Advertisement


গত ২১ সেপ্টেম্বর (২০২০ সালে) আমার শ্বশুর সাহেব ইন্তেকাল করেন। দেখতে দেখতে দু’সপ্তাহ হতে চললো। এভাবেই মাস, বছর ও কাল চলে যাবে। আর কোন দিন এ ধরায় তাঁর সাথে সাক্ষাতের কোন সুযোগ নেই। এক সময় আমাদের সবাইকে এক এক করে এ ধরা ছেড়ে চলে যেতে হবে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। মহান আল্লাহপাক কোরআনে বলেছেন “প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” (সূরা আল ইমরান: ১৮৫)।

এ ধরায় আসতে সিরিয়াল মেনটেইন (যেমন: দাদার পরে বাপ, বাপের পর ছেলে) হলেও যাবার সময় কোন সিরিয়াল মেনটেইন হয় না। যে কেউ যে কোন সময় চলে যেতে পারি। এ নশ্বর পৃথিবীতে কেউই আমরা থাকবো না, শুধু থাকবে আমাদের কর্ম। আর এ কর্মই কিছু মানুষকে সাধারণের মধ্যে থেকেও অসাধারণ করে তুলে।
আমার বিয়ের ২৩ বছরের উপর হতে চললো। এই ২৩ বছরে আমার শ্বশুরকে খুবই কাছ থেকে নিবিড়ভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে। কখনও একটি বারের জন্য তাঁকে কারো সাথে রাগান্মিত হতে দেখিনি, দেখিনি তাঁকে কারো সাথে রূঢ় ব্যবহার করতে বা ঝগড়া করতে। মুসকি হাসি দিয়ে সব সময় নরম সুরে সবার সাথে কথা বলতেন। তাঁর কোন শত্রু দেখিনি। তিনি ছিলেন অজাতশত্রু। আমার স্ত্রীও সাক্ষ্য দিলেন সন্তান হিসেবে তাদের সাথেও জীবনে তিনি কোনদিন রাগ করেননি। এক ব্যক্তি তাঁর কাছ থেকে বেশ কিছু টাকা ধার নিয়ে বার বার বলার পরও কথা মতো ফিরত দিচ্ছিলোনা। এমন ব্যক্তি বাসায় এলেও তাকে বিরিয়ানি-পুলাও দিয়ে আপ্যায়ন করতেন! আমার শ্বাশুড়ী অবাক হয়ে অনেকটা অনুযোগের সুরে জিজ্ঞেস করলে বলতেন “ঋন দিতে যতই গড়িমসি করুক বাসায় আসার পর তিনি আমার মেহমান। আর লোকটার অসুবিধা হচ্ছে বিধায় হয়তো টাকা দিতে পারছে না।” এই হচ্ছে অন্যের ব্যাপারে এমনকি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী ঋন নেয়া ব্যক্তির ব্যাপারে তাঁর ধারনা ও কেয়ারিং বা হসপিটালিটির মেন্টালিটি!
আমি তাঁর মেয়ের জামাতা হবার পরও অত্যন্ত সম্মান দিয়ে কথা বলতেন। আমার কথাকে খুবই গুরুত্ব দিতেন। ২৩ বছরের আমার বৈবাহিক জীবনে কখনো আমাকে তুমি বলে সম্মোধন করেননি। গত ৭/৮ বছর প্রচন্ড ব্যস্ততার কারনে দেশে যেতে পারছি না। কিন্তু এর আগে প্রায় প্রতি বছর এক বা একাধিকবার দেশে গিয়েছি। বিয়ের পর গত ২৩ বছরে অন্তত: ১০ বার দেশে গিয়েছি। দেশে গেলে তিনি ছায়ার মত থাকতেন এবং আমাকে অনেকটা চোখে চোখে স্নেহের আদরে রাখতেন। সংক্ষিপ্ত সফরে সিলেটে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের (যেমন: ডিসি, এসপি, বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, ব্যাংকের জোনাল ম্যানেজার) সাথে সাক্ষাতে প্রায়ই আমার শ্বশুর সাহেব ছায়ার মত সাথে থাকতেন। সংশ্লিষ্টরা পরিচয় পেয়ে তাঁকে যথাযথ সম্মান করতেন। এটা লক্ষ্য করে তৃপ্তি ও আনন্দ লাগতো।
