তালেবান ও সমর্থনকারীদের বিরুদ্ধে অবরোধের বিল মার্কিন সিনেটে, দৃষ্টি পাকিস্তানের দিকেও

আফগানিস্তানে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তালেবান ও তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ দেয়ার একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীসহ উচ্চ পর্যায়ের ২২ জন সিনেটর এই বিল সোমবার উত্থাপন করেছেন। এর নাম- ‘আফগানিস্তান কাউন্টার টেরোরিজম, ওভারসাইট, অ্যান্ড একাউন্টেবলিটি অ্যাক্ট’। এতে আফগানিস্তানে তালেবানদের বিরুদ্ধে অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা দেয়ার কথা বলা হলেও তা পাকিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের মন্ত্রীপরিষদের একজন সিনিয়র সদস্য। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এক্সপ্রেস ট্রিবিউন।

যে ২২ জন সিনেটর এই বিল উত্থাপন করেছেন তারা সবাই বিরোধী রিপোবলিকান দলের। এতে তালেবান, আফগানিস্তানে তালেবানদের সহায়তাকারী এবং অন্যান্য অংশের বিরুদ্ধে অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে তালেবানদের সমর্থন দিয়েছে অথবা দিচ্ছে এমন যেকোনো বিদেশি সরকারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে রিভিউ করতে হবে এবং তাদেরকে দেয়া সহায়তা স্থগিত করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর নিষেধাজ্ঞাও দেয়া যেতে পারে। এর এক অংশে পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তালেবানদেরকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে এই দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের ইডাহো রাজ্যের প্রতিনিধি এবং ইউএস সিনেট ফরেন রিলেশন্স কমিটির পদস্থ সদস্য সিনেটর জিম রিস বিলটি উত্থাপন করেন। তুরস্কের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার ক্ষেত্রে সহযোগী হিসেবে তিনি কাজ করেছিলেন। পাশাপাশি ইসরাইলি পণ্য বর্জন বা বর্জনে অংশগ্রহণকে উৎসাহী করাকে একটি ফেডারেল ক্রাইম হিসেবে গণ্য করা এবং পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনের পক্ষে কাজ করেছেন।

নতুন এই বিলটিতে সায় দিয়েছেন অন্য ২১ জন সিনেটর। এর মধ্যে আছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতাকারী সিনেটর মিট রমনি। আছেন, ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাইমারিতে মনোনয়নে লড়াই করে হেরে যাওয়া মার্কো রুবিও।
যদিও এই বিলের সমর্থনকারীরা প্রাথমিকভাবে বলেছেন, বাইডেন প্রশাসন তড়িঘড়ি করে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করেছেন। এটা ছিল বিপর্যয়কর। তবে এর একটি অংশে তালেবানদের এবং তাদেরকে যারা সমর্থন দিয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

