মোঃ রেজাউল করিম মৃধা ॥

মেঘের কোলে রোদ এসেছে বাদল গেছে টুটি,
আজ আমাদের ছুটি ও ভাই, আজ আমাদের ছুটি ॥
কী করি আজ ভেবে না পাই, পথ হারিয়ে কোন বনে যাই, কোন মাঠে যে ছুটে বেড়াই, সকল ছেলে জুটি।
আজ আমাদের ছুটি ও ভাই, আজ আমাদের ছুটি।
রবি ঠাকুরের এ কবিতাকে ধ্যানজ্ঞ্যান মনে করে চ্যানেল এস পরিবারের সকল বয়সের কর্মীরা ৩০শে আগস্ট, দিনটিকে ভরে তুলে আনন্দে। এ দিনে চ্যানেল এস পরিবারের বেশিরভাগ কর্মীরই কোনো কাজ ছিল না, প্রায় সবাই অংশ নেয় আনন্দ অভিযানে।
সেই ২০০৪ সাল থেকে দর্শকদের ড্রইংরুমের বিনোদন ও সংবাদ সরবরাহের জন্য ফুরসতহীন প্রতিটি দিনই কাটত চ্যানেল এস এর প্রতিটি কর্মীদের। এ জন্যেই একসাথে কোথাও কোনোদিন আউটিংয়ে যাওয়া হয়ে উঠেনি চ্যানেল এস কর্মীদের। তাই দরকার ছিল রিফুয়েলিংয়ের। এজন্যে, চ্যানেল এস এর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো আউটিং বা ডে ট্রিপের উদ্যোগ নেন চ্যানেল এসের সিনিয়র ভিডিও এডিটর কামরুল হাসান।
প্রথাগত ডে ট্রিপের ধারণার বাইরে অন্য কিছু করার তাড়নায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ডে ট্রিপের প্রথমার্ধ হবে এডভেঞ্চার বা এক্টিভিটিস এবং পরবর্তী অধ্যায় হবে সমুদ্র সৈকত অবলোকন। চ্যানেল এস যেহেতু দর্শকদের কথা সবসময় চিন্তা করে তাই এক্টিভিটিসও এমনভাবে সিলেক্ট করা হয় যেখানে আনন্দের পাশাপাশি টিম স্পিরিটও বিল্ডাপ করা যায়। এ টিম স্পিরিট যেন পরবর্তীতে দর্শকদের ভালো অনুষ্ঠান নির্মাণে ধরে রাখা যায় সে চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আর সে ধারণা থেকেই ট্রান্সমিশন কর্মী ও এডিটর পাপ্পুর পরামর্শক্রমে প্রথমে পেইন্টবল ফাইটিং এডভ্যাঞ্চার ফাইনাল করা হয় এবং তারপরে ব্রাইটন বীচে যাওয়া হয়।
দুই সপ্তাহের প্রস্তুতি পর্বে অংশগ্রহণকারীর তালিকা, নাস্তা ও লাঞ্চের দায়িত্ব বন্টন, টিকেটিং, লোকেশন রিসার্চ ইত্যাদি সব কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা হয়। ওয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সার্বক্ষণিকভাবে বার্তা আদান প্রদানের মাধ্যমে সবাই যারা যার মতামত জানিয়েছেন। অংশগ্রহণকারীর তালিকা ফাইনাল হওয়ার পর কে কার গাড়িতে করে যাবেন তার একটি মিনিগ্রুপ করে দেন ডে-ট্রিপের উদ্যোক্তা কামরুল হাসান। গ্রুপের নামকরণ বেশ মজার ছিল।
*বিচ্ছু গ্রুপ* ‌‌‌— কামরুল, পলক, শিপলু, মাহাদী
*বিজনেস গ্রুপ* ‌‌‌— ফারহান, জুবায়ের, আহাদ, মৃধা
*পরহেজগার গ্রুপ* ‌‌‌— ইভান, মাসুদ, রিয়াদ, জামশেদ
*মাহী ফেরদৌস আণ্ডারকাভার ইউনিট* ‌‌‌— মোফাজ্জল, ফয়সাল, আরাফাত
সকালের নাস্তার ব্যবস্থা করেছেন মোফাজ্জল ভাই। ভাবির সহায়তায় বীফ পরোটা রোল, কলা, আপেল, রেডবোল সহযোগে নাস্তা সম্পন্ন করার পরই সকাল ৭টায় শুরু হয় চ্যানেল এস এর মিশন পেইন্টবল এডভেঞ্চার। প্রতিটি মিনিগ্রুপ যাত্রা শুরু করে ক্রোওলীর উদ্দেশ্যে।
