মতামত

হোয়াটস আপ, ফেসবুক, ইমেইল কিংবা মেসেঞ্জার : ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল জালিয়াতি!

।। ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী।। দিন দিন টেকনোলজি যত উন্নত হচ্ছে সেই সাথে আমাদের ব্যক্তিগতজীবন ততই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে টেকনোলজি এক দিকে আমাদের জীবনে যেমন সুফল আনছে অন্যদিকে এর সঠিক ব্যবহার না করার জন্য অথবা আমাদের অজ্ঞতা কিংবা সরলতার জন্য আমরা প্রতিনিয়ত বিড়াম্ভনার শিকার হচ্ছি আধুনিক বদৌলতে প্রতারক চক্রের দৌরাত্ব দিন দিন বাড়ছে টেকনোলজি ব্যবহার করে প্রতারক চক্র প্রতারণার নিত্য নতুন কৌশল আবিষ্কার করছে আর আমরা অনেক সময় না বুঝে প্রতারক চক্রে সেই ফাঁদে পা দিচ্ছি সুতরাং এই প্রতারকচক্রের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য প্রতারকদের কৌশল সম্পর্কে আমাদের জানা একান্ত অবশ্যক আমি ব্যাক্তিগত ভাবে বেশ কয়েকবার এই সকল ডিজিটাল প্রতারকদের মোকাবেলা করেছিএছাড়া আমার বন্ধুবান্ধব এবং ক্লাইন্টদের কাছ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা থেকে জনস্বার্থে প্রতরণার কৌশল এবং রক্ষার উপায় সম্পর্কে আমি আজ আলোকপাত করার চেষ্টা করবো

হোয়াটস আপ মেসেজ:

যেমন ধরেন হোয়াটস আপ মেসেজে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের যন্ত্রণার এখন নিত্য সঙ্গী হলো হোয়াটস আপ মেসেজ হোয়াটসআপ গ্রূপ আর হোয়াটস আপ মেসেজ এখন আমাদের মোবাইলের বেশিরভাগ জিবি দখল করে আমরা যেখানে যা পাই তাই গ্রুপে শেয়ার করি কারণে অকারণে শেয়ার আর শেয়ার রাত নাই দিননাই, বুঝে না বুঝে শুধু শেয়ার কিন্তু এই শেয়ারের ভয়ঙ্কর দিক গুলো আমরা জানিনা কিছুদিন আগে হোয়াটস আপ নিয়ে বিলেতের খবরের শিরোনাম হলো সৌদির ক্রাউন প্রিন্স নাকি বিলিওনিয়ার আমাজানের মালিকের কাছে হোয়াটস আপে একটি ভিডিও পাঠিয়েছিলেন আর ভিডিওর মধ্যে এমন একটি ভাইরাস ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিলো যা দিয়ে আমাজন বসের মোবাইলের সব তথ্য নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিলো ঘটনা কতটুকু সত্য তা বিচার বিবেচনার বিষয় কিন্তু এক্সপার্টরা এর সম্ভবনা এড়িয়ে দেননি এখন চিন্তা করুন একটি হোয়াটস আপ মেসেজ দিয়ে কতটুকু করা সম্ভব! সুতরাং  হোয়াটসআপ মেসেজ দিয়ে আপনি শুধু আপনাকে বিপদে ফেলছেননা, বরংযাদের শেয়ার করছেন তারা সবাই বিপদে পড়ছেন

পরামর্শ: হোয়াটস আপ মেসেজ কাউকে পাঠানোর আগে ভালো করে মেসেজের উৎস সম্পর্কে জেনে নেন এর প্রয়োজনীয়তা পরীক্ষা করুন শেয়ার করার আগে নিজের বিপদের পাশাপাশি অন্যের বিষয়টি বিবেচনা করুন শুধু মাত্ৰ নির্ভর যোগ্য লোকের কাছ থেকে পাওয়া মেসেজ শেয়ার করুন নিজেদের মধ্যে বিশেষ করে না জানা উৎস থেকে পাওয়া ভিডিও মেসেজ পাঠানো শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন

ফেসবুক:

এখন দেখা যাক ফেসবুক আমরা ফেসবুকে সাধারণত চটকদার আপে হূমড়ি খেয়ে ফেলি যেমন ৬০ বছর বয়সে আপনার কেমন ছবি হবে? অথবা ডোনাল্ড ট্রাম্প আপনার প্রশংসা করছেন কিংবা আপনি ট্রাম্পের সাথে মোলাকাত করছেন এমন সব আজগুবি আপে নিজের ছবি ডাউন লোড করে শেয়ার করি আপনি কি একবার ভেবেছেন এই সকল আপ করা তৈরী করেছে? অথবা নিজে ডাউন লোড করে আপনার তথ্য আপ তৈরীকারি প্রতিষ্টানের কাছে শেয়ার করছেন কিনা? প্রায়ই দেখা যায় আমাদের ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়ে যায় অনেকে নিয়ে অনেক বিড়ম্ভনার মধ্যে পড়েন আবার এই হ্যাক আইডি নিয়ে কিছু দিন আগে বাংলাদেশে অনেক লঙ্কা কান্ড ঘটে গেল আসলে ফেসবুক আইডি হ্যাক হওয়ার পেছনে এই আপগুলোবিশেষ ভাবে দায়ী