বিলটি যেসব সিনেটর সমর্থন করেছেন তাদের কারো কারো ওয়েবসাইটে অফিসিয়াল বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, এই বিলটি দাবি করছে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন নাগরিক, আইনগত স্থায়ী রেসিডেন্টস এবং আফগান স্পেশাল ইমিগ্রান্ট ভিসাধারীদের (এসআইভি) উদ্ধারের বিষয়টিতে দৃষ্টি দিতে, যারা আফগানিস্তানে আটকা পড়ে আছেন।
এসআইভিধারী এবং শরণার্থীদের বিষয়ে মেকানিজমে দৃষ্টি দিতে হবে। সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল অবলম্বন করতে হবে। তালেবানদের হাতে থাকা মার্কিন সরঞ্জাম উদ্ধার করতে হবে। তালেবান ও আফগানিস্তানে অন্যদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, মাদক পাচার, মানবাধিকার লঙ্ঘন করার কারণে নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। বিদেশি সরকারগুলো যারা তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। তালেবানদের যারা সমর্থন করে তাদের বিরুদ্ধে বৈদেশিক সহায়তার বিষয়টি রিভিউ করতে হবে। আফগানিস্তানে মানবিক সহায়তা নয়, এমন বিদেশি সহায়তার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ দিতে হবে।
আলাদা আরেকটি সেকশনে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের ডিরেক্টরের সঙ্গে পরামর্শক্রমে পররাষ্ট্রমনত্রী কংগ্রেসনাল কমিটিতে একটি যথার্থ রিপোর্ট জমা দেবেন। তাতে উল্লেখ থাকতে হবে তালেবানদেরকে কারা সমর্থন দিচ্ছে। পাকিস্তানের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে এতে। বলা হয়েছে, প্রথম রিপোর্টে থাকতে হবে (১) ২০০১ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার সহ কোনো রাষ্ট্র বা বিরাষ্ট্রীয় সমর্থনের বিষয়। এতে উল্লেখ থাকতে হবে তালেবানদের সুবিধা দিয়েছে কারা, আর্থিক সহায়তা দিয়েছে কারা, গোয়েন্দা সমর্থন দিয়েছে কারা, লজিস্টিক এবং মেডিকেল সমর্থন দিয়েছে কারা, প্রশিক্ষণ- সরঞ্জাম দিয়েছে কারা। কৌশলগত, অপারেশনাল অথবা কৌশলগত নির্দেশনা দিয়েছে কারা। (২) ২০২১ সালে তালেবানরা আফগানিস্তানের সরকারকে উৎখাত করে। এই অপরাধের জন্য পাকিস্তান সরকার সহ কোনো রাষ্ট্র বা বিরাষ্ট্রীয় শক্তির সমর্থনের বিষয়ে মূল্যায়ন করতে হবে। (৩) পাঞ্জশির উপত্যকায় এবং আফগানিস্তানের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এ বছর সেপ্টেম্বরে যে আক্রমণ চালানো হয়েছে তাতে পাকিস্তান সরকারসহ কোনো রাষ্ট্র, বিরাষ্ট্রীয় শক্তির সমর্থনের বিষয়টি মূল্যায়ন করতে হবে।
পাকিস্তানের ক্ষোভ

বিলটির কড়া সমালোচনা উঠেছে পাকিস্তানে। দেশটির মানবাধিকার বিষয়ক মন্ত্রী টুইটারে বিলটির সমালোচনা বরেছেন, আবারও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হওয়ার কারণে পাকিস্তানকে বড় মূল্য দিতে হবে। আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি পালিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র তার সেনা প্রত্যাহারের সময় এক বিশৃংখল অবস্থার সৃষ্টি করে। তারপর মার্কিন সিনেটররা এই বিল এনেছেন। ২০ বছর দেশটিতে অবস্থান করার পর অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিধর যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সদস্যরা একটি অস্থিতিশীল সরকার কাঠামোর মধ্যে ফেলে গেছে আফগানিস্তানকে। তাদের এই ব্যর্থতার জন্য এখন পাকিস্তানকে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। আফগানিস্তানের যুদ্ধ কখনোই আমাদের যুদ্ধ ছিল না। তা সত্তে¡ও পাকিস্তানে কমপক্ষে ৮০ হাজার মানুষকে মরতে হয়েছে। অর্থনীতিতে বড় আঘাত এনেছে। আমাদের যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা কমপক্ষে ৪৫০টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে পাকিস্তানে। ভয়াবহ সেই হামলা হয়েছে আমাদের উপজাতি জনগোষ্ঠীর ওপরে এবং তাদের এলাকায়। তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের উচিত আরো গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের আত্মদর্শন করা। তিনি প্রশ্ন রাখেন, আপনাদের ২ ট্রিলিয়ন ডলার কোথায় হারিয়ে গেল? ভীষণভাবে বিনিয়োগ করা এএনএ বিলুপ্ত হয়ে গেল কেন? পাকিস্তানকে কে বলেছিল তেহরিকে তালেবান আফগানিস্তানের নেতৃত্বতে মুক্ত করে দিতে? তেহরিকে তালেবান আফগানিস্তানের সঙ্গে কাতারের রাজধানী দোহা’য় কে স্বাক্ষর করেছিল? কে তাদের ওয়াশিংটন ডিসিতে ডেকে নিয়েছিল? পাকিস্তানি এই মন্ত্রী আরো বলেন, এনাফ ইন এনাফ। যথেষ্ট হয়েছে। আফগানিস্তানে যেসব দেশ উপস্থিত ছিল তাদের উচিত পাকিস্তানকে টার্গেট করার পরিবর্তে নিজেদের ব্যর্থতার দিকে দৃষ্টি দেয়া।

Advertisement