ক্রোওলির পাহাড় ও গভীর জংগলে সেই পেইন্টবল ভেন্যু। গভীর জংগলের মাঝে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে পোস্টকোডেও ঝামেলা শুরু হয়। তাই নির্ধারিত ভেন্যু খুঁজতে প্রায় আধাঘন্টা সময় নষ্ট হয়। কিন্তু ভেন্যুতে গিয়েই সবার মন ভালো হয়ে যায়। গাড়ি পার্ক করে মেইন গেইটে প্রত্যেকে কনসেন্ট ফর্ম পূরণ করে কাউন্টারে জমা দিয়ে ব্যাজ গ্রহণ করতে হয়। পরে ব্যাজের নম্বর অনুযায়ী জোড় নম্বর ও বেজোড় নম্বরে ভাগ করে দুটি গ্রুপ তৈরি করা হয়। আমার ব্যাজ নাম্বার ছিল ২৯।
এবার হলো আর্মির পোষাক পরা। বিভিন্ন সাইজের ও রঙের আর্মির সামরিক পোষাক পড়তে হলো সবাইকে। করোনার ভয়কে জয় করে সবাই সেসব সামরিক পোষাক পড়ে নিলো। কামরুল ভাইয়ের পোষাকটি এক্সট্রা লার্জ হওয়ায় তাকে বেশ ফানি লাগছিল। বারবার অনুরোধ করা স্বত্ত্বেও স্টোরকীপার প্রয়োজনীয় সাইজের পোষাক দিতে অনীহা প্রকাশ করায় কামরুল ভাই অভিযোগ জানাতে গেলেন। আর তাতেই টনক নড়ে গেল কর্তৃপক্ষের। অভিযোগের ভয়ে মহিলা ম্যানেজার কামরুল ভাইয়ের পছন্দের পোষাক সাইজ বের করে দিলেন, এমনকি একটি হ্যাণ্ড গ্রেনেডও উপহার দিলেন কামরুল ভাইকে। এ সুযোগে যারা তাদের পোষাকে সাইজ ও রঙ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না, তারাও পছন্দ মতো বদলে নিলেন।
এবার শুরু হলো ইণ্ডাকশন। কমবয়সী এক কমাণ্ডার জোর গলায় খেলার নিয়মকানুন বলে দিলেন। জোড় দল পেল কমলারঙের ব্যাজ আর বেজোড় দল পেল সবুজ রঙের ব্যাজ। প্রতিটি বাহুতে ব্যাজ লাগিতে সবাই চললাম ব্যাটলফিল্ডে। এ সবুজ ও কমলা রঙের ব্যাজ থেকে পক্ষ প্রতিক্ষ চিনে গোলাগুলি করা হবে। হাতে পেলাম অটোমেটিক রাইফেল। আগে থেকেই ৭ পাউণ্ডে একশ রাউণ্ডের বুলেট কিনে রেখেছিলাম সবাই। রাইফেলে লোড করে উত্তেজিত সবাই কমাণ্ডারের পেছনে হেঁটে হেঁটে ব্যাটলফিল্ডের দিকে রওনা দিলাম।
এ ফাঁকে খেলার নিয়মটা বলে রাখি। একটি ব্যাটলফিল্ডে একটি টার্গেট সেট করা হয়। তারপর দুই পক্ষ দু’দিকের নির্ধারিত স্থানে সরে আসেন। কমাণ্ডারের বাঁশির পরেই যুদ্ধ শুরু হয়। গোলাগুলি শুরু হয়। গুলি গায়ে এসে লাগলে সেটা ফেটে গিয়ে হলুদ রঙ বেরিয়ে আসে আর তাতেই বোঝা যায় কেউ গুলি খেয়েছে কিনা। যাহোক, যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যে কেউ গুলি খেলে সে তার নির্ধারিত স্থানে ফিরে এসে আবার যুদ্ধ শুরু করতে পারবে। কিন্তু প্রথম পাঁচ মিনিটের পর গুলি খেলে নির্ধারিত স্থানে ফিরে যেতে হবে এবং আর যুদ্ধ করার সুযোগ নাই। প্রতিটি ব্যাটল ১০ থেকে ১২ মিনিটের মতো ব্যাপ্তি। প্রতিটি ব্যাটলের মাঝে ১০-১৫ মিনিটের বিরতি।
প্রথম যুদ্ধে দুই পক্ষের কেউ যুদ্ধের কলাকৌশল ভালোমত বুঝে উঠতে না পারায় কমাণ্ডার প্রথম রাউণ্ডের ব্যাটল ড্র হয়েছে বলে ঘোষণা দিলেন। দ্বিতীয় ব্যাটল ছিল একটু উচুঁ ঢিবিতে উঠে একটি চড়কিকে ঘুরিয়ে দিতে আসবে। গুলি বাঁচিয়ে যে দল যতোবারচড়কি ঘোরাবে সে জয়ী হবে। কমলা দলের কামরুল ভাই সর্বপ্রথম চড়কি ঘুরিয়ে আসতে সমর্থ হন। পরে আরো অনেকেই চড়কি ঘোরাতে পারেন। এভাবে মোট ৬টি ব্যাটল হয়। এবং সবগুলো মিলিয়ে কমলা দল জয়ী হয়। দুই দলেই চ্যানেল এস এর কর্মীছাড়াও অন্যান্য প্রতিযোগিরাও অংশগ্রহণ করে।
