আমাদের জনপ্রতিনিধিদের চরিত্ৰ কেমন হওয়া উচিত

 :: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী ::

হযরত ওমর (রাঃ) এর কথা আমরা সবাই কমবেশি জানিহযরত ওমর (রাঃ) ছিলেন ইসলাম জাহানের দ্বিতীয় খলিফা কারো কারোমতে উনি ছিলেন প্রায় ২২ লক্ষ বর্গমাইল এলাকার খলিফা বা সরকার প্রধান উনার শাসন আমলের দুটি ঘটনা দিয়ে আমার আজকের লেখা শুরু করবো একদিন শুক্রবারে মসজিদে নববীতে হযরত ওমর (রাঃ) খুৎবার জন্য দাঁড়ালেন তখন উনার পরনে ছিলো একটি নতুন পাঞ্জাবী খুৎবা চলাকালীন সময়ে মসজিদের ভিতর থেকে একজন মুসল্লি হযরত ওমর (রাঃ) কে একটি প্রশ্ন করার জন্য দাঁড়ালেন। মুসল্লিরা তখন খুব বিরক্তি প্রকাশ করলেন খুৎবার সময় আবার কিসের প্রশ্ন! তাও আবার সরাসরি হযরত ওমর (রাঃ) এবং খলিফার কাছে তিনি তখন সবাইকে থামিয়ে মুসল্লিকে প্রশ্ন করার সুযোগ দিলেন মুসল্লি বললেন, হে ওমর আপনি খলিফা হওয়ার পর থেকে দেখছি আপনি জোড়াতালি দেয়া একটি পাঞ্জাবি পরতে আর আজ দেখি আপনি নতুন পাঞ্জাবি পরেছেন আজ আপনাকে পরিষ্কার করতে হবে এই পাঞ্জাবি বানানোর টাকা আপনি কোথায় থেকে পেয়েছেন আপনি কি কোন গরিবের হক মেরে পাঞ্জাবি বানিয়েছেন? হযরত ওমর (রাঃ) তখন কিছুক্ষন নিশ্চুপ থেকে উনার ছেলে আব্দুল্লাহকে উত্তর দেয়ার জন্য বললেন আব্দুল্লাহ দাঁড়িয়ে বললেন, কিছুদিন আগে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেশ কিছু কাপড় গরিব লোকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে আর হযরত ওমর (রাঃ) এবং তিনি দুজনই এরকম এক টুকরা করে কাপড় পেয়েছিলেন তবে সরকার প্রধান হিসাবে নয় তাদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করেই তা প্রদান করা হয়েছে তিনি আরো বললেন, আমার বাবার এক টুকরা কাপড় দিয়ে একটি পাঞ্জাবি তৈরী করার জন্য যথেষ্ট ছিলো না আর সেজন্য বাবাকে আব্দুল্লাহ তার নিজের কাপড়ের টুকরা উপহার দিয়েছেন। আর হযরত ওমর (রাঃ) সেই দুই টুকরা কাপড় দিয়ে একটি পরিপূর্ণ পাঞ্জাবি বানিয়ে নিয়েছেন তখন সেই মুসল্লি মাথা নিচু করে বসে পড়লেন

আরেকটি ঘটনা এক শীতের রাতে হযরত ওমর (রাঃ) একটি বাড়ির সামনে দিয়ে যাবার সময় বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ শুনলেন কান্না শুনে বাড়ির কাছে গিয়ে বুঝার চেষ্টা করলেন বাচ্চারা কেন কাঁদছে। তাঁর কানে স্পষ্ট আওয়াজ আসলো বাচ্চারা খাবারের জন্য মাকে বারবার তাগাদা দিচ্ছিলো আর মা বারবার বলছিলেন, একটু ঘুমাও বাবা আমি রান্নাটা বসিয়ে দিয়েছি রান্না শেষ হলে তোমাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলবো বেশকিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর উনি শুনলেন বাচ্চারা বারবার কেঁদে কেঁদে মায়ের কাছে খাবার চাচ্ছে আর মা বারবার বাচ্চাদের একই সান্তনা দিচ্ছেন খেজুরের পাতা দিয়ে বানানো ঘরের ভিতর উঁকি দিয়ে তখন হযরত ওমর (রাঃ) দেখলেন ঘরের ভিতর  খুব ছোট ছোট টি বাচ্চা মায়ের পাশে শুয়ে খাবারের জন্য কাঁদছে আর মা একটি হাড়ির মধ্যে কিছু পানি এবং মদিনা ররাস্তার পাথর বসিয়ে নাড়ছে আর বাচ্চাদের মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছে যাতে তারা ঘুমিয়ে পড়ে মাও বারবার চোখের পানি মুচছেন হযরত ওমর (রাঃ) তখন দৌড় ড়াতে লাগলেন রাষ্ট্রীয় খাদ্য গুদামের দিকে এবং মধ্যেরাতে প্রহরীকে ডেকে খাবারের বস্তা নিজের কাঁদে করে ছুটলেন ঐ মহিলার ঘরেপ্রহরী তখন বাঁধা দিয়ে বললেন, আপনার কাঁধে  বস্তা মানায় না আপনি সরকার প্রধান। আমিই বস্তা বহন করবো, বস্তাটি আমার কাঁধে দিন ওমর তখন উত্তর দিলেন, বস্তা তিনি নিজেই নিবেন কেননা দ্বায়িত্ব তাঁর উপর কেয়ামতের দিন তাঁর কৃতকর্মের জন্য তিনি নিজেই দায়ি হবেন। আজ যে অসহায় মহিলা শিশুরা খাবারের জন্য কাঁদছে এর জন্য একদিন মহান আল্লাহর কাছে তাঁকেই জবাবদিহি করতে হবে

