অপূর্বর ১২-তে ১২ বাঁক

ব্রিট বাংলা ডেস্ক :: দরজা খুলে স্বাগত জানালেন অপূর্ব। আমাদের অপেক্ষাতেই ছিলেন। বসার ঘরে নিয়ে চায়ের প্রস্তাব করতে করতেই বললেন, কয়েক দিন ধরে কোমরের ব্যথা খুব ভোগাচ্ছে তাঁকে। এতই যন্ত্রণা যে বাধ্য হয়ে কাজে বিরতি নিতে হয়েছে। তাঁর মুখে আফসোসের রেখা, ১২ বছরের অভিনয়জীবনে এমনটা তো কোনো দিন হয়নি। তবে এই ব্যথা নিয়েও অপূর্ব এখন দারুণ সময় পার করছেন। উদ্‌যাপন করছেন অভিনয়জীবনের এক যুগ। এ উপলক্ষেই গত শুক্রবার তাঁর উত্তরার বাড়িতে যাওয়া। অভিনয়জীবনের বাঁকগুলো (টার্নিং পয়েন্ট) জানতে চাওয়া হয় এ অভিনেতার কাছে। গুনে গুনে ১২টি বাঁকের কথাই বললেন তিনি। লিখেছেন আদর রহমান


সৌভাগ্য, সঙ্গে পরিবার
নিজের সৌভাগ্যকে অপূর্ব তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আর প্রথম বাঁক বলে মনে করেন। আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন অপূর্ব, একটা সময় নিজেকে এ অবস্থানে কল্পনা করতে পারতেন না। তাই নিজের প্রথম ফটোশুট থেকে শুরু করে প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো, প্রথম নাটক—সবই হুট করে পাওয়া এক আশীর্বাদ মনে হয়। এই সৌভাগ্যের সঙ্গে অপূর্ব তাঁর পরিবারের পাশে থাকাকেও জীবনের বিশাল এক অর্জন বলে মনে করেন।


‘ইউ গট দ্য লুক’
বন্ধুর কথায় হুট করেই ২০০৪ সালে অপূর্ব নাম লেখান ‘ইউ গট দ্য লুক’ নামের প্রতিযোগিতায়। সে কথা মনে করে অপূর্ব বলেন, ‘একদমই না জেনে, না বুঝে এক বন্ধুর তুলে দেওয়া ছবি দিয়ে সেখানে যাই। মনে খুঁতখুঁত ছিল, হেরে গেলে কষ্ট পাব। কিন্তু জিতে গেলে কী করব, সেটা মাথায় ছিল না। এরপর “বেস্ট হেয়ার” টাইটেল জিতে যাই। পরদিন বেশ কয়েকটি পত্রিকায় ছবি আসে। প্রথমবার পত্রিকায় ছবি!’ বলতে বলতে প্রথম দিকের উত্তেজনাই অপূর্বর চোখে জ্বলজ্বল করছিল, ‘সেদিনের সেই লেখা আর ছবি আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করেছিল।’


বিজ্ঞাপনে মডেল আর অমিতাভ রেজা
প্রতিযোগিতার পরপরই পরিচয় হয় নির্মাতা অমিতাভ রেজার সঙ্গে। তখন এই নির্মাতার নির্দেশনায় একটি কফির বিজ্ঞাপনে মডেল হন। অমিতাভের সঙ্গেই দ্বিতীয়বার কাজ করেন একটি হাসপাতালের বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে। অপূর্ব বললেন, এই বিজ্ঞাপন প্রচারিত হওয়ার পর ‘যেন রাতারাতি সব বদলে গেল!’ দিনক্ষণ এখনো মনে আছে। ২০০৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর। প্রচারের কয়েক ঘণ্টা পর একের পর এক ফোন আসতে থাকে। তখনই খ্যাতির সঙ্গে পরিচিত হন অপূর্ব। অরিন সাবা নামে একজন ফোন করে বলেন, ‘ভাইয়া, আমি আপনার ভক্ত।’ অপূর্বর কাছে সে এক অন্য রকম অনুভূতি।


