একাকী প্রবীণারা কেমন আছেন

ব্রিট বাংলা ডেস্ক :: এ দেশে প্রবীণ নারীদের, বিশেষত যাঁরা একা, তাঁদের অবস্থা ধনী-অধনীনির্বিশেষে সব সময় কঠিন ছিল। যৌথ পরিবারের খোলসে সেই কঠিন অবস্থা অনেক সময় টের পাওয়া যেত না। এখন পরিবার ছোট হচ্ছে আর একাকী প্রবীণাদের করুণ ছবিটা ফুটে উঠছে। গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় একাকী প্রবীণাদের সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ৮৬ বছরের প্রবীণা ফুজলি বেগমকে তাঁর নিজের ছেলে টেনেহিঁচড়ে গ্রামের এক বাঁশঝাড়ে ফেলে রেখে যান। নড়াইলের লোহাগড়ার বাঁশঝাড়ে ক্ষুধার্ত অসহায় প্রবীণা পড়ে থাকেন ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। পোকামাকড়ের কামড়ে যখন তাঁর প্রাণ যায় যায়, তখন কতিপয় প্রতিবেশী তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেখে আসেন। ৩০ বছর আগে বিধবা হওয়ার পর তিন ছেলে আর দুই মেয়েকে অতি কষ্টে বড় করেন তিনি। সবাই এখন যাঁর যাঁর সংসার নিয়ে ব্যস্ত, ফুজলি বেগমকে কেউ কাছে রাখতে রাজি নন। প্রবীণার পাঁচ সন্তানের সবাই হয়তো দিন আনে দিন খান, তাই কেউই মাকে কাছে রাখার খরচ পোষাতে পারছেন না। কিন্তু যাঁদের অঢেল আছে, তাঁরা কি মাকে কাছে রাখছেন বা তাঁর দেখাশোনা করছেন?

সম্প্রতি ভারতের একটা ঘটনা সবাইকে নাড়া দেয়। ছেলে থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে। আইটি ফার্মের নামকরা প্রকৌশলী। ৬৬ বছর বয়সী মা একা একটা ফ্ল্যাটে থাকেন ভারতের এক শহরে। ছেলে মাঝেমধ্যে ফোন করেন। ছয় মাস নয় মাসে ভারতে কোনো কাজে এলে মাকে দেখে যান। এবার এসে হাতের কাজ সেরে মাকে দেখতে গিয়েছিলেন। মায়ের সাড়া না পেয়ে চাবিওয়ালা ডেকে দরজা খুলে মায়ের কঙ্কালটা দেখতে পান। ৬৬ এমন কিছু বয়স নয়, কিন্তু মৃত্যুর কোনো সময় বা বয়স বিবেচনা নেই, নোটিশ ছাড়াই সে যেকোনো সময় আসতে পারে, ব্যস্ত সন্তানেরা সেটা বুঝতে চান না।

নড়াইলের বাবু ও তাঁর স্ত্রী মিলে বাবুর মা ফুজলি বেগমকে বাঁশঝাড়ে ফেলে এলেও গুজরাটের রাজকোটের অধ্যাপক ছেলে তাঁর পক্ষাঘাতগ্রস্ত মায়ের বোঝা ঘাড় থেকে নামিয়েছেন ছাদ থেকে নিচে ফেলে দিয়ে। ঘটনার তিন মাস পর পুলিশ সিসিটিভির ফুটেজ দেখে এটা জানতে পারে। ছেলে বলেছিলেন, হতাশায় ভুগতে ভুগতে মা ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। দেশে-বিদেশে একাকী বয়স্ক নারীদের অনেকেরই অবস্থা কমবেশি একই রকমের।

একাকী প্রবীণাদের একেকজনের সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থা একেক রকম। কেউ বিধবা হয়েছেন অনেক আগে। কাজ করে, চাকরি করে, সংসারে নানা মেহনত করে ছেলেমেয়েকে বড় করেছেন। কারও জীবনসঙ্গী গত হয়েছেন ছেলেমেয়ের বিয়েশাদির পালা মিটে যাওয়ার পর। অনেক প্রবীণা আছেন, যাঁরা কখনো বিয়ের ফাঁদে পা দেননি বা বিয়ের সময় পাননি; কেউ স্বেচ্ছায় বিয়ে বাতিল করে একা থেকেছেন। কারও নিজের ইচ্ছা থাকলেও বিয়েটা টেকেনি। এমনও অনেকে আছেন, আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ কখনো হয়নি কিন্তু একাই জীবনযাপন করছেন। তাঁদের কারও হাতে জমা কিছু টাকা আছে, বাপের বাড়ির সূত্রে পাওয়া কিছু ভূসম্পত্তি কারও কারও আছে বা ছিল।

