আমার মা–বাবা ‘কুল’ না

    আহমেদ হেলাল ::: উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা প্রায়ই আফসোস করে বলে, ‘আমার আব্বু-আম্মু একদম “কুল” না।’ আবার কেউবা আনন্দিত হয়ে বলে, ‘উফ মা, তুমি “কুল”।’ এই ‘কুল’ বিষয়টা কী? লিখেছেন মনোরোগ চিকিৎসক আহমেদ হেলাল

    উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা প্রায়ই আফসোস করে বলে, ‘আমার আব্বু-আম্মু একদম “কুল” না।’ আবার কেউবা মা–বাবার প্রতি আনন্দিত হয়ে বলে, ‘ওফ মা, তুমি একটা “কুল”।’ এই ‘কুল’ বিষয়টা কী? ‘কুল’ মা–বাবা হওয়া কি জরুরি? বিষয়গুলো মা–বাবার দিক থেকেও ভাবনার আবার এই যে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা চাইছে তাদের মা-বাবা ‘কুল’ হোক, সেটাও ভাবনার বাইরে নয়। প্রথমেই দেখি ‘কুল’ বলতে কী বোঝায়। এটি হালে ব্যবহৃত একটি শব্দ, বয়স এক যুগের কম। এই ‘কুল’ বলতে কেউ কেউ বোঝায় স্মার্ট, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা আর আধুনিকতা। একজন উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরী নিজেকে হালনাগাদ রাখতে চায়, স্মার্ট হতে চায়। সেই চাওয়া থেকেই সে চায় মা–বাবাও ‘কুল’ হোক।

    তবে এই ইস্যুতে ‘কুল’–এর ওপর করা বেশ কিছু গবেষণা রয়েছে। ২০১২ সালে জার্নাল অব ইনডিভিজ্যুয়াল ডিফারেন্সেস–এ গবেষণাগুলোর সারসংক্ষেপ প্রকাশিত হয়, সেখানে ‘কুল’ বলতে বোঝানো হয়েছে বন্ধুত্বপরায়ণ, যোগ্য, হাল ফ্যাশনদুরস্ত, আকর্ষণীয়, আত্মবিশ্বাসী, আনন্দবাদী (হেডোনেস্টিক), আবেগ নিয়ন্ত্রণে দক্ষ, থ্রিল সিকিং, খানিকটা প্রথাবিরোধী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তি। এই ‘কুল’ আবার দুই ধরনের—একটি হচ্ছে ‘ক্যাশে কুলনেস’ (যুগের বৈশিষ্ট্যধারী কুলনেস), যারা যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে আধুনিক করে রাখে, সমাজে জনপ্রিয় হয়; আরেকটি হচ্ছে ‘কন্ট্রারিয়ান কুলনেস’ (প্রথাবিরোধী কুলনেস), যারা প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধাচরণ করে, প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজের মতো করে একটি স্টাইল তৈরি করে। সন্তানেরা মা–বাবার যে ‘কুলনেস’ চায়, তা মূলত যুগের বৈশিষ্ট্যধারী কুলনেস।
    এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ‘কুল’ মা–বাবা হওয়া কতটুকু জরুরি? এককথায় উত্তর হচ্ছে, তথাকথিত ‘কুল’ হওয়া মোটেও জরুরি নয়। তবে কী দরকার? দরকার হচ্ছে রেসপনসিভ মা–বাবা হওয়া, যাঁরা সন্তানের চিন্তা আর আচরণে ইতিবাচক সাড়া দিতে পারবেন। আর সন্তানের সব ধরনের চিন্তা আর আচরণে সাড়া দেওয়াটাই স্মার্ট পেরেন্টিং, তা সন্তান আপনাকে ‘কুল’ ভাবুক আর না–ই ভাবুক। তবে এ কথা প্রমাণিত, যে মা-বাবা সন্তানের চিন্তা আর আচরণে কার্যকর সাড়া দিতে পারেন, সন্তানের প্রতি রেসপনসিভ প্যারেন্টিং পরিচালনা করতে পারেন তাঁরাই কিন্তু প্রকৃত ‘কুল’ মা–বাবা হিসেবে অভিহিত হবেন সমাজের কাছে এবং সন্তানের কাছেও। সন্তানের মতো করে তার ভাষায় জগাখিচুড়ি বাংলিশ কথা বলা ‘কুল’ নয়, পশ্চিমা কায়দায় সন্তানকে সম্বোধন করাও ‘কুল’ নয়, সন্তানের মনের ভাষা বোঝাটাই ‘কুল’।