অভিনয়ে অভিষেক ও গাজী রাকায়েত
বিজ্ঞাপন করার পরও অভিনয়ের কথা মাথায় আনেননি অপূর্ব। সাহসটা তাঁর ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন নির্মাতা গাজী রাকায়েত। অপূর্ব বললেন, ‘একটি রেস্টুরেন্টে বন্ধুর মাধ্যমে রাকায়েত ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়। তিনি কথায় কথায় বলছিলেন, “তুমি খুব গুছিয়ে কথা বলো, কণ্ঠটাও সুন্দর। নাটক করবা?” আমি তখনো অভিনয়ের ব্যাপারে জানতাম না কিছু। তাই বলেছিলাম, আমাকে দিয়ে অভিনয় হবে না। গাজী রাকায়েত সেদিন বলেছিলেন, “আমি তোমাকে দিয়ে অভিনয় করিয়ে নেব।”’ এভাবেই আরেক দিন হুট করে অপূর্ব হাতে পেয়ে গেলেন প্রথম ধারাবাহিক নাটকের চিত্রনাট্য, যার নাম বই‍+বউ‍=বৈবাহিক।


‘রমিজের আয়না’ আর শিহাব শাহীন
তখন অপূর্ব চ্যানেল ওয়ানে একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন। অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখেন নির্মাতা শিহাব শাহীন। একদিন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সাবলাইম থেকে ফোন আসে। প্রস্তাব পান ‘রমিজের আয়না’ ধারাবাহিকে একটি বদলি চরিত্রে অভিনয় করার। তত দিনে অপূর্ব বেশ কয়েকটি নাটকে অভিনয় করে ফেলেছেন। মনে একটু দ্বিধা ছিল, বদলি চরিত্র করবেন কি না। একদিন সাবলাইমের অফিসে গিয়ে শিহাব শাহীনকে বলে ফেললেন, ‘আমাকে ডিরেকশন দিতে পারবেন না, স্বাধীনভাবে অভিনয় করতে দিতে হবে।’ সেদিনের কথা মনে করে এক গাল হেসে অপূর্ব বলেন, ‘চোখ বড় বড় করে শিহাব ভাই তাকিয়ে ছিলেন। মনে হয় কথাটাকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছিলেন। শুটিংয়ের প্রথম দিনই দেড় পাতার সংলাপ ধরিয়ে দেন তিনি। আমিও ১৫ মিনিটের মধ্যে সেটা মুখস্থ করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যাই। এক টেকে পুরো সংলাপ বলার পর প্রথম উচ্ছ্বাস দেখান শিহাব শাহীনই। এরপর থেকে শিহাব ভাই আমাকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিতেন। আমার অভিনয়জীবনে এই স্বাধীনতাটা এক বিরাট পাওয়া।’


এক্স-ফ্যাক্টর
এক নতুন অপূর্বর খোঁজ পাওয়া যায় এক্স-ফ্যাক্টর নাটকে। এর জন্য অপূর্ব পুরো কৃতিত্ব দেন শিহাব শাহীনের দেওয়া স্বাধীনতাকে। বলেন, ‘এক্স-ফ্যাক্টর একটা নতুন ট্রেন্ড চালু করে। ফ্লার্ট মানেই সেটা অশালীন বা অবমাননাকর কিছু হবে, সেই ধারণাকে ভেঙে দেয়। মইন চরিত্রটা হয়ে ওঠে এক অন্য রকম দৃষ্টান্ত। ছেলেমেয়ে সবাই যে এভাবে আমার চরিত্রটাকে ভালোবেসে ফেলবে, এটা শুরুতে আমরা ধারণাই করতে পারিনি।’


অপূর্বর নায়িকারা
অভিনেত্রী তারিনের নাম দিয়ে নায়িকাদের কথা শুরু করলেন অপূর্ব। বললেন, ‘টার্নিং পয়েন্টের কথা বলতে গিয়ে কেন নায়িকাদের নাম নিচ্ছি, এটা একটু বুঝিয়ে বলি। একটি নতুন ছেলে যখন কোনো নামী অভিনেত্রীর সঙ্গে প্রেমের দৃশ্যে অভিনয় করতে যাবে, তখন যে কী চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা বোঝানো মুশকিল। কিন্তু তারিন আপু আমার জন্য কাজটা সহজ করে দিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গেই প্রথম রোমান্টিক সংলাপ বলতে হয়েছিল। এই সাপোর্টটা এরপর আমি সব সহশিল্পীর কাছ থেকে পেয়েছি। তা না হলে প্রেমের গল্পে অভিনয় করা কঠিনই হতো!’


