দুঃখে যাদের জীবন গড়া

জোহরা শিউলী

বিমানবন্দরে নামছেন একে একে। কেউ বা একেবারে স্থির। অধিক শোকে পাথর। আবার কেউ বা প্রিয় মাটিতে পা ফেলে করছেন বিলাপ। সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা বেশ কয়েকজন। প্রতিদিন ফেরত আসছেন এমন অনেক নারী। কাজের জন্য যারা গিয়েছিলেন সৌদি আরবে। কিন্তু দিনের পর দিন নির্যাতনে তারা পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন।

চুক্তিটা হয় ২০১৫ সালের। ফেব্রুয়ারিতে। গৃহকাজে কর্মী নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করে সৌদি আরব। কিন্তু সেখানে যৌন নির্যাতনসহ অমানবিক কষ্টের জন্য ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনসহ বেশ কয়েকটি দেশ নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ রেখেছে।

২০১৮ সালে ১৮টি দেশে যাওয়া নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল এক লাখের বেশি- সরকারের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর দেওয়া তথ্যে এমন খবর পাওয়া

যায়। এই এক লাখের মধ্যে সৌদি আরবে যান ৮৩ হাজার ৩৫৪ জন।

একই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে গৃহকর্মীদের আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। ফলে সেফহোমে গৃহকর্মীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬৯ জনে। সেফ হোমের অবস্থা অসহনীয় হয়ে ওঠে দিন দিন। সেফহোম থেকে যেভাবেই পারেন নারীরা দেশে আসার জন্য অস্থির হয়ে থাকেন। এসব নারী দেশে আসার পর তাদের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা জানান।

দিনের পর দিন না খাইয়ে; বাথরুমে আটকে রাখা। একই পরিবারের একাধিক পুরুষ সদস্য দ্বারা নির্যাতনের শিকার হওয়া। এমনই দিন কাটে বিদেশ- বিভূঁইয়ে আমাদের নারীদের।

২০১৮ সালের ২২ থেকে ২৭ এপ্রিল প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল সৌদি আরবে যায়। প্রতিনিধি দলের সুপারিশে বিদেশে পাঠানোর আগে নারীদের কমপক্ষে এক মাস প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং চুক্তির শর্ত সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দেওয়ার কথা রয়েছে। এর সঙ্গে বিএমইটি থেকে ইস্যু করা স্মার্টকার্ড, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবে যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়েছে তাদের বিস্তারিত ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর রাখা, নারী গৃহকর্মীদের পাঠানোর আগে তাদের সবকিছু দূতাবাসকে অবহিত করা- এমন সুপারিশ করার পরও কার্যত এর কোনো ফল দেখা যায়নি।

এই যে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে আমাদের নারীদের বিদেশে পাড়ি দেওয়া এবং স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণায় দেশে ফেরা কি বন্ধ হবে না কোনোদিন? প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য রাইটস অব বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট- ওয়্যারবির চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক জানান- এই যে আমাদের নারীরা এত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, সেই নির্যাতন বন্ধে সরকারই একমাত্র ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রধান শরিফুল হাসান জানান- এই যে আমার দেশের দুই লাখ নারী, যার মধ্যে আমরা পাঁচ হাজার জনকে ফেরত আনতে পেরেছি। বাকিরা, যারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এই নির্যাতন আমার দেশের। ওরা যে অপমানের শিকার হচ্ছে এই অপমান আমাদের দেশের। তবে এর মধ্যে একটি ভালো খবর হলো, প্রবাসীদের নানা হয়রানি, ভোগান্তি বা অভিযোগের শুনানি করতে এখন থেকে প্রতি মাসের প্রথম বুধবার সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত গণশুনানি করবে ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ড। আমি মনে করি, সবাইকে জবাবহিদিতায় আনার এটি একটি চমৎকার উদ্যোগ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Advertisement