আদর, যত্ন, স্নেহ ও ভালবাসা বলতে যা বুঝায় তাঁর একমাত্র জামাতা হিসেবে তা আমি ১০০% পেয়েছি। দেশে যাবার কথা শুনলে আমার পছন্দনীয় জিনিষ আমার স্ত্রীর কাছ থেকে জেনে নিয়ে কিনে রাখতেন যদি আমার দেশে থাকাকালীন সংক্ষিপ্ত সময়ে এগুলো পাওয়া না যায়! করোনা মহামারী শুরু হবার আগে একবার দেশে যাওয়ার চিন্তা করেছিলাম। মহামারী আসায় আর যাওয়া হলো না। শুনে অনেক খোঁজাখুঁজি করে আমার প্রিয় কয়েকটি দুষ্প্রাপ্য মাছ অনেক দূর থেকে ক্রয় করে ফ্রিজারে রেখেছিলাম। আমি না যাওয়াতে অনেক দিন পর তাঁর আরেক আত্মীয় দেশে গেলে সেগুলো তাকে খাওয়ান। মনে পড়ে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দেশে অবস্থানকালীন সময়ে গভীর রাত ২ বা ৩ ঘঠিকায় বেডে এসে দেখে যেতেন ও চেক করে যেতেন মশারী সঠিক মতো আছে কিনা, কোন মশা ঢুকে পড়েছে কি না।
লেনদেনে আমার শ্বশুড় সাহেবকে ১০০% পারফেক্ট পেয়েছি। ইন্তেকালের সময় তাঁর কাছে কেউ একটি টাকা পেত বলে শুনিনি। বরং তিনি অনেক জনের কাছে টাকা পেতেন। আমি সাধারনত: কারো সাথে লেনদেন করে সঠিক না পেয়ে ভাল মানুষ বলে প্রত্যয়ন করি না। আমার বিবাহের পর দুবার প্রায় ১৫ লাখ টাকা আমার শ্বশুর সাহেবকে ব্যবসায় ইন্ভেস্ট করার জন্য দিয়েছিলাম। বাংলাদেশের আর্ত-সামাজিক অবস্থায় সৎভাবে ব্যবসা করে লাভ করা আসলেই কঠিন। গত ২৩ বছরে তাঁর মাধ্যমে চ্যারিটি, দান, কুরবানী ও জাকাত বাবদ প্রায় কোটি টাকার মতো দেশে পাঠিয়ে বন্টন করিয়েছি। এখন বলতে দ্বিধা নেই তাঁকে আমি লেনদেনে ও হিসাবে পেয়েছি ১০০% স্বচ্ছ। পরে আমার শ্বশুড়ীর কাছ থেকে শুনেছি প্রায় সময় নামাজের পর দোয়াতে আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে বলতেন “হে আল্লাহপাক, আমি যেন আমার দামান্দের (জামাতার) কাছে লেনদেনের ব্যাপারে শরমিন্দা (লজ্জিত) না হই।”
আমার শ্বশুড়ের খুব যে প্রাচুর্য বা ধন-সম্পদ ছিল তা নয়। তিনি যে সমাজে প্রতাপশালী এক ব্যক্তি ছিলেন তাও নয়। তিনি ছিলেন সমাজের একজন নির্ভেজালী সাধারণ মানুষ। কিন্তু তিনি সাধারনের মধ্যেও ছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। ছিলেন অত্যন্ত খোদা ভীরু – বাসার দেয়ালের পাশেই অবস্থিত মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত জামায়াতে নামাজ পড়ার চেষ্টা করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল, পরোপকারী, সদা হাস্যোজ্জল, বিনয়ী, বাসায় আসা মেহমানদারদের সঠিকভাবে হক আদায় করে মেহমানদারী করা ব্যক্তিত্ব ও উত্তম আখলাকের মূর্তপ্রতিক। প্রিয় নবী (সা:) বলেছেন “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তোমাদের মধ্যে সুন্দরতম চরিত্রের অধিকারী।’’
(বুখারি: ৩৭৫৮)।
