ভালো-মন্দ যখন একাকার হয়ে গেছে

ব্রিট বাংলা ডেস্ক :: বড় দলের জন্য রাজনীতি শুধু ক্ষমতার বাহন হয়ে ওঠার ফলে রাজনীতিবিদের সংজ্ঞা কি পরিবর্তিত হচ্ছে? অন্তত প্রধান দুই দলে দরিদ্র রাজনীতিবিদদের আর সামনের কাতারে দেখা যায় না; বরং মনে হয় বড় দলে আর দরিদ্র কর্মীও বোধ হয় নেই। এখন জনসেবা করার জন্য নিজের কিছু রেস্ত প্রয়োজন হয়। যাঁরা গরিব রাজনীতিক, তাঁদের দলও ছোট, রাজনৈতিক আয়োজনও ছোট আকারের হয়ে থাকে।

বলা হয় যে এই বঙ্গের মানুষ বরাবর উদ্যোগী। সত্যি এ দেশের মানুষ তার পেশা, পদ, দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত ক্ষমতা, পরিচিতি, বিত্ত বাড়িয়ে চলতে পারে। ওয়াসা-পিডিবির এমন উদ্যোগী মিটার রিডার, সরকারি অফিসের করণিক, ঠিকাদার যেমন মিলবে; তেমনি পাবেন সাংবাদিক, নানা কলায় দক্ষ শিল্পী, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মীও—যাঁরা উচ্চাভিলাষী, ভাগ্যান্বেষী এবং লক্ষ্য হাসিলে সফল। কেউ বুদ্ধি এঁটে মাঠে নেমে ক্ষমতাবান ও ধনী যুগপৎ দুটিই হতে সক্ষম। এ দেশে ক্ষমতা ও বিত্ত পরস্পরের পরিপূরক। আইন ও নীতির ভিত্তি এত শক্ত নয় যে অত পরোয়া করে চলতে হবে। বেপরোয়া হওয়ার সুযোগই যে শুধু আছে তা নয়, তাদের কদরও দেয় এ সমাজ।

এতে সমস্যাও আছে। খেলার মতো যেকোনো কাজেই কিছু নিয়ম–নীতি থাকে। যেখানে সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে ‘সফল’ হওয়ার দৌড়ে প্রবৃত্ত, সেখানে নিয়মভঙ্গ হবেই। একজনের কারণে অন্যের উত্থান বিঘ্নিত হতে পারে, এর ফলে একই গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদ-সংঘাত লেগেই থাকে। বাংলাদেশ এ বাস্তবতারও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত—এখানে যত না আন্তদলীয় সংঘাত হয়, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে অন্তর্দলীয় খুনোখুনি। পেশাজীবীদের মধ্যেও উপদলীয় বিভেদ প্রায়ই প্রকাশ্যে প্রকটভাবে ধরা দেয়। সমাজে যে শান্তি বা সহাবস্থান দেখা যায় তা ঘটে স্বার্থের শর্তে, নয়তো অতি শক্তিধর কারও একক দাপটের ফল এটি।

এককালে কোনো কোনো জমিদারের নাম করে বলা হতো অমুকের ভয়ে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়। এই ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য এখন প্রতিটি এলাকায় একেকজন রাজনীতিবিদ তৈরি হয়ে উঠছেন, যাঁদের দাপটে এলাকায় সব বাঘ ও গরু এক ঘাটেই জল পান করে। এঁদের নীতিটি সহজ, এলাকার অভিভাবক হিসেবে ভালো-মন্দ সব কাজের অধিকারী তিনিই অথবা নিদেনপক্ষে তাঁর নির্দেশিত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী। নিজস্ব ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী এলাকায় তাঁর আধিপত্যের পাহারাদারি করবে। প্রথম প্রথম নীতিবাদীরা তাঁদের মানতে ইতস্তত করলেও আস্তে আস্তে তাঁদের বাস্তব বোঝার চেতনা ও চোখ খুলে যেতে থাকে। শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে অবমাননার দায় থেকে যখন অভিযুক্ত সাংসদ বেকসুর খালাস পেয়ে যান, তাঁর ‘কৃতিত্ব’ ভুক্তভোগীর প্রাণরক্ষায় মানবিক কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়, তখনো চোখ ও চেতনা না জাগলে সে মানুষ এ