পরামর্শ: চটকদার আপে নিজের তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন যেকোন আপে তথ্য শেয়ার করার আগে আপের উৎস সম্পর্কে জানুন তথ্য শেয়ার করা নিরাপদ কিনা ভাবে দেখুন। সুতরাং চটকদার আপে নিজের ছবি সংযোজন করে নিজের বিপদ ডেকে আনবেননা

ইমেইল:

আমরা প্রতি নিয়ত ইমেইল পাই মিলিয়ন পাউন্ড লটারি জিতেছেন, আফ্রিকা থেকে আপনার একাউন্টের মাধ্যমে মিলিয়ন পাউন্ড টাকা পাঠানোর অনুরুধ এমনকি ট্যাক্স অফিস থেকে টাকা ফেরত পাবেন ইত্যাদি এক্ষেত্রে প্রতারকরা খুব কৌশলে আপনার ব্যাংক একাউন্টের নম্বর পাঠানোর অনুরুধ করে ব্যাংক একাউন্ট নম্বর দিলেই আপনারএকাউন্টে টাকা চলে আসবে ইউকেতে যারা বসবাস করেন তারা মোটামুটি  এই জালিয়াত চক্র সম্পর্কে অভ্যস্ত বাংলাদেশে এখন ইমেইলের ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে এই জালিয়াত চক্রের ভর বেড়েছে প্রায়ই ফোন আসে ইমেইলে এই সকল চটকদার খবরপাবার তথ্য সেদিন একজনকে অনেক করে বুঝলাম এগুলো ভুয়াকিন্তু বেচারা নাছোড় বান্দা তার স্বপ্ন মিলিয়ন পাউন্ড ! সুতরাং আমার কথা শুনার তার সময় নাই ইমেইল অনুযায়ী দুই মিলিয়ন পাউন্ড লটারির টাকা পাবার জন্য প্রথমে দুই হাজার ডলারের ড্রাফট পাঠাতে বলা হয় তার পর আসে আইনজীবীর জন্য আরো চার হাজার ডলার, সবশেষে ব্যংকের আটকানো টাকা ছুটানোর জন্য চাওয়া হয় আরো হাজার ডলার সর্বমোট ১২ হাজার ডলার পরিশোধ করার পর যখন আর কোন খবর আসেনা তখন আমাকে আক্ষেপ করে বলে ভাই আপনার কথা শুনা উচিত ছিলো আমি তখন তাকে বললাম লন্ডন থেকে মিলিয়ন পাউন্ড লটারির টাকা তোমাকে কেন দিবে তুমি লটারি কিনলেনা হঠা করে তোমাকে একজন ইমেইল দিলো আর তুমি তার কথা বিশ্বাস করলে, আমারকথা শুনলে না

পরামর্শ:

ইমেইলের একাউন্ট খুললেই মিলিওনিয়ার হওয়া যায়না আর কেউ ফাও কাউকে টাকা দেয়না এই সকল ভুয়া ইমেইলের উপর ভর করেকোন প্রকার লেনদেন করবেননা অন্যতায় নিজের বিপদ নিজেইডেকে আনবেন

আপেল অথবা স্মার্ট পে:

আপেল অথবা স্মার্ট পের নামে প্রতারক চক্র ইমেইল দিয়ে বলে আপনার একাউন্ট থেকে কেউ একজন আপ কিনেছে আর এজন্য/ দিনের মধ্যে আপনার একাউন্ট থেকে নিয়মিত ভাবে চার্জ করাশুরু হবে আপনি অর্ডার বাতিল করতে হলে লিংকে গিয়ে করতে হবে যখনি লিংকে যাবেন আপনার ব্যংক একাউন্টের সকল তথ্য চাইবে আর তথ্য দেয়ার সাথে সাথে আপনার একাউন্ট হ্যাক করবে

পরামর্শ:

এই সকল ইমেইল ইগনোর করবেন এগুলো পরিপূর্ণ ভুয়া প্রয়োজনে সেন্ডার ইমেইল এড্রেস চেক করলে দেখবেন একটি ভুয়া এড্রেস থেকেএই ইমেইল করা হয়েছে তারপর যদি সন্দেহ হয় তাহলে আপনি সরাসরি আপেল এবং স্মার্ট পের সাথে টেলিফোনে কথা বলে নিশ্চিত হতে পারবেন খবরদার তাদের লিংকে কখনো অর্ডার কেন্সেল করার জন্য আপনার ব্যংকের তথ্য দিবেন না আর ভুলে যদি দিয়ে ফেলেন তাহলে সাথে সাথে ব্যংকে ফোন করে জানান

