিকে হত্যা করার। কিন্তু ‘লাভের গুড়’ কি তিনি ঘরে তুলতে পারলেন? না, তিনি পারলেন না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলো। সোচ্চার হলেন কংগ্রেস সদস্যরা। তারা এখন উদ্যোগ নিচ্ছেন তার ‘যুদ্ধ ক্ষমতা’ হ্রাস করার। যুদ্ধ যে মার্কিন অর্থনীতিতে আঘাত করবে তা বোধ করি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।

একটি তথ্য দিই। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ গবেষণা থেকে জানা গেছে, ২০০১ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে, তাতে এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৫ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। মিলিয়ন নয়, ট্রিলিয়ন ডলার। এই যুদ্ধে ৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষ মারা গেছেন, আর ১ কোটি মানুষ যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন (সিএন বিসি, ১৪ নভেম্বর ২০১৮)। অথচ যুদ্ধে যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয়েছে, ওই পরিমাণ অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দারিদ্র্য ও সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।

সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে (২০১৭) ১২ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের নিচে বসবাস করে। ১৬ দশমিক ২ শতাংশ শিশু (যাদের বয়স ১ থকে ৬ বছর) দারিদ্র্যসীমার নিচে। কৃষ্ণাঙ্গদের মাঝে এই দারিদ্র্যের হার বেশি; ২০ দশমিক ৮ শতাংশ। আর বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ২৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর কোনো স্বাস্থ্যসেবা বীমা নেই। অর্থাৎ তারা স্বাস্থ্যসেবার আওতাভুক্ত নয়। সরকারি তথ্যমতে, ৫ লাখ ৫৩ হাজার মানুষের (০.১৭ শতাংশ) থাকার কোনো জায়গা নেই। অথচ যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বড় অর্থনীতির দেশ, এক নম্বরে তার অবস্থান। সামাজিক খাতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনেক নিচে। অথচ দেশটি কিনা যুদ্ধের পেছনে খরচ করছে প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন ডলার।

ট্রাম্প ব্যবসায়ী। বড় ব্যবসায়ী থেকে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। তিনি ভালো করে বোঝেন অর্থনীতিকে। এখন যদি ইরানে তিনি ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ শুরু করে দেন, তাহলে এই যুদ্ধ কোথায় যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে যাবে, তা তিনি ভালো করে বোঝেন। যুদ্ধে না যাওয়ার আরও একটি বিবেচনা কাজ করে থাকতে পারে। আর তা হচ্ছে, যুদ্ধের খরচ বহনে মিত্র দেশগুলোর অনীহা ও বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর অসহযোগিতা। ২০০৩ সালের ইরাক সংকটে কিংবা ২০১১ সালে লিবিয়ায় বোমা বর্ষণের সময়, এমনকি সিরিয়ার ক্ষেত্রেও (আইএস উৎখাতে) ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র তার পাশে পেয়েছিল। এবার সেই সমর্থন যুক্তরাষ্ট্র পায়নি। ভুলে গেলে চলবে না, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৫ সালে যে পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল, তাতে ইউরোপের মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছিল তার পাশে (পি-৫+১, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ছিল জার্মানি)। এবার জার্মানি ও ফ্রান্সকে পাশে পাচ্ছেন না ট্রাম্প।

অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন, ইউরোপে ন্যাটো বাহিনী মোতায়েনের খরচ ইউরোপীয় দেশগুলোকে বহন করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র আর একা বড় খরচ বহন করবে না। সুতরাং ট্রাম্প নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন ন্যাটো মিত্ররা এবং সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্ররা সম্ভাব্য যুদ্ধের খরচ বহন করবে। কিন্তু এ ব্যাপারে সবুজ সংকেত দেয়নি ইউরোপীয় ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো। সম্ভবত ট্রাম্প আরও একটি বিষয় বিবেচনায় নিয়েছেন। আর তা হচ্ছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী। এতে বিশ্বে জ্বালানি তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে। একটি তথ্য দিই। স্টেট অব হরমুজ প্রণালি দিয়ে ২০১৫ সালে প্রতিদিন ১৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল (বিশ্বের মোট সরবরাহকৃত তেলের ২০ শতাংশ) সরবরাহ করা হয়েছিল। এই তেলের ওপর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরশীল। অন্যদিকে পারস্যীয় গালফ অঞ্চল থেকে বিশ্বে প্রতিদিন ২৫ শতাংশ তেল ও ৩৫ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ করা হয়। যুদ্ধ শুরু হলে তাতে বিঘ্ন ঘটতে পারে। ফলে বিশ্বে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে। এতে করে যুক্তরাষ্ট্রসহ তার মিত্র দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ইরান সংকট ঘনীভূত হলে নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধ-২ এর ধারণা আরও শক্তিশালী হবে। ইতোমধ্যে চীন-রাশিয়া-ইরানের মাঝে ‘ঐক্য’ হয়েছে। এই তিন শক্তি সম্প্রতি একটি সামরিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। যে কোনো ‘যুদ্ধ’ চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিকে ইরানের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে আমরা দেখব। ইতোমধ্যে ইরান ঘোষণা দিয়েছে তারা ৬ জাতি পারমাণবিক চুক্তি (২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ও ২০১৬ থেকে কার্যকর) থেকে সরে আসছে। দেশটির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তেহরান আর পারমাণবিক কর্মসূচিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, মজুদ, গবেষণা ও উন্নয়ন সীমিত রাখার শর্ত মেনে চলবে না। এর অর্থ পরিস্কার, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রক্রিয়ায় নিজেদের আরও জড়িত করবে। এটি যুক্তরাষ্ট্র তথা ইসরায়েলের ভয়ের কারণ। এটি সবাই জানেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যুদ্ধে যেতে ইসরায়েলি লবি প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল। যুদ্ধে গেলে তা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে পুনরায় সেখানে ক্ষমতায় বসাতে সাহায্য করত (১৭ মার্চ সেখানে নির্বাচন)। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই ‘চাপ’ উপেক্ষা করতে পেরেছেন বটে; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বিশ্বাস করা সত্যিকার অর্থেই কঠিন। সুতরাং আপাতত ‘শান্তি চান’ বলে ঘোষণা দিয়ে তিনি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য সময় নিলেন কিনা, সেটাই দেখার বিষয়।

অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক
tsrahmanbd@yohoo.com

Related Articles

Back to top button