    এ জন্য প্যারেন্টিংয়ের ধরন হতে হবে স্মার্ট, রেসপনসিভ এবং ইনক্লুসিভ। স্মার্ট পেরেন্ট হতে হলে এর জন্য মা–বাবাকে চলতি হাওয়ার গতিপ্রকৃতি বুঝতে হবে, চারপাশের পরিবর্তনগুলো জানতে হবে, প্রযুক্তির ব্যবহার ও ব্যবহারের সুফল আর অতি ব্যবহারের কুফল বুঝতে হবে, সন্তানের চাওয়া–পাওয়াগুলো ধারণ করতে হবে। রেসপনসিভ মা–বাবা হতে হলে সন্তানের চিন্তা আর আচরণের প্রতিক্রিয়ায় ইতিবাচক সাড়া দিতে হবে। আর ইনক্লুসিভ প্যারেন্টিং হচ্ছে সন্তানের আর পরিবারের সব ধরনের ইস্যুতে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ও সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়ায় সন্তানের মতামত গ্রহণ করার চেষ্টা করতে হবে।সন্তানের বন্ধু হতে হবে মা–বাবাকেসন্তানের কাছে ‘কুল’ হিসেবে বিবেচিত হতে হলে মা–বাবারা যা যা করতে পারেন—
    * ‘কুল পেরেন্ট’ মূলত রেসপনসিভ আর ইনক্লুসিভ প্যারেন্টিং স্টাইল। তাই তথাকথিত, আরোপিত ‘কুল’ না হয়ে নিজের পেরেন্টিং স্টাইলকে পরিবর্তন করতে পারলে হয়ে উঠবেন আসল ‘কুল’।
    * সন্তানের বন্ধু হতে হবে। বন্ধু হওয়ার মানে এই নয় যে সন্তানের সঙ্গে কোনো অশালীন শব্দ ব্যবহার করে কথা বলতে হবে, বন্ধু হওয়ার মানে এই নয় যে সন্তানের সঙ্গে তুই–তোকারি করতে হবে, তার মতো পোশাক–আশাক পরতে হবে। বন্ধু হওয়ার অর্থ হচ্ছে, সন্তানের আবেগকে বুঝুন, সন্তানের আস্থা অর্জন করুন, সন্তান যেন বিশ্বাস করে তার মনের কথা আপনাকে বলে। পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সন্তানের মতামত গ্রহণ করুন।
    * সন্তানের বন্ধুদের সঙ্গে হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। সন্তানের বন্ধু মানেই বিপদ, এমনটা ভাবার কারণ নেই। তাদেরকে আপ্যায়ন করুন, সহাস্যে সম্ভাষণ করুন। তাদেরকে জেরা করবেন না, তাদের সঙ্গে স্নেহসূচক কথা বলুন। বাড়িতে তারা এলে বিরক্ত হবেন না। আপনার সন্তান তাদের বাড়িতে যেতে চাইলে অনুমতি দিন, তবে কোথায় যাচ্ছে নিশ্চিত হোন এবং ফেরার সময় নির্দিষ্ট করে দিন।
    * ‘এ ভালো, ও খারাপ’, ‘এর সঙ্গে খবরদার মিশবি না’, ‘ফার্স্ট বয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব কর’—এই সব বলে বিভাজন করবেন না। সন্তানকে ভালো–মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখান। এইভাবে বন্ধুত্বের বিভাজন করতে থাকলে সন্তানের সামাজিক দক্ষতা হ্রাস পাবে এবং সে পরবর্তী সময়ে ক্ষতিকর আচরণের জন্য আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