অতঃপর অদিতি
স্ত্রী অদিতির প্রতি অপূর্বর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। জীবনের যে বাঁকে একজন সত্যিকারের বন্ধুর প্রয়োজন ছিল, সে সময় অদিতির সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে বিয়ে হয় তাঁদের। এ অভিনেতা বলেন, ‘একটা কঠিন সময়ে আমি ওকে পাশে পেয়েছি। এখনো ও আমার প্রতিটি কঠিন আর সুন্দর সময়ের সঙ্গী। কোনো সময়ই ওকে ছাড়া ভাবা যায় না।’


আয়াশ
‘জুনিয়র অপূর্ব’ এরই মধ্যে অভিনয় দিয়ে বেশ সাড়াও ফেলেছে। গত ঈদের টেলিছবি বিনি সুতার টান-এর পর থেকে অপূর্বর ছেলে আয়াশও হয়ে উঠেছে তারকা! আয়াশের প্রসঙ্গ আসতেই অপূর্ব বললেন, ‘আমাকে একটা ছেলে থেকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে বদলে দিয়েছে আয়াশ। ওর জন্মের পর থেকেই নিজেকে পরিপূর্ণ মনে হয়।’

১০
‘বড় ছেলে’ ও মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার
অপূর্বর অভিনয়জীবনের সাম্প্রতিক বাঁকের নাম বড় ছেলে। এই নাটক যে সাড়া ফেলেছিল, সবখানে তাঁর প্রভাব এখনো আঁচ করতে পারেন এ অভিনেতা। এই নাটকের কারণেই তিনি জেতেন ‘মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার ২০১৭’র দর্শক জরিপে সেরা অভিনেতার পুরস্কার। অপূর্ব বলেন, ‘এর আগে ছয়বার মনোনয়ন পেয়েছিলাম। কিন্তু প্রতিবারই এত বড় বড় অভিনেতার সঙ্গে আমাকে পাল্লা দিতে হতো যে পুরস্কার পাওয়ার আশা রাখতাম না, মনোনয়ন নিয়েই খুশি থাকতাম। সেটাই অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই এবারের পুরস্কার ছিল নতুন এক অভিজ্ঞতা।’

১১
‘মার্চ মাসে শুটিং’ ও একটি পূর্ণ বৃত্ত
গত বছর ‘আয়নাবাজি’ অরিজিনাল সিরিজের মার্চ মাসে শুটিং নাটকে অভিনয় করেন অপূর্ব। অমিতাভ রেজার পরিচালনায় এতে অভিনয় করেন গাজী রাকায়েতও। অপূর্বর অভিনয়জীবনের দুই গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে একসঙ্গে পাওয়া গেল এই নাটকে। অপূর্ব বললেন, মার্চ মাসে শুটিং দিয়ে যেন একটি পূর্ণ বৃত্ত আঁকা হলো।

১২
‘বড় ছেলে’র পর
এখন অনেক সমীকরণই বদলে গেছে। বড় ছেলের আগে শুধু ‘প্রেমিক পুরুষ’ চরিত্রগুলো আসত অপূর্বর কাছে। এখন সেই ছকের বাইরেও অপূর্ব পরিচিতি পেয়েছেন। বাড়ির বড়-মেজ-ছোট, আদর্শ ছেলে মানেই অপূর্ব নির্মাতাদের প্রথম পছন্দ। অভিনয়জীবনের এক যুগ পার করে অপূর্ব শুধু তরুণদের নন, হয়ে উঠেছেন পরিবারের সবার।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Advertisement