শফিক চৌধুরী । বয়স পঁচিশ । ট্রেন থেকে নেমে ষ্টেশনে একা দাঁড়িয়ে ভাবছে কি করবে । রাত বাজে তিনটে । ভাবতে ওর অবাক লাগছে কাল কোথায় ছিল আর আজ কোথায়? গত পড়শু একটি সরকারী অফিসের এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়ে তাড়াহুড়ো করে রংপুরের এই ষ্টেশনে এসে পৌঁছেছে। কাল সকালে অফিসে জয়েন করার শেষ দিন । তাই রাতের ট্রেনেই রওয়ানা দিতে হয়েছে ওকে। কিন্তু রাতটা কোথায় কাটাবে তাই ভাবছে ও রাস্তার দিকে একমনে তাকিয়ে থেকে। চারিদিক নির্জন, নিশ্চুপ। ঝোপঝাড়গুলি থেকে মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁপোকার ডাক ছাড়া কিছুই শোনা যায় না। বহুদূর থেকে হঠাৎ হঠাৎ শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে। রাস্তাঘাট খাঁ খাঁ করছে। কেমন গা ছমছম করা পরিবেশ। শেষ পর্যন্ত ষ্টেশনের চেয়ারে বসেই রাতটা কাটিয়ে দেবে কিনা মনে মনে ভাবছে, এমন সময় সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবী পড়া একজন মধ্য বয়স্ক লোককে এগিয়ে আসতে দেখলো ও। বয়স হবে খুব সম্ভবত ষাট/পয়ষট্টি। এতরাতে এরকম একজনকে দেখে দারুন অবাক হলো শফিক। লোকটার মাঝে আভিজাত্যের একটা ছোয়া লেগে আছে, উচ্চবিত্ত পরিবারের কর্তাদের মত ভারিক্কি চেহারা। কাছে এসে লোকটাই প্রথম মুখ খুললো —
: রাতের ট্রেনে এসেছেন বুঝি? (শফিকের চেহারায় হাঁ বাচক ভঙ্গি) যাবেন কোথায়? দেখে মনে হচেছ এখানে পরিচিত কেউ নেই আপনার !
: জ্বি না ! সরকারী চাকুরি নিয়ে এসেছি। স্থানীয় সরকারী প্রকৌশলী অফিসে কাল সকালেই হাজিরা দিতে হবে। ভাবছি, ততক্ষণ এখানে বসেই সময়টা কাটিয়ে দেই। কিন্তু আপনি? এতরাতে ষ্টেশনে?
: আমার নাম নারায়ন ঘোষ । স্থানীয় বাসিন্দা। (বলে হাত বাড়িয়ে দিলেন। হাত মিলাতে গিয়ে চমকে উঠলো শফিক, এত হীম শীতল হাত ! মুখে বললো ) –
: আমি শফিক চৌধুরী, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। পরিচিত হয়ে খুশি হলাম।
: আমিও। এই সামনেই আমার বাসা। প্রায় রাতেই এসময় ষ্টেশনে আসি। ষ্টেশনে কেউ এলে তার থাকার ব্যবস্থা করা না থাকলে আমার বাসায় নিয়ে যাই। আপনিও চলুন আমার সাথে। রাতটা নিশ্চিন্তে সেখানে কাটিয়ে দিতে পারবেন।
: জ্বি না ! ধন্যবাদ। আমি এখানেই কোনমতে চালিয়ে নিতে পারবো ।
: প্লীজ ! দ্বিধা করবেন না। আমার বাসায় অতিথি হয়ে এলে খুবই আনন্দিত হবো। প্লীজ ! মানা করবেন না। একা মানুষ। এরকম সময়ে যদি কারো সঙ্গ পাওয়া যায় তা আমারও জন্য খুবই ভাগ্যের ব্যাপার ।
শফিক ভাবলো ভালোই । রাতটা কাটাবার একটা ব্যবস্থা হলো। তাছাড়া লোকটাকে দেখে খুব সম্ভ্রান্ত
: আপনাকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছি না। কিন্তু এতো রাতে বাসায় অপিরিচিত অতিথি নিয়ে গেলে বাসায় কোন অসুবিধা হবে নাতো? মানে পরিবারের অন্যান্য লোকজনের …
: জ্বি না, (শফিককে থামিয়ে বলে উঠলেন তিনি) আমার বাসায় আমি একা থাকি। সুতরাং আর কারো কথা ভেবে আপনাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না।
: আপনি একা? আর কেউ নেই বাড়িতে? স্ত্রী, সন্তান বা আত্মীয়-স্বজন? মাফ করবেন, একান্ত ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেললাম।
: ঠিক আছে, সমস্যা নেই ! না, আর কেউ নেই। আমি একা থাকি। দেখুন দেখতে দেখতে এসে গেছি। এই যে আমার বাড়ি !