    * সন্তানের পছন্দ–অপছন্দের ওপর আপনার মতামত চাপিয়ে দেবেন না। তবে আপনার পারিবারিক, সামাজিক আর ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে সন্তানের বিচ্যুতি যাতে না হয়, সে জন্য খুব ছোটবেলা থেকেই তাকে মূল্যবোধগুলো বুঝিয়ে দিন। না বুঝিয়ে, ব্যাখ্যা না করে মূল্যবোধের চর্চা করার নির্দেশ দেবেন না।
    * আপনি সন্তানের প্রশংসা করুন। তার স্টাইল, ফ্যাশন পছন্দ না হলে ইতিবাচক সমালোচনা করুন। ব্যঙ্গ–বিদ্রূপ বা উপহাস করবেন না।
    * আপনি সামাজিক আচরণগুলো সঠিকভাবে পালন করুন। এমনভাবে আচরণ করুন, যেন আশেপাশের মানুষ আপনার সন্তানের সামনেই আপনার প্রশংসা করে। এতে আপনার প্রতি সন্তানের আস্থা বেড়ে যাবে। প্রয়োজনে আপনি সন্তানের ভালো অভ্যাসগুলো নিজেই চর্চা করুন আর সন্তানকে সেটা জানিয়ে দিন।
    * সমসাময়িক খেলা, মুভি, বই, ফ্যাশন ইত্যাদি সম্পর্কে আপনি জানার চেষ্টা করুন। সেগুলো বিষয়ে সন্তানের সঙ্গে আলাপ করুন, আপনার পছন্দ–অপছন্দ তাকে জানান। কেন পছন্দ বা অপছন্দ করছেন, সেটার ব্যাখ্যা সন্তানকে দিন। প্রযুক্তি বিষয়ে আপনার সন্তান যতটুকু দক্ষ, আপনি যেন কোনোভাবেই তার চাইতে কম দক্ষ না থাকেন। প্রয়োজনে আপনি প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নিন।
    * গম্ভীর থাকবেন না। হাস্যরসের চর্চা করুন। সন্তানের সঙ্গে এবং অন্যান্য সামাজিক পরিবেশেও।
    * প্রত্যয়ী থাকুন। কোনো বিষয় নিয়ে কনফিউশন হলেও আত্মবিশ্বাস হারাবেন না। আশপাশে কোনো সংকটময় পরিস্থিতি হলে সন্তানের সামনে সেটা এড়িয়ে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। সংকটের মুখোমুখি হয়ে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করুন। সন্তানের সামনে আইন বা নিয়ম ভাঙবেন না, মিথ্যার আশ্রয় নেবেন না, অন্যায় করে জেতার চেষ্টা করবেন না।
    * নিজে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকুন। অসুস্থ মা–বাবার পক্ষে ‘কুল’ হওয়া কঠিন। তাই রোগ পুষে রাখবেন না। নিজের রোগকে আড়াল করবেন না।
    * পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন থাকুন, পরিষ্কার পোশাক পরুন। সন্তানের বন্ধুদের সামনে ফিটফাট থাকুন।
    * আপনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ইতিবাচক রাখার চেষ্টা করুন। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা মুখভঙ্গিতে বিরক্তি প্রকাশ করবেন না।
    * স্পষ্ট করে কথা বলুন। যেকোনো জায়গায় আপনার মতামত পরিষ্কার করে জানান। সন্তানের সামনে ভয়ে ভয়ে মিনমিন করে কথা বলবেন না।
    * সন্তানের সঙ্গে গুণগত সময় দিন, একসঙ্গে খেলুন। একসঙ্গে টেবিলে বসে খান। পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে বেড়াতে যান।
    * কার্যকর আর প্রত্যয়ী মা–বাবাই দিনশেষে ‘কুল’ মা–বাবা। তাই সন্তানের সঙ্গে আত্মপ্রত্যয়ী আচরণ করুন। সন্তানের সঙ্গে আপনার আবেগ–অনুভূতি শেয়ার করতে শিখুন। আরোপিত লোক দেখানো ‘কুল’ না হয়ে স্মার্ট মা–বাবা হয়ে যান।

    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    Advertisement