নির্বাচন কমিশনের সামনে চ্যালেঞ্জ

:: এম হাফিজ উদ্দিন খান :: আগামী ১৫ মে ২০১৮ গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এখন পর্যন্ত যা পরিলক্ষিত হয়েছে এই দুই সিটিতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের নানাবিধ অভিযোগ থাকলেও অনেকেই মনে করেন সামগ্রিকভাবে নির্বাচনকেন্দ্রিক ইতিবাচক পরিস্থিতি বিদ্যমান। খুলনা ও গাজীপুর শিল্পপ্রধান এলাকা এবং এই দুটি সিটিতেই রয়েছে নানাবিধ সমস্যা। গত কয়েক দিনের পত্রপত্রিকার প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত যেসব চিত্র ফুটে উঠেছে তাতে প্রতীয়মান হয়, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। এ ব্যাপারে বিভিন্ন মহলে বহুবিধ প্রশ্ন ও শঙ্কা দুই-ই আছে। এই দুটি সিটিতেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে।

গাজীপুর ও খুলনা দুই সিটিই এখন নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় সরগরম। গণতন্ত্রে সুস্থ প্রতিযোগিতার বিষয়টি দৃষ্টিনন্দন হিসেবেই মূল্যায়িত হয়ে থাকে। কিন্তু এসব ব্যাপারে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রীতিকর নয়। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, প্রশ্নমুক্ত হওয়া এবং নির্বাচনে জয়ী কিংবা পরাজিত প্রার্থীদের জনরায় মেনে নেওয়ার মধ্যেই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য নিহিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ ব্যাপারেও অতীতে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। এমনটির পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়। এ জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের যেমন, তেমনি জয়ী কিংবা পরাজিত প্রার্থীদেরও উদার মনোভাবের পরিচয় দিতে হবে। প্রথমবারের মতো এই দুই সিটিতে মেয়র পদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দলীয় প্রতীকে। আগেরবার আনুষ্ঠানিক দলীয় সমর্থনে অনুষ্ঠিত হলেও এবার আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রতীকের এই নির্বাচন নিছক স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলেই মনে করি।

এই দুটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ফল রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে ভোটারদের পক্ষ থেকে এক ধরনের বার্তা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনে খুব একটা প্রভাব রাখে না- এমন মন্তব্যের সঙ্গে বিদ্যমান বাস্তবতায় দ্বিমত প্রকাশ করে বলতে চাই যে, দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনকেই ভোটারদের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। মেয়র পদের পাশাপাশি গাজীপুরে ৫৭টি সাধারণ, ১৯টি সংরক্ষিত আসন; খুলনায় ৩১টি সাধারণ ও ১০টি সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি এ চিত্র তুলে ধরে যে, নতুন প্রজন্মের ভোটাররা এই দুই সিটিতেই নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করবেন। কারণ দুটি সিটিতেই নতুন ভোটার বেড়েছে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশন কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়ে তাদের যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীকালে এই কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ওই দুটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনেই সরকারি দলের মেয়র প্রার্থীর পরাজয় ঘটে। নির্বাচন কমিশন প্রশ্নমুক্তভাবেই ওই দুটি নির্বাচন সম্পন্ন করলেও পরে স্থানীয় সরকারের কয়েকটি স্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তারা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে সক্ষম হয়নি। কুমিল্লা ও রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মহলের প্রার্থীদের পরাজয়ের বিষয়টি সরকারের জন্য অস্বস্তিকর হলেও নির্বাচন কমিশনের জন্য হয়েছিল স্বস্তির। কিন্তু বিরোধী দলের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় গিয়ে এলাকার উন্নয়নে ইতিমধ্যে কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পেরেছেন এ নিয়ে প্রশ্ন আছে।

ভোটারদের মধ্যে এমন ভীতি কাজ করে যে, সরকারবিরোধীরা নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের আন্তরিকতার বিষয়টিও সামনে চলে আসে। সরকার ও সরকারি দলের প্রার্থীরা নির্বাচনকে আসলে প্রভাবিত করতে, নাকি প্রভাবমুক্ত রাখতে চান- এ নিয়েও এক ধরনের শঙ্কা থাকে বিরোধী পক্ষের মধ্যে। তবে সব কথার শেষ কথা হলো- আসন্ন দুটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা দেখতে চাই নির্বাচন কমিশন যথাযথ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ওঠে।

গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সামনে চ্যালেঞ্জ দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। নির্বাচন শুধু আনুষ্ঠানিকতার নয়, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই দুই সিটি করপোরেশনে সুষ্ঠু ও প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়বে- এই অভিমত অমূলক নয়। নির্বাচন কমিশন এই দুটি নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি জনমনে স্পষ্ট করার সুযোগ পেয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি সরকারের জন্যও তা সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই এই দুটি নির্বাচন সুষ্ঠু করার সব রকম ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায় প্রথমত নির্বাচন কমিশনের, তারপর একই সঙ্গে সরকারেরও। গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সুষ্ঠু হোক, এটা শুভবোধসম্পন্ন সবার প্রত্যাশা। জয় হোক গণতন্ত্র ও জনগণের। জনগণের রায় প্রতিফলিত হোক নির্বাচনের ফলাফলে। নির্বাচনে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সে রকম পরিবেশ-পরিস্থিতি নিশ্চিত করার দায় নির্বাচন সংশ্নিষ্ট সবার। দলীয় সরকারের অধীনে এবং সেনা নিয়োগ ছাড়াও নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায়, এটা প্রমাণের দায়দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন ও সরকারের।

