আমেরিকার ইতিহাস হবে ব্রিটেনে!

২০০৮ সালে আমেরিকায় ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথম কোনো কৃষ্ণাঙ্গ দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্ণবাদের প্রথা ভেঙে আমেরিকানরা বেছে নিয়েছিলেন কালো হলেও সুদর্শন আর স্মার্ট বারাক ওবামাকে। সেই ইতিহাস তৈরির সুযোগ এসেছে ব্রিটেনেরও। অশ্বেতাঙ্গ ঋষি সুনাক এবং শ্বেতাঙ্গ লিজ ট্রাসের মধ্যে চলছে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লড়াই। এমপিদের ভোটে ঋষি সুনাক এগিয়ে আছেন। এতে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে যুক্তরাজ্যে বর্ণবাদ আগের চেয়ে অনেকটাই কমেছে। কিন্তু রক্ষণশীল টোরি দলের সাধারণ সদস্যরা এমপিদের ধারা বজায় রাখবেন কি না তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। ফলে ঋষি সুনাকের প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিলে ব্রিটেন ইতিহাস তৈরির একটা সুযোগ হারাবে। তবে ব্রিটিশরা তৃতীয় বারের মতো কোনো নারী প্রধানমন্ত্রী পাবেন। এর আগে নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মার্গারেট থ্যাচার এবং থেরেসা মে।

জরিপে এগিয়ে লিজ ট্রাস

৪ আগস্ট থেকে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির সদস্যরা ভোট দেবেন। ৫ সেপ্টেম্বর ফলাফল প্রকাশিত হবে। ইউগভ হচ্ছে ব্রিটেনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মার্কেট রিসার্চ এবং ডেটা বিশ্লেষণ বিষয়ক ফার্ম। জরিপে দেখা যাচ্ছে, ৪৬ বছর বয়সি পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস সাবেক অর্থমন্ত্রী ৪২ বছর বয়সি ঋষি সুনাককে পরাজিত করবেন। জরিপে টোরি সদস্যরা জানিয়েছেন, এখনো ট্রাস দলে শক্তিশালী অবস্থানে আছেন।গত বুধবার এবং বৃহস্পতিবার করা জরিপের ফল অনুযায়ী, ৭৩০ কনজারভেটিভ সদস্যদের মধ্যে ৬২ শতাংশ লিজ ট্রাসকে এবং ৩৮ শতাংশ ঋষি সুনাককে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। অনেকে বলেছেন, তারা জানেন না কাকে ভোট দেবেন। ট্রাস সুনাকের চেয়ে ২৪ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে আছেন। এর দুই দিন আগেও ছিল ২০ শতাংশ পয়েন্ট। কনজারভেটিভ সদস্যের সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। তবে ২০১৯ সালে ১ লাখ ৬০ হাজার সদস্য ভোট দিয়েছিলেন। তবে এবার এই সংখ্যা ২ লাখ হতে পারে বলে ধারণা। তাই জরিপের ফল হয়তো এত সদস্যের প্রতিনিধিত্ব করে না। ট্রাস একটা বাদে সব ক্যাটাগরিতে ঋষি সুনাককে পরাজিত করেছেন। সুনাক কেবল ২০১৬ সালে যারা ইইউতে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে বেশি সমর্থন পেয়েছেন। যদিও লিজ ট্রাস ইইউতে থাকার পক্ষে এবং সুনাক ব্রেক্সিটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। ইউগভ জানিয়েছে, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লড়াই যত জমে উঠছে, লিজ ট্রাসের চূড়ান্ত জয়ের সম্ভাবনা ততই বাড়ছে। যদিও কনজারভেটিভ পার্টির প্রধান হিসেবে প্রাথমিক বাছাইয়ের পাঁচটি পর্বেই সুনাক তার প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রাসের তুলনায় এগিয়ে ছিলেন। গত বুধবারের বাছাইয়ে ঋষি সুনাককে ভোট দিয়েছেন ১৩৭ এমপি। আর লিজ ট্রাস পান ১১৩ জনের সমর্থন। ইউগভ বলছে, প্রথম চার দফার বাছাইয়ে ট্রাস তৃতীয় স্থানে ছিলেন। বুধবারের ভোটে তিনি দ্বিতীয় অবস্হানে উঠে আসেন।

ওবামার ইতিহাস গড়বেন ঋষি সুনাক?

প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ বা অশ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমেরিকায় ইতিহাস গড়েছিলেন বারাক হোসেইন ওবামা। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাশালী পদ ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য লড়াই করছেন ঋষি সুনাক যার বাবা যশবীর সুনাক একজন কেনিয়ান এবং মা উসা সুনাক তানজানিয়ার নাগরিক। তার দাদা-দাদি ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৬০-এর দশকে তাদের সন্তানদের সঙ্গে পূর্ব আফ্রিকা থেকে যুক্তরাজ্যে চলে আসেন। ৪২ বছর বয়সি সুনাক অক্সফোর্ড এবং স্টানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়ালেখা করেছেন। ২০০৮ সালে কেনিয়া বিশ্ব মানচিত্রে আলোচনায় এসেছিল। কারণ ঐ বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন বারাক ওবামা যার বাবা-মা ছিলেন কেনিয়ান।