১/ সবুজ দল : ফারহান, জুবায়ের, ইভান, রিয়াদ, মৃধা, মাহাদী, আরাফাত, ফয়সাল।
২/ কমলা দল : কামরুল, আহাদ, পলক, শিপলু, মোফাজ্জল, মাসুদ, জামশেদ।
পেইন্টবল খেলাটা এডভেঞ্চার টাইপ খেলা এবং যেহেতু গোলাগুলি টাইপ বিষয়াদি সংযুক্ত তাই সর্বদ‍া মাস্ক পড়ে থাকতে হয়। কেননা গুলিগুলো নিরীহ টাইপ হলেও চোখে বা পয়েন্ট ব্লাকে শরীরে লাগলে অন্ধ্যত্ব থেকে শারীরিক ব্যথা সবই ঘটতে পারে। ফারহান ভাইয়ের কব্জীতে গুলি লাগায় জায়গাটি রক্তিম হয়ে যায় সাথে সাথেই। এজন্য কমাণ্ডার বারবার চিৎকার করে মাস্ক পড়ে থাকার জন্য নির্দেশ দিচ্ছিলেন। এরই মধ্যে আমি খেলার মাঝে ছবি তুলতে মাস্ক খুলে ফেলার শাস্তি হিসেবে পরবর্তী খেলা থেকে বহিষ্কার হই। আমার পরে ফয়সাল ও রিয়াদও মাস্ক খুলে ফেলায় একটি করে গেম বহিষ্কার হতে হয়।
পেইন্টবল এডভেঞ্চার শেষ হলে মিনিগ্রুপ এবার রওনা দেয় ক্রোওলির বিখ্যাক্ত বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট তামাশা’র উদ্দেশ্যে। জুবায়ের ভাইয়েরে উপর লাঞ্চের দায়িত্ব থাকায় তিনি তামাশা রেস্টুরেন্টের মালিক আব্দুল আজিজ সাহেবের সঙ্গে আগেই যোগাযোগ করে রেখেছিলেন। তামাশা’র বুফে সিস্টেমে প্রায় গোটা ত্রিশ আইটেম দিয়ে সবাই ভরপেট খেয়ে নিলাম। খাওয়ার মাঝামাঝি আব্দুল আজিজ ভাই যোগ দিলে তার সাথে আড্ডা ও খাওয়া দুটোই সমানতালে চালিয়ে নিলাম সবাই। খাওয়া, নামাজ এবং কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর শরীরে অবসাদ আসি আসি করতে শুরু করলেও মানসিক ইচ্ছাকে জয়ী করেই সবাই ব্রাইটনবীচের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
৪০ মিনিট জার্নির পর ব্রাইটনের পাথুরে বীচে নামলাম সবাই। বিশাল সমুদ্র বুক পেতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করলেও ঠাণ্ডার কারণে কেউ পানিতে নামলাম না। তবে প্রতিকূলতা থাকা স্বত্ত্বেও পাথুরে বীচেই ফুটবল খেলা শুরু করে দিলাম সবাই। ফুটবল খেলে ক্লান্ত হলে সবাই বিশ্রাম নিতে শুরু করলাম। এরই ফাঁকে টুকটাক সেলফি তোলা শুরু হলো। তারপর আস্তে আস্তে গ্রুপফটো, সোলো ফটো ইত্যাদি ফটোসেশন শুরু হলো। ফটোসেশন শেষ হলে বীচের সাথের রাস্তা দিয়ে উদ্দেশ্যহীন হাঁটা চললো প্রায় আধাঘন্টার মতো।
এরই মাঝে সন্ধ্যে হয়ে এলো। আমরা যতোই উত্তেজিত থাকি না কেন, প্রকৃতি নিজেই বিশ্রাম নিতে চাইল। প্রকৃতিকে সম্মান জানিয়ে আমরাও সাগরকে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে উঠলাম একগাদা সুখস্মৃতি নিয়ে। স্মৃতির পাতায় অম্লান হয়ে থাক চ্যানেলএস এর ইতিহাসের প্রথম ডে আউট, ৩০ আগস্ট ২০২০ ।

Advertisement