আমি মনে করতাম সম্ভবত: আমাকেই একমাত্র মেয়ের জামাতা হিসেবে এত আদর ও মেহমানদারী করেন। কিন্তু পরে দেখি না আত্মীয়-স্বজন ও মেহমান যারাই তাঁর বাসায় যেতেন তাদের সবাইকে অনেকটা এমন মেহমানদারী করতেন। তাঁর মৃত্যূর কয়েক দিন পর কথা হচ্ছিল আশির দশকের সিলেটের কিংবদন্তিতূল্য মেধাবী ছাত্রনেতা ও পরবর্তীতে সিলেটের স্বনামধন্য চিকিৎসক বর্তমানে কানাডায় বসবাসরত ডা: সায়েফ আহমদের সাথে। তিনি আমাকে ও আমার স্ত্রীকে সমবেদনা জানিয়ে বললেন “নাজির জাননা খালু ও খালাম্মার সাথে আমার কি সম্পর্ক ছিল। আমার নিজের খালু/খালাও আমাকে এতটুকু আদর করতে পারেন নাই বা করার সুযোগ পান নাই। কি দিন বা রাত বা সিলেটে সংকটকালীন সময়ে গভীর রাতে যখনই বাসায় গিয়েছি খালু হাসিমুখে দরজা খুলে দিয়েছেন, বেড, বালিশ ও কম্বলসহ যা দরকার মূহুর্তের মধ্যে যোগাড় করে দিতেন। গভীর রাতেও আপ্যায়ন না করে ছাড়তেন না। এমন মানুষ হয় না। এমন মানুষদের জন্যই আল্লাহপাক জান্নাত বানিয়ে রেখেছেন।”
উল্লেখ্য আমার শ্বশুড় তাঁর পিতার জেনারেশনের মধ্যে সবচেয়ে বড় সন্তান ছিলেন যেমন আমার স্ত্রী আমার শ্বশুড়ের জেনারেশনের মধ্যে সবচেয়ে বড় সন্তান। আমার শ্বশুড়ের পিতামাতা বৃটিশ নাগরিক ছিলেন। সেই সুবাদে আমার শ্বশুড়ের দুই বোন ও এক ভাই দীর্ঘদিন থেকে বিলেতে বসবাস করছেন, এক ভাই আমার বিয়ের আগেই ইংল্যান্ডে গাড়ী এক্সিডেন্টে মারা যান এবং তারা সবাই বৃটিশ সিটিজেন। আদর করেই হোক বা অন্য কোন কারনেই হোক (তখনকার সময়ে সিলেটে এভাবে ঘটতো) আমার দাদা শ্বশুর ও দাদী শ্বাশুড়ী তাঁকে বিলেতে আনেননি বা আনতে পারেননি। আমার বিবাহের পর আমার শ্বশুর-শ্বাশুড়ীকে ছোট শালা সাহেবসহ বিলেত দেখাতে নিয়ে আসি। মাঝে মধ্যে আমার স্ত্রীকে আদরের সাথে চিমটি কেটে বলি “আমার শ্বশুর সাহেবের শ্রদ্ধেয় পিতামাতা তাঁকে বিলেত দেখাতে না পারলেও জামাতা হিসেবে আমি তাঁকে এবং তাঁর আদরের ধনকে (আমার স্ত্রীকে) বিলেত দেখাবার পরম সৌভাগ্য আমার হয়েছিল!” করোনা মহামারী শুরু হবার আগে আমার স্ত্রী আমার শ্বশুর-শ্বাশুড়ীকে বিলেতে ভিজিটে আবার আনার চিন্তা করছিলেন কিন্তু আমার ছোট শালা সাহেবের পড়াশুনায় ব্যঘাত ঘটবে বলে আমার শ্বশুর আসতে চাননি। পরবর্তীতে আসবেন বলেছিলেন। আর আসা হলো না এবং কখনও আর হবেও না। আমার স্ত্রীর আফসোসটা রয়ে গেল।
হে মহান মা’বুদ আমার শ্রদ্ধেয় শ্বশুড় সাহেবের ইন্তকালের আগ পর্যন্ত আমরা, তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও তাঁর পরিচিতরা তাঁর উপর খুশী ছিলেন। মা’বুদ তুমি তাঁর উপর খুশী হয়ে তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের মেহমান বানিয়ে নাও। আ-মীন।
লেখক: বৃটেনের প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী, কমিউনিটির সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব, গবেষক ও বিশ্লেষক।