আরেকটি গৃহযুদ্ধের দিকে লিবিয়া

ফ্রেডেরিক ওয়েহরে ও জেফরি ফেল্টম্যান :: গত বৃহস্পতিবার লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের মিলিশিয়াদের নেতা জেনারেল খলিফা হিফতার তাঁর বাহিনীগুলোকে রাজধানী ত্রিপোলিতে অগ্রসর হওয়ার আদেশ দেন, যেখানে রয়েছে জাতিসংঘ স্বীকৃত সরকার গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল অ্যাকর্ড। প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ আল-সাররাজ এই সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

লিবিয়ায় জাতিসংঘের দূত সম্প্রতি নির্বাচনের ভিত্তি গড়ে তুলতে ও লিবিয়াকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে আনতে দেশটির গোষ্ঠীগুলোকে মধ্য এপ্রিলে ত্রিপোলিতে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় সম্মেলনে একত্র হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যখন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সম্মেলন আয়োজনে সহায়তা দিচ্ছিলেন, তখন হিফতারের বাহিনীকে ত্রিপোলির দিকে অগ্রসর হওয়ার আদেশটি শান্তি প্রক্রিয়াকে বানচাল করার একটি প্রচেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে। উল্লেখ্য, জেনারেল হিফতারের প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফ্রান্স, মিসর, রাশিয়া ও সৌদি আরবের সমর্থন রয়েছে।

লিবিয়ার ব্যাপারে মার্কিন কূটনৈতিক তৎপরতা দেখাতে, বিশেষ করে হিফতারের বিদেশি সমর্থকদের লাগাম টেনে ধরতে জাতিসংঘের আহ্বান সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন লিবিয়ার ব্যাপারে দীর্ঘদিন কোনো আগ্রহ দেখায়নি। মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির সেনাবাহিনীর একজন সাবেক কর্মকর্তা জেনারেল হিফতার আশির দশকে গাদ্দাফির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। ভার্জিনিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার আগে তিনি সিআইএর সমর্থন লাভ করেন। সেখানে তিনি প্রায় ২০ বছর বসবাস করেন। ২০১১ সালে ন্যাটোর হস্তক্ষেপের অল্প কিছুদিন আগে তিনি লিবিয়ায় ফেরেন কর্নেল গাদ্দাফির বিরুদ্ধে বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে। ২০১৪ সালে বিদ্রোহীদের পাশাপাশি তিনি লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় শহর বেনগাজিতে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। বেশ কয়েক বছরের লড়াইয়ের পর তিনি লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে তাঁর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। এখন তাঁর নজর ত্রিপোলির দিকে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর চারপাশে হিফতারের বাহিনী এবং প্রধানমন্ত্রী সাররাজ সরকারের মিলিশিয়াদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বোঝাই যাচ্ছে, দেশটি গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের তদন্তকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসর হিফতারকে সামরিক সহায়তা দিয়েছে। গত মার্চ মাসের শেষ নাগাদ সৌদি আরবের বাদশাহ সালমানের সঙ্গে দেখা করার পর হিফতার আরও আত্মবিশ্বাসী হয়েছেন। এসব শক্তিধর রাষ্ট্রের অব্যাহত হস্তক্ষেপের কারণে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য জাতিসংঘের চেষ্টা ভেস্তে যেতে বসেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রিপোলির সরকারকে সমর্থন দিয়েছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিস্পৃহতা ও হিফতারের প্রতি ওই সব শক্তিধর রাষ্ট্রের সক্রিয় সমর্থন লিবিয়াকে আরও বড় ধরনের দ্বন্দ্বের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ ধরনের বিশৃঙ্খলা ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) আরও শক্তিশালী করতে পারে, যারা গত বছর লিবিয়ায় ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়েছিল।

এটা বোঝা খুব কঠিন নয় যে কেন হোয়াইট হাউস হিফতারের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। আফ্রিকার সবচেয়ে বড় তেলের ভান্ডার আছে লিবিয়ায় এবং ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বব্যাপী তেলের দাম কম রাখতে লিবিয়ার তেল উৎপাদনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখে। গত বছর জেনারেল হিফতারের বাহিনীগুলো লিবিয়ার মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে তেল স্থাপনাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এর সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সুনজরে থাকার জন্য হিফতার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা তুলে ধরেন। তিনি সিআইএকে বেনগাজি শহরে একটি ঘাঁটি স্থাপন করার অনুমতিও দিয়েছেন।

তবে হিফতারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে তাঁকে যতটা শক্তিশালী মনে হয়, ততটা শক্তিশালী তিনি নন। তিনি দেশের সব গোষ্ঠী ও মিলিশিয়াদের একত্র করতে পারবেন বা বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে দমন করতে পারবেন—সে সম্ভাবনা নেই। দেশের ক্ষমতায় তাঁর উত্থান বিরোধীদের উত্তেজিত করতে পারে। আর এতে তাদের প্রতিশোধ নেওয়ার এবং লিবিয়ায় আবার একনায়কতন্ত্র ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের কোনো কিছু যাতে না ঘটে, সে জন্য এখন লিবিয়ায় মার্কিন কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। অনেক লিবিয়ানও সত্যিকার অর্থে আরও মার্কিন সম্পৃক্ততা চান। লিবিয়ানদের সঙ্গে গত কয়েক বছরের কথোপকথনে আমাদের কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র এখনো লিবিয়ায় তার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রেখেছে। বিশেষত, ইউরোপীয় ও আরবদের তুলনায় যারা কিনা সংকীর্ণ স্বার্থের জন্য লিবিয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

এটা ঠিক যে যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়ার বহুবিধ সমস্যার সমাধান করতে পারবে না, কিন্তু আগামী কয়েকটা সপ্তাহ বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং মার্কিন কূটনীতি একটা ভালো পরিবর্তন আনতে পারবে। তা না হলে লিবিয়া আরও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Advertisement