করোনা এবং ব্রেক্সিট নিয়ে চাপের মুখে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

ব্রিটবাংলা ডেস্ক : দ্বিতীয় দফায় ব্যাপকভাবে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হচ্ছে ব্রিটেনে। সংক্রমন ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারের উপর চাপ দিয়ে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং উপদেষ্টারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডে করোনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। টেস্ট এবং ট্রেইসিং নিয়েও সফলতা দেখাতে পারছে না সরকার।
যদিও সোমবার থেকে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলসে রোল অব সিক্স কার্যকার হয়েছে। এটা গাইড লাইন নয়, আইন। নতুন আইন অনযায়ী, ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডে ঘরে এবং বাইরে, কোথাও ছ’ জনের বেশি জমায়েত হওয়া যাবে না। তবে ওয়েলসে শুধু অভ্যন্তরে ছ’জনের বেশি জমায়েত হওয়া বেআইনি।
ইংল্যান্ডে রোল অব সিক্স আইন সবার জন্যে কার্যকর হলেও স্কটল্যান্ডে অনুর্ধ্ব ১২ এবং ওয়েলসে অনুর্ধ্ব ১১ বছর বয়সী শিশুরা নতুন এই আইনের আওতার বাইরে থাকবে। আইন ভঙ্গকারীদের পুলিশ ১শ পাউন্ড থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২শ পাউন্ড পর্যন্ত জরিমানা আরোপ করতে পারবে। প্রয়োজনে আদালতে নিয়ে যাবে। তবে নতুন আইন জিম, স্কুল, ফিউনির‌্যাল, বিয়ে এবং শিক্ষা ও কর্মস্থলে বসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
করোনার দ্বিতীয় দফা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ইসরায়েলে এরিমধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় লকডাউন আরোপ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপি করোনার সংক্রমন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে শীত নামার আগেই করোনার সংক্রমন নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে ব্রিটিশ সরকারের উপর ক্রমাগতভাবে চাপ বাড়ছে।
এদিকে ব্রেক্সিট নিয়ে নতুনভাবে বিতর্ক শুরু হয়েছে গত বুধবার থেকে। আগামী ডিসেম্বরে ট্রানজেশনাল পিরিয়ডের সমাপ্তি ঘটবে। তার আগে ইইউর সঙ্গে ভবিষ্যতে কি ধরনের সম্পর্ক রাখবে ব্রিটেন, বাণিজ্যিক সম্পর্ক কি হবে এর একটি চুড়ান্ত চুক্তি সম্পাদক করতে হবে। এই চুক্তিতে ইইউ এবং বিটেন উভয়ের সম্মতি থাকতে হবে। এর অংশ হিসেবে গত বুধবার ইন্টারনেল মার্কেট বিল নামে একটি বিলের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন।
ব্রেক্সিট সম্পন্নে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র ব্যর্থতার প্রধান কারণ ছিল আয়ারল্যান্ড সীমান্ত বা বর্ডার। যাতে নাম দেওয়া হয়েছিল আইরিস ব্যাকসস্টপ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন আইরিস ব্যাকসস্টপ ধারাটি বাদ দিয়ে এর নাম দিয়েছেন নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড প্রটোকল। এই ধারাতে সরকারের মন্ত্রীদের আলাদা কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যাতে ব্রেক্সিটের মূল চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার জন মেজর, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামরন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সাবেক এ্যাটর্নি জিয়োফরি কক্সসহ কনজারভেটিভ পার্টির অনেক সিনিয়র ব্যাকব্যাঞ্চার এমপি এই বিলের বিরোধীতা করছেন। লেবার পার্টির সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, গর্ডন ব্রাইন প্রস্তাবিত ইন্টারনেল মার্কেট বিলের মাধ্যমে আর্ন্তজাতিক আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন। এর মাধ্যমে ব্রিটেন বিশ্বের কাছে আস্থাহীন রাষ্ট্রে পরিনত হবে বলেও মন্তব্য করেছেন তারা। লেবার পাটির লিডার স্যার কিয়ার স্টারমার বলেছেন, ইন্টারনেল মার্কেট বিল সংশোধন করা হলে তাতে অবশ্যই লেবার সমর্থন দেবে। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক দলগুলোও ইন্টারনেল মার্কেট বিল নিয়ে বিভক্ত হয়ে গেছে। স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিষ্টার নিকোল স্টোরজান আহ্বান করেছেন বিলটি সংশোধন করার জন্যে।
বিলটি নিয়ে সোমবার থেকে পার্লামেন্টে বিতর্ক হবে। তবে পার্লামেন্টে ৮০টি সিট বেশি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বরিস জনসন। বিলটি পার্লামেন্ট কোনো ধরনের সংশোধনী ছাড়া পাশ হলেও তাতে বিশ্বে ব্রিটেনের মর্যাদা ক্ষুন্ন হবে বলে মনে করছেন ব্রিটেনের সাবেক ৫ প্রধানমন্ত্রী এবং ইন্টারনেল মার্কেট বিলের বিরোধীরা।
উল্লেখ্য গত ৩১ জানুয়ারী ব্রেক্সিট হলেও যেহেতু ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য, ইমিগ্রেশন, এভিয়েশন, নিরাপত্তা এবং ফিশিং নিয়ে কোনো চুক্তি এখনো হয়নি তাই এসব ক্ষেত্রে এখনো ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আইন মেনে চলতে হচ্ছে ব্রিটেনকে। এসব বিষয়ে ভবিষ্যত সম্পর্ক নির্ধারণের জন্যে আগামী ডিসেম্বরের ভেতরে ইইউর সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে ব্রিটেনকে। বিশেষ করে নাগরিক অধিকার, আয়ারল্যান্ড সীমান্ত নিয়ন্ত্রন এবং সীমান্তে স্টপ ও চেক এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে ব্রিটেনের ভবিষ্যত সম্পর্ক কি হবে, এই বিষয়গুলি নিয়ে ডিসেম্বরের ভেতরে চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে। না হলে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সিঙ্গেল মার্কেট এবং কাস্টমস ইউনিয়ন থেকে কোনো সুবিধা পাবে না ব্রিটেন। আর এখানেই সবচাইতে বড় যে সমস্যাগুলো রয়েছে, তা হল স্কটল্যান্ড চাচ্ছে সিঙ্গেল মার্কেট এবং কাস্টমস ইউনিয়নে থাকতে। অন্যদিকে আয়ারল্যান্ড ব্রিটেনের সঙ্গে না থাকলেও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ব্রিটেনের সঙ্গে রয়েছে। তাই আয়ারল্যান্ড বর্ডার বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে গেলে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে কথা বিবেচনা রাখতে হচ্ছে ব্রিটিশ সরকারকে। আয়ারল্যান্ড এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের কোনো বর্ডার নেই। আর এক্ষেত্রে ব্রেক্সিট কার্যকরের পর ইমিগ্রেশন নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যাবে ব্রিটিশ সরকারের জন্যে। এ কারণে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এই আয়ারল্যান্ড সীমান্তকে গুটি হিসেবে ব্যবহার করে বারবার ব্রেক্সিটকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে এবং করে যাচ্ছে। বর্তমান ইন্টারনেল মার্কেট বিলেও আয়ারল্যান্ড সীমান্ত এবং স্কটল্যান্ডের স্বার্থ বিরোধী বিষয় জড়িত রয়েছে।

Advertisement