ঘরে গিয়ে মহিলাকে ডাকলেন দরজা খোলার জন্য। মহিলা বললেন, তার ঘরে কোন পুরুষ মানুষ নেই, তার স্বামী একজন সাহাবী ছিলেন এবং কিছুদিন আগে তিনি শহীদ হয়েছেন সুতরাং দরজা খোলা সম্ভব নয় হযরত ওমর (রাঃ) তখন তাঁর পরিচয় গোপন করে বললেন, তিনি তার পরিবারের জন্য কিছু খাদ্য সামগ্রী নিয়ে এসেছেন এবং আশ্বস্ত করলেন তিনি কোন ক্ষতি করতে আসেন নি মহিলা তখন দরজা খুললেন এবং ওমর তখন মহিলার কাছে খাদ্য সামগ্রী তুলে দিলেন মহিলা তখন খাদ্য পেয়ে খুব খুশি হয়ে তাঁর জন্য দোয়া করতে লাগলেন এবং দোয়ার এক পর্যায়ে বললেন, হে আল্লাহ এই লোকটির ভালো করো। তবে আমাদের খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) কে কেয়ামতের দিন তার কৃত কর্মের জন্য বিচার করো তখন হযরত ওমর (রাঃ) মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, ওমরের বিরুদ্ধে তার এতো অভিযোগ কেন? মহিলা বললেন, আমি তিনটি এতিম শিশু নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি আর আমার খলিফা একবারও আমার খুঁজ করেনা। হযরত ওমর (রাঃ) তখন মহিলাকে বললেন, ওমর হলেন রাষ্ট্রের সরকার প্রধান। তিনি ব্যস্ত মানুষ সেজন্য হয়তো তোমার খবর নেয়ার সময় হয়না মহিলা তখন বললেন, যে আমার সরকার হবে সে যদি আমার খবর নিতে না পারে তাহলে সে এই দায়িত্বে থাকবে কেন? ওমর তখন বলেন, আমি ওমরের পক্ষ থেকে তোমার কাছে তার এই ভুলের জন্য ক্ষমা চাচ্ছি। তুমি ওমরকে ক্ষমা করে দাও। মহিলা তখন বলেন, তুমি এই সামান্য খাদ্য দিয়ে যদি ওমরের পক্ষে কথা বলো, তাহলে আমার এই খাবারের দরকার নাই, তুমি এইগুলো নিয়ে চলে যাও। হযরত ওমর (রাঃ) তখন বারবার মহিলার কাছে ওমরের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছিলেন। তখন মহিলা জিজ্ঞেস করে আপনি কেন বারবার ওমরের জন্য ক্ষমা চাচ্ছেন? তখন কেঁদে কেঁদে ঐ মহিলার কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে ওমর বলেন, তুমি আল্লাহর কাছে যে ওমরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছো আমিই সেই ওমর। মহিলা তখন লজ্জিত হয়ে হযরত ওমর (রাঃ) এর কাছে উল্টো ক্ষমা চেয়ে বললেন, হুজুর আমি আপনাকে না চিনে আপনার বিরুদ্ধে অনেক কথা বলেছি। হযরত ওমর (রাঃ) তখন প্রতি উত্তরে বলেন, তুমি আমার বিরুদ্ধে দুনিয়াতে অভিযোগ করো কোন অসুবিধা নাই তবে আমাকে নিশ্চিত করো মৃত্যুর পরে কেয়ামতের দিন আমার বিরুদ্ধে তুমি কোন অভিযোগ দায়ের করবে না আর যদি তুমি করো তাহলে আমার সমস্ত জীবন বৃথা হবে

সমাজের জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত উপরের দুটি ঘটনা আলোকপাত করলে বুঝা যায় যেকোন সভ্য সমাজে দুর্যোগকালীন সময়ে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা অপরিসীম। কারণ তারা জনগণের প্রতিনিধি, সুতরাং জনগনের পাশে দাঁড়ানো তাদের শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি হলো তাদের প্রধান কাজ ৯০ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হলো বাংলাদেশ। আমাদের দেশে জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়বিশেষ করে দুর্যোগকালীন সময়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ চরম পর্যায়ে চলে যায়। জনগণের ত্রান কিংবা উপহার তারা জনগণের হাতে না দিয়ে উল্টো আত্মস্যাৎ করার অভিযোগ উঠে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কি হতে পারে শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে সকল দুর্যোগে সকল শ্রেণী পেশার মানুষ তাদের অন্তত একদিনের বেতনের টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার নজির ভুরি ভুরি কিন্ত আজ পর্যন্ত জনপ্রতিনিধিরা তাদের বেতনের টাকা সরকারি কোষাগারে দেয়ার কোন নজির নাই বরং উল্টো কোষাগার থেকে বরাদ্দকৃত টাকা আত্মস্যাতের অভিযোগ উঠে বারবার তারা কি একবার ভাবেন না এই আত্মস্যাতের পরিনাম কিভয়াবহ? এই ইহজীবনে পার পেলেও পরজনমে তাদের এই কৃতকর্মের জবাব তারা কিভাবে দিবেন সুতরাং সকল জনপ্রতিনিধিদের প্রতি অনুরুধ দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং মানুষের ন্যায্য পাওনাসঠিক মত বন্টন করুনঅন্যতায় আপনাদের একদিন কঠিন মূল্যদিতে হবে

লেখক:
ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
কন্ট্রিবিউটর, ব্রিট বাংলা২৪ এবং প্রিন্সিপাল সলিসিটার, কেসি সলিসিটর্স, লন্ডন।

Advertisement