আর মাত্র কয়েক মাস পরই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার ও বিএনপি যেভাবে এগোচ্ছে, তা খুব একটা স্বস্তির বিষয় নয়। প্রকাশ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোন ধরনের ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত হবে, এ নিয়ে বিতর্ক আছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ও শঙ্কা দুই-ই বাড়ছে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান দুই দলের মুখোমুখি অবস্থানের যতই প্রকাশ ঘটছে, নির্বাচন নিয়ে ততই জনমনে শঙ্কা দানা বাঁধছে। এখন রাজনৈতিক পরিবেশ যা, তাতে নির্বাচন কতটা প্রশ্নমুক্ত হবে কিংবা খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি-না কিংবা গেলেও ওই নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত কী হয়- এ ধরনের নানারকম প্রশ্নে বিভিন্ন মহলে সংশয় বাড়ছে। বিএনপির নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়াকে একটি সাজানো দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দি করা এবং তার জামিন দীর্ঘায়িত করা সরকারি দল বা জোটের পুরনো ছকের অংশ। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা ইতিমধ্যে বলেছেন, খালেদা জিয়ার দণ্ড, তার জামিন স্থগিত ইত্যাদি নানা বিষয়ে বিএনপি নেতারা অহেতুক বিতর্ক ও জটিলতার সৃষ্টি করছেন।

খুলনা ও গাজীপুর সিটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী মেয়র প্রার্থীরা ইতিমধ্যে একমঞ্চে দাঁড়িয়ে নগরীর উন্নয়নে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ফুটে ওঠা এমন চিত্র অনেকের মধ্যেই স্বস্তি এনে দিয়েছে। প্রার্থীদের এমন অবস্থান স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনে পরিবেশ-পরিস্থিতি ইতিবাচক রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে, এমনটিই ধারণা করা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে কি এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থান আশা করা যায়? আমাদের দেশের জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে ইতিবাচকতার চেয়ে নেতিবাচক চিত্রই বেশি পরিলক্ষিত হয় বিদায় নানারকম প্রশ্ন দাঁড়ায়। অথচ রাজনীতিকরা চাইলেই কিন্তু সুস্থ ধারার রাজনীতির বিষয়টি নিশ্চিত করার পথ মসৃণ হয়। গণতন্ত্রে মত ও পথের ভিন্নতা থাকতেই পারে; কিন্তু এসব বিষয়ে সংঘাত-সহিংসতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের দেশে রাজনীতিকদের অর্জনের খতিয়ান যেমন অনেকটাই বিস্তৃত, তেমনি তাদেরই কারও কারও কারণে বিসর্জনের চিত্রও কম স্ম্ফীত নয়।

এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে রাজনীতিকরা আমাদের মুক্তি দেবেন, এই প্রত্যাশাটা রাখতে চাই।

নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, আগামী অক্টোবরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ৩শ’ সংসদীয় আসনের সীমানা চূড়ান্ত করেছে ইসি। এতে ২৫টি আসনের সীমানায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ৩০ এপ্রিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে. এম. নুরুল হুদার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এই সীমানা পরিবর্তনে বর্তমান সরকারের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছিল। নানাবিধ জটিলতা, সংশয়, প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েও আমরা প্রত্যাশা করতে চাই, দেশের সবরকম নির্বাচনী কর্মকাণ্ড ও রাজনীতি চলুক ইতিবাচক ধারায়। এ দেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য বরাবরই ত্যাগ স্বীকার করে এসেছে। জনগণের প্রতি রাজনীতিকরা শ্রদ্ধাশীল থাকবেন, তাদের রায় উদারচিত্তে মেনে নেবেন, এও প্রত্যাশা। দেশ ও জনগণের কল্যাণ যদি রাজনীতির মূল লক্ষ্য হয়, তাহলে জনগণের মনের কথা বুঝতে হবে, আমলে নিতে হবে এবং জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনের মর্যাদা দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, জনগণের মতামতের গুরুত্ব না দেওয়া, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সহমর্মিতার অভাব ও আস্থার সংকট থেকেই আমাদের দেশে রাজনীতিতে সংকটের সৃষ্টি হয়ে থাকে।

আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছি। আশা করি, একদিন সুস্থ একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাধ্যমে দেশে স্থাপিত হবে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রাজনীতির গুণগত মানে পরিবর্তন ঘটাতে পারলে সব দুরাশাই দূর হবে। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা ও বিকাশ অব্যাহত রাখতে হলে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন করতে হবে। ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে ইতিবাচক রাজনীতির বিকাশে কাজ না করলে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। নির্বাচন হলো গণতান্ত্রিক রাজনীতির অলঙ্কার।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

Advertisement