বুঝে পড়ার বিকল্প নেই

ব্রিট বাংলা ডেস্ক :: পুরোদস্তুর ভালো ছাত্রী বলতে যা বোঝায়, উর্মিতা দত্ত ঠিক তা-ই। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিসহ জিপিএ–৫, ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভালো ফলাফলের জন্য প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক, ৩৭তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে প্রথম হওয়ার গৌরব—সব আছে তাঁর ঝুলিতে। আগামী ৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে চিকিৎসকদের বিশেষ বিসিএস পরীক্ষা। উর্মিতা দত্তের এই লেখা পরীক্ষার্থীদের তো বটেই, নিশ্চয় সব শিক্ষার্থীকেই অনুপ্রেরণা দেবে।

চিকিৎসকদের জন্য এফসিপিএস (ফেলো অব কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস) এক কঠিন পরীক্ষার নাম। মজা করে আমরা বলি, এফসিপিএস মানে হলো ‘ফেল কনফার্ম, পাস সামটাইমস’! বিসিএস ও এফসিপিএস, দুটো পরীক্ষার প্রস্তুতি আমি একসঙ্গে নিয়েছি। তার ওপর তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে কাজ করতাম। সব মিলিয়ে দম ফেলার সময় ছিল না। এর মধ্যেও যতটুকু সময় পেতাম, ততটুকুই কাজে লাগাতাম। আমার মনে হতো, ইচ্ছাশক্তি আর অধ্যবসায় থাকলে তো মানুষ কত অসম্ভবকেই সম্ভব করতে পারবে। আমি কেন পারব না?

শেষ পর্যন্ত পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। এফসিপিএস (পার্ট ওয়ান) পরীক্ষায় পাস করেছি প্রথমবারেই। ৩৭তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে প্রথম হয়েছি। এখন পেছনে তাকালে অবাক লাগে।

গণিতের জন্য ভালোবাসা
ছোটবেলা থেকেই গণিত আমার সব চেয়ে প্রিয় বিষয়। পদার্থবিজ্ঞানও ভালো লাগত, কারণ এর বেশির ভাগই অঙ্কের সূত্রের মতো। এই ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল বাবার প্রেরণায়। বাবা রাত জেগে অঙ্ক করাতেন। আমার মনে হতো, জগতের সব সৌন্দর্য, সব রহস্য লুকিয়ে আছে অঙ্কের ভেতর।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ার সময় স্বপ্ন ছিল বুয়েটে (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) পড়ব। প্রকৌশলী হব। বুয়েট আর ঢাকা মেডিকেল কলেজ—দুটোতেই যখন পড়ার সুযোগ পেলাম; মা-বাবা বললেন, ‘আমাদের আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যেহেতু কোনো চিকিৎসক নেই, তুমি বরং মেডিকেলেই পড়ো।’

অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলাম। ক্লাসে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রির মতো কঠিন বিষয়গুলো মন খারাপ করে পড়তাম। ভাবতাম, বুয়েটে ভর্তি হওয়া আমার বন্ধুরা না জানি কত মজার মজার অঙ্ক করছে!

এক দিন ফিজিওলজি ক্লাসে ম্যাডাম বোঝালেন, মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গ কাজ করছে অঙ্কের সূত্র মেনে। প্রতিটা অঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ রক্তসঞ্চালনের জন্য মিনিটে কত বার হৃৎপিণ্ডকে ‘পাম্প’ করতে হবে, কিডনি কতটুকু তরল ছেঁকে বের করে দেবে, একটি মাত্র কোষ থেকে কীভাবে ভ্রূণ তৈরি হবে, লাখ লাখ কোষের মানবদেহ কীভাবে ক্রমবিভাজনের মাধ্যমে পরিণত হবে—এই সবই পরিচালিত হচ্ছে অঙ্কের সূত্র মেনে। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, চিকিৎসাবিজ্ঞান তো আসলে অঙ্কের কারখানা!

ম্যাডামের কথাগুলো আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিল। অঙ্কের মতো বুঝে বুঝে ফিজিওলজি পড়া শুরু করলাম। এরপর ধীরে ধীরে অ্যানাটমি, বায়োকেমিস্ট্রিও অনেক সহজ হয়ে গেল।

বুঝে পড়ার আনন্দ
একবার ভালো লেগে যাওয়ার পর আমি খুব আনন্দ নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়েছি। সুফলও পেয়েছি। মেডিকেলে ৩টি পেশাগত (প্রফ) পরীক্ষাতেই প্রথম হয়েছিলাম। ফলে ডিএমসি অ্যালামনাই ট্রাস্ট স্বর্ণপদক, ডা. আব্দুর রহমান মেমোরিয়াল স্বর্ণপদক, বাংলাদেশ সোসাইটি অব ফিজিওলজিস্ট স্বর্ণপদকসহ আরও কিছু পদক পেয়েছি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক।

এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউরোসার্জারিতে এমএস করছি। নিউরোসার্জারি বেছে নেওয়ার পেছনে কয়েকটা কারণ আছে। আমি সব সময় গতানুগতিকের বাইরে কিছু করতে চাইতাম। ইন্টার্নির সময় লক্ষ্য করেছি, এই বিভাগে রোগীর তুলনায় ডাক্তারের সংখ্যা একেবারেই অপ্রতুল। কিন্তু আমার মনে হতো, এই ক্ষেত্রে নতুন অনেক কিছু করার সুযোগ আছে। মানবদেহের সবচেয়ে জটিল আর রহস্যময় অঙ্গ হলো মস্তিষ্ক। এই মস্তিষ্কই তো বিধাতার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, মানুষকে সার্বিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। তাই মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ করার একটা অন্য রকম রোমাঞ্চ আছে। এই রোমাঞ্চ আমি সারা জীবন পেতে চেয়েছি।

প্রথম দিকে ভাবতাম, বিসিএস দেব না। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সার্জারি বিভাগে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে কাজ করার সময় বুঝলাম, সরকারি ডাক্তার হলে হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ অনেক বেশি থাকে। আরও বেশি শেখার এই সুযোগ আমি হাতছাড়া করব কেন? এফসিপিএস আর বিসিএস—দুটো পরীক্ষার প্রস্তুতি একেবারে আলাদা। অনেক কষ্ট হয়েছে, তবু হাল ছাড়িনি। আমার কাছে মনে হয়, যেকোনো পরীক্ষায় ভালো করার পূর্বশর্ত হলো বিষয়গুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখা। ধারণাটা পরিষ্কার হলে প্রশ্ন যেভাবেই আসুক, উত্তরটা সহজ হয়ে যায়। পরীক্ষক কী জানতে চাচ্ছেন, আর আমি কী বলছি বা লিখছি, দুটো বিষয়ের সামঞ্জস্য করতে পারলে কোনো পরীক্ষাই আর কঠিন থাকে না।

অনেকে বলেন, মেডিকেলে পড়লে তো সারা জীবন পড়ালেখা করতে হয়, ক্লান্ত লাগে না? আমি বলি, এটা তো আশীর্বাদ। প্রতিদিন নতুন নতুন কিছু শিখব, সেটা আমার কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করব। কাজটা কখনোই আমার কাছে একঘেয়ে মনে হবে না। এটাই–বা কম কিসে?

বিশেষ বিসিএসের পরীক্ষার্থীদের জন্য ৫ পরামর্শ

১. সময় খুব কম। তাই বলে উদ্বিগ্ন বা অস্থির হওয়ার কিছু নেই। আবার একেবারে হাল ছেড়ে দিয়েও তো কোনো লাভ হবে না। যে সময়টা হাতে আছে, সেটারই সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে হবে।

২. বিশেষ বিসিএসে ১০০ নম্বর থাকবে চিকিৎসাবিজ্ঞানবিষয়ক প্রশ্নে। মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে আছে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি ও ফার্মাকোলজি। একটা বিষয়ের খুব বেশি গভীরে ঢুকতে গিয়ে যেন অন্য একটা বাদ পড়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

৩. ‘ক্লিনিক্যাল’ বিষয়গুলো থেকে কিছু কিছু প্রশ্ন আসার কথা। এ ক্ষেত্রে বলব, নতুন করে খুব বেশি কিছু পড়ার আর দরকার নেই। নিজের অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা করেই এগুলোর মোকাবিলা করতে হবে।

৪. চিকিৎসাবিজ্ঞান ছাড়া অন্য বিষয়গুলো থেকে ১০০ নম্বরের প্রশ্ন থাকবে। গণিত আর বুদ্ধিমত্তার প্রশ্নগুলোর জন্য আগের বছরের সমস্যাগুলো সমাধান করাই যথেষ্ট। সবাই যেহেতু বিজ্ঞানের ছাত্র, তাই এ ক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ার কথা না। বাংলা আর ইংরেজি—দুটোতেই জোর দিতে হবে ব্যাকরণের ওপর, এখানে সহজে নম্বর তোলা যায়। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবারই কিছু বিষয় থেকে প্রশ্ন থাকে, এগুলো কোনোভাবেই বাদ দেওয়া যাবে না। যেমন সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধ, সাম্প্রতিক কিছু উল্লেখযোগ্য বিষয়। আর আন্তর্জাতিক বিষয়ের পরিধিটা এত বড় যে এই অল্প সময়ে সব পড়ে শেষ করা সম্ভব না। বেছে বেছে পড়তে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিভিন্ন চুক্তি—এসব থেকে প্রশ্ন আসেই। এগুলো শেষ করার পর যদি সময় থাকে, তাহলে সাম্প্রতিক ঘটনাবলির ওপর একটু নজর রাখা দরকার।

৫. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কোনো প্রশ্নের উত্তরে কমপক্ষে শতকরা ৫০ ভাগ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত উত্তর দেবেন না। কারণ, ‘নেগেটিভ মার্কিং’–এর ধাক্কায় বাদ পড়তে পারেন। অনুমানের ওপর নির্ভর করার চেয়ে বুঝেশুনে উত্তর করতে পারলে পাসের সম্ভাবনা বাড়ে।

সর্বোপরি নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন, স্রষ্টার ওপর ভরসা রাখুন। চাপমুক্ত থাকুন। দিন শেষে এটা শুধুই একটা পরীক্ষা। আপনার সাফল্য কামনা করি।

Advertisement