তবে তাঁদের একটা বড় অংশের এখন কিছুই নেই। একদম শূন্য হাত। এ রকম নিঃস্ব একাকী প্রবীণার সঠিক সংখ্যা কারও কাছে নেই। একাকী নারীদের কখনো আলাদা করে গোনা হয়নি। নোয়াখালীর হাতিয়া, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, শরীয়তপুর সদর আর গাইবান্ধার সাঘাটার একটা করে ইউনিয়নে অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই সংখ্যা একদম কম নয়। একেকটি ইউনিয়নে ১৭ থেকে ২০ জন করে প্রবীণা আছেন, যাঁরা একদম একা থাকেন। তাঁদের মধ্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীও আছেন।

তাঁরা একেবারেই নিঃস্ব প্রবীণা। অনেকের থাকার ঘর নেই। অন্য কারও জমিতে কোনোমতে একটা ঘর উঠিয়ে অথবা কোনো পরিত্যক্ত ঘরে তাঁদের বসবাস। এই অনুসন্ধানের সময় একা বসবাস করেন-এমন পুরুষের খোঁজখবর করা হয়েছিল, কিন্তু তেমন কাউকে পাওয়া যায়নি। প্রবীণ বয়সে স্ত্রীবিয়োগ হয়েছে, এমন মানুষের সন্ধান মিললেও তাঁদের কেউই একা থাকেন না।

নারীরা কেন একা থাকেন? সারা জীবন তথাকথিত ‘মিলিয়ে চলা’র পর আজ কেন তাঁরা একেবারে একা? কেন তাঁদের দায়দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না? এমন না যে তাঁদের তিন কুলে কেউ নেই। অনেকেরই ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি আছে, তারপরও তাঁরা একা। পুরুষদের সম্পত্তি থাকার কারণেই কি তাঁদের দেখাশোনার লোকের অভাব হয় না? আর নারীদের নামে কোনো সহায়-সম্পত্তি না থাকায় তাঁদের প্রতি আত্মীয়স্বজনের আগ্রহ থাকে না?

সহায়-সম্পত্তি থাকলেও তাঁরা প্রতারিত হচ্ছেন। ইন্দুবালা বিয়ে করেননি, সারা জীবন শিক্ষকতা বা অধ্যাপনা করেছেন। তিন কাঠার প্লটের ওপর ছোট একতলা বাড়ি বানিয়েছিলেন। কিছু গয়নাগাটিও ছিল। ভাইদের ছেলেমেয়েদের বিয়েতে তা বিলিয়ে দেন। তিন ভাই ভেবেছিলেন দিদি গয়নার মতো বাড়িটিও তাঁদের দিয়ে যাবেন। মেজ ভাই দিদির বড় নেওটা ছিলেন। তিনি ব্যাংকে চাকরি করেন, বাড়িটা এখনই দিদি তাঁর নামে লিখে দিলে ব্যাংকের এক ডিজিটের সুদে ব্যাংক লোন নিয়ে তিনি বাড়িটাকে পাঁচতলা করে ফেলবেন। চারতলা ভাড়া দিয়ে দিব্যি দিদি আর ভাইয়ের বাকি দিনগুলো কেটে যাবে। লিখে নেওয়ার ছয় মাসের মাথায় ইন্দুবালার মেজ ভাইয়ের মনে হলো এই মহল্লাটা আর বসবাসের উপযুক্ত নয়। তিনি গোপনে বাড়িটি বেচে দিয়ে বদলি হয়ে আরেক শহরে চলে গেলেন। দিদি এখন তাঁর অন্য এক ভাইয়ের মেয়ের বাড়ির ড্রয়িংরুমের মেঝেতে ঘুমান।

অনেকে পরিবারের লোকের হাতেই নিগৃহীত হচ্ছেন। সম্প্রতি পুত্রবধূর হাতে শাশুড়ির মারধরের ভিডিও ক্লিপ ফেসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। মাথায় বারবার ইটপাথর দিয়ে আঘাত করা আর গলা টিপে ধরার এই ঘটনা কি একটাই ঘটেছে, না ঘটেই চলেছে?

বৃদ্ধ মাকে বাড়ির বারান্দায় রেখে কিছু শুকনো খাবার আর পানি দিয়ে সপ্তাহখানেকের জন্য বেড়াতে চলে যাওয়ার ঘটনা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে। পাড়ার লোকেরা শেষ পর্যন্ত তাঁর দেখাশোনার ভার নিয়েছেন।

রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি আমলে নিয়ে নগর ও পল্লির একাকী প্রবীণাদের সঙ্গে আলাপ করে তাঁদের জন্য একটা সম্মানজনক ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর বিধিমালা প্রণয়নের সময় পরিবারহীন একাকী প্রবীণাদের কথা ভাবা হোক।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Advertisement