সামনের বাড়িটাকে বাড়ি না বলে প্রাসাদ বললেই ভাল শোনাত । ব্রিটিশ আমলের জমিদার বাড়ি- তাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু এত বড় বাড়িতে এই লোকটা একা থাকে, কেমন যেন বেখাপ্পা মনে হলো। কেমন ভূতুরে টাইপের ব্যাপার। অথচ দেখে খুব সাজানো গোছানো মনে হচেছ। বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে লক্ষ্য করলো আশেপাশে কোন ঝোপঝাড় বা জঙ্গল নেই। বাড়ির সামনের প্রতিটি গাছপালায় যত্নের ছাপ আছে বলে মনে হচেছ। অবশ্য অন্ধকারে তেমন পরিষ্কার কিছুই বোঝা যাচেছ না। দরজা দিয়ে ঢুকতেও একই অবস্থা। বিরাট হলরুম। মাথার উপড় সিলিং থেকে বিরাট ঝাড়বাতি ঝুলছে। তাতে মোমবাতি জ্বালানো। ঘরের প্রতিটা আসবাবপত্র পরিস্কার পরিচছন্ন। প্রতিটা জিনিষেই পাকা হাতের যত্নের ছাপ। হলরুমের মাঝে ঘোরানো সিড়ি দোতালায় উঠে গেছে। সিড়ির শেষ মাথায় দোতালার দেয়ালে বিরাট একটা বাঁধানো ছবি, নারায়ন ঘোষের। আগের দিনের জমিদার বলেই মনে হল ছবি আর ঘর-বাড়ির অবস্থা দেখে। হাত থেকে স্যুটকেস মাটিতে রেখে ভাল করে চারিদিকে দেখতে লাগলো শফিক। হলরুমের পাশেই ডাইনিং রুমে ডাইনিং টেবিলে সাজানো খাবার থেকে হালকা ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচেছ। যতই দেখছে ততই অবাক হচেছ ও। এমন সময় পিছন থেকে নারায়ন ঘোষ বলে উঠলেন-
: অনুগ্রহ করে. হাতমুখ ধুয়ে খাবার খেয়ে নিন। আসুন, ঐখানে বাথরুম।
: জ্বি ! এসবের কি প্রয়োজন ছিল ? শুধু শুধু …
: বলেছি না ! দয়া করে কোন দ্বিধা করবেন না। প্লীজ ! খেতে আসুন ।
কি আর করা। হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নিলো শফিক। কিন্তু নারায়ন ঘোষ কিছুই খেলেন না। তিনি নাকি আগেই খেয়েছেন। অতিথির জন্যই এতো আয়োজন ! কিন্তু অতিথি যে আসবেই তিনি জানলেন কি করে? তাছাড়া নারায়ন ঘোষ ছাড়া আর কারো ছায়াও তো দেখলো না ও। কোন প্রশ্ন করতেও সাহস হলো না। সত্যিই কিছুটা ভয় ঢুকে গেছে ওর মনে। কিন্তু সাহস হারালো না ও। নিজেকে প্রবোধ দেবার চেষ্টা করলো, “ও কিছু না ! লোকটার সবকিছুই রহস্যময় আর হেয়ালিপূর্ণ। কাজের লোক নিশ্চয়ই আছে, এত রাতে হয়তো জেগে নেই !”
খাওয়া দাওয়া শেষে ওকে একটা শোবার ঘরে নিয়ে জামা-কাপড় পাল্টে ঘুমিয়ে পড়তে বলে চলে গেলেন তিনি। ও পোশাক পাল্টে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছে আর অবাক হচেছ। সবচেয়ে বেশী ভাবিয়ে তুলেছে ওকে দু‘টো জিনিষ। এত বড় বাড়িতে লোকজন না থাকার মত আরো দু‘টো জিনিষ নেই। একটি ঘড়ি আর অন্যটি আয়না। এমনকি বাথরুমেও কোন আয়না দেখেনি ও। এত বড় জমিদার বাড়িতে সবই আছে অথচ প্রয়োজনীয় এই দু‘টো জিনিষ নেই- সত্যিই আশ্চর্যের ব্যাপার ! এসব ভাবতে ভাবতেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে টেরও পায়নি ও।
ঘুম ভাঙতে হাতঘড়িতে চেয়ে দেখে সকাল সাড়ে আটটা। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে হাত-মুখ ধুয়ে বাইরে বেরুবার কাপড় পড়ে তৈরি হয়ে নিল। কিন্তু এখন নারায়ন ঘোষকে পায় কোথায়? ভাবতে ভাবতে ওর ঘর থেকে স্যুটকেস হাতে নিয়ে হলরুমে এসে ঢুকলো। ঢুকে ভীষন অবাক হয়ে গেলো ও। ঘরের সবকিছু সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা। তাও মনে হচেছ অনেকদিন ধরেই সবকিছু এভাবে কাপড়-ঢাকা অবস্থায় পড়ে আছে। সব কাপড়ই ময়লা, বাকি সবই প্রায় পুরু ময়লা আর মাকড়শার জালে জড়ানো। কাউকে ডাকবে কি ডাকবে না চিন্তা করতে করতে দোতালার দিকে চোখ পড়লো। নারায়ন ঘোষের ছবির নীচে কি যেন লেখা। উঠে কাছে গিয়ে মাথা ঘুরে উঠার মত অবস্থা ওর। ছবির নীচে মোটা হরফে পরিষ্কার বাংলায় লেখা-
নারায়ন ঘোষ
​জন্ম-১৯০১ সাল মৃত্যু-১৯৬৬ সাল।​

Advertisement