ঋষি সুনাক আগামী সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হলে আবার আলোচনায় আসবে কেনিয়া। আর ব্রিটেনের সঙ্গে কেনিয়ার সম্পর্কও প্রসারিত হবে। শারদ রাও যার শিকড় ভারতে। তিনি কেনিয়া থেকে ব্রিটেনে এসেছিলেন। শারদ জানান, একসময় এশিয়ায় শিকড় ছিল এমন কেনিয়ান এবং উগান্ডাবাসী কয়েক দশক আগেও যুক্তরাজ্য এবং কানাডায় আসতে পারতেন না। আর এখন তারা সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনই ২০১৫ সালে এক বক্তৃতায় ভারতীয়দের দেশের সম্পদ বলেছিলেন, বিশেষ করে যারা ভারত থেকে পূর্ব আফ্রিকায় গিয়ে যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন।

ঋষি সুনাক যদি লিজ ট্রাসকে হারিয়ে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন তাহলে আমেরিকার মতো ব্রিটেনেও রেকর্ড তৈরি হবে। কিছু কৃষ্ণাঙ্গ, এশিয়ান অথবা সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী হবেন সুনাক। নেতৃত্ব দেবেন শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত ব্রিটেনের। তিনি বারাক ওবামা, পতু‌র্গাল প্রধানমন্ত্রী অ্যান্তোনিও কস্তা এবং আইরিশ প্রধানমন্ত্রী লিও ভারদকারের তালিকায় যুক্ত হবেন। ভারদকারের বাবাও ভারতীয় ছিলেন। পাকিস্তান বংশোদ্ভূত সাদিক খান যখন পশ্চিমা দেশের একটি রাজধানীর (লন্ডন) মেয়র হন তখন সেই খবর সারা বিশ্বের গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেয়েছিল। ব্রিটেনের বর্ণবাদের সংস্কৃতিতে ভাঙন ধরাতে ঋষি সুনাকের ওপর চাপ বাড়ছে। অপারেশন ব্ল্যাক ভোটের সাবেক মুখ্য নির্বাহী সিমন উওলি জানান, সুনাকের প্রধানমন্ত্রী হলে তা ব্রিটেনের পদ্ধতিগত বর্ণবাদ সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। তবে সেটি হবে বলে মনে হয় না। কারণ অনেকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ এবং বাদামি বর্ণের প্রধানমন্ত্রী চাইলেও পদ্ধতিগত বর্ণবাদ ভাঙাটা কঠিন হ‌বে।

এমপিদের ৫ দফার ভোটে প্রত্যেক বার প্রথম হওয়া ঋষি সুনাক জানিয়েছেন, তার জয়ের সম্ভাবনা কম। অবশ্য এই কথা বলার কারণও আছে। ব্রিটেনের কনজারভেটিভ পার্টির সদস্যদের বেশির ভাগই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বিরোধী। যদিও ঋষি সুনাক নিজেও ইইউ ছাড়ার পক্ষে ছিলেন। অথচ তার প্রতিদ্বন্দ্বী লিজ ট্রাস ইইউতে ব্রিটেনের থাকার পক্ষে ছিলেন। সেই লিজ ট্রাস ১৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ঘুরে গেছেন। তিনি ইইউর বিরোধিতায় নেমেছেন। প্রধানমন্ত্রী হলে সব ইইউ আইন প্রত্যাহার করবেন বলে অঙ্গীকার করেছেন ট্রাস। তবে ইইউ তার এই অবস্থানকে কীভাবে নেবে সেটা দেখার বিষয়। এই অবস্থান নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হলে লিজ ট্রাস এবং বরিস জনসনের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য থাকবে বলে মনে হয় না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও লিজ ট্রাস বরিসের নীতিই বহাল রাখবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বরিস জনসনও বলেছেন, ঋষি সুনাক বাদে আর যে কাউকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করুক কনজারভেটিভ পার্টি। দলের সাধারণ সদস্যদের মধ্যে বরিসের জনপ্রিয়তা আছে। অনেকেই এমনকি বরিসও মনে করেন, ঋষি সুনাকের কারণেই তিনি (বরিস) প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে এমন বিরোধিতার মধ্যে ঋষি সুনাকের প্রধানমন্ত্রী হওয়া এবং ব্রিটেনে আমেরিকার ইতিহাস তৈরি হওয়াটা খুবই কঠিন হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। আর সুনাক বিজয়ী হলে বিশ্বে ‘ঐতিহাসিক রেকর্ড’ তৈরি করবে ব্রিটেন। দেশটিতে যে বর্ণবাদ কমছে তারও প্রমাণ পাওয়া যাবে। না হলে ধরে নেওয়া হবে, এমপিদের মধ্যে বর্ণবাদ কমলেও সাধারণ ব্রিটিশদের মন থেকে বর্ণবাদ দূর করা সম্ভব হয়নি। তবে এক্ষেত্রে কেবলই যে বর্ণবাদ কাজ করবে তা নয়, অর্থনীতি এবং রাজনীতির নানা কারণও ভূমিকা রাখবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লড়াইয়ে।—বিবিসি, আলজাজিরা ও দ্য গার্ডি

Advertisement