টেলিফোন কল:

HMRC টেক্সট অফিসের নাম দিয়ে ফোন করে আপনার বিরুদ্বে টেক্সফাঁকির অভিযোগে মামলা করা হয়েছে কিছুক্ষনের মধ্যে আপনাকে পুলিশ গ্রেফতার করবে গত মাসের মধ্যে এই রকম কিছু কল আমি ব্যক্তিগত ভাবে পেয়েছি আমি তখন কলারকে জিজ্ঞেস করলাম তার ঠিকানা দেয়ার জন্য  সাথে সাথে ফোন কেটে দিলো আমার মনে হয়েছে সে বুঝে ফেলেছিলো ভুল জায়গায় কল দিয়েছিলো

পরামর্শ:

এই সকল টেলিফোন কল ইগনোর করবেন এগুলো পরিপূর্ণ ভুয়া। প্রয়োজনে ভয় না করে সরাসরি টেক্স অফিসের সাথে টেলিফোনে কথাবলুন মনে রাখবেন টেক্স অফিস আপনার অগোচরে কেস করেপুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করেনা টেক্সের সকল অভিযোগ সবসময় চিঠিপত্রের মাধ্যমে আদান প্রদান হয়

ব্যাংক একাউন্ট জালিয়াত চক্র:

আপনাকে ফোন করে বলবে আপনার একাউন্ট হ্যাক হয়ে গেছে অথবা আপনার একাউন্ট থেকে কেউ টাকা তুলছে ব্যাংকের নাম বলবে টেলিফোন নম্বর দিবে আপনি তাদের ফোন করলে বুঝবেন আপনি আপনার নিজের ব্যাংক অথবা কার্ডের অফিসেই ফোনকরছেন আপনাকে এমন ভাবে ধান্দা লাগবে আপনার বুঝার উপায়নাই যে আপনি প্রতারক চক্রের মধ্যে পড়েছেন আপনার কাছ থেকেকৌশলে ব্যাংক একাউন্ট নম্বর, পিন কোড, এমাউন্ট সব কিছু নিয়েনিবে তারপর আপনার একাউন্ট থেকে সব টাকা নিয়ে উধাও হবে

পরামর্শ:

এরকম কোন কল পাবার পর তাদের দেয়া টেলিফোন নম্বরে ফোন না করে, আপনার নিজের কাছে যে ব্যংকের যে টেলিফোন নম্বর রয়েছে সেটাতে ফোন করবেন বিশেষ করে ব্যাংক কার্ডের পেছনে দেয়া নম্বর তখন আপনি নিশ্চিত হতে পারবেন কি হচ্ছে টেলিফোনে কল করে আপনার কোন তথ্য চাইলে দিবেন না

টেক্সট মেসেজ:

ইদানিং আপনি টেক্সট মেসেজ পাবেন যেমন আপনার ইমেইল একাউন্ট, ফেসবুক একাউন্ট অথবা ব্যাংক একাউন্ট পাসওয়ার্ড কেউ একজন বদলে ফেলেছে ঠিক করতে হলে আপনাকে বলা হবেআপনি টেক্সটের মধ্যে যে লিংক দেয়া আছে, এই লিংকের মধ্যে গিয়ে বদল করতে হবে মনে রাখবেন এই লিংক হলো একটি ফাঁদ যখনি আপনি লিংকে পাসওয়ার্ড দিবেন সাথে সাথে হ্যাকার আপনার সকল তথ্য নিয়ে যাবে

পরামর্শ:

আমার পরামর্শ হলো এরকম টেক্সট পেলে সাথে সাথে আপনার নিজের একাউন্টে গিয়ে দেখেন পাসওয়ার্ড বদল হয়েছে কিনা। টেক্সটের মধ্যে দেয়া লিংকে আপনি পাসওয়ার্ড বদল করলে ঐ পাসওয়ার্ড প্রতারকের কাছে চলে যাবে সুতরাং রকম চেঞ্জ করার আগে ভালো করে চিন্তা করবেন

প্রতারণার ফাঁদ কিংবা কৌশল লিস্ট করে শেষ করা যাবেনাপ্রতারকরা আবিষ্কার করবে নিত্য নতুন প্রতারণার ফাঁদ তাই আমাদের নিজেদের রক্ষার জন্য সব সময় খেয়াল রাখতে হবে

লেখক: প্রিন্সিপাল কেসি সলিসিটার , লন্ডন ইউকেসাবেক সাধারণ সম্পাদক, সোসাইটি অব ব্রিটিশ বাংলদেশীসলিসিটর্স ইউকে। কন্ট্রিবিউটর, ব্রিটবাংলা২৪কম।

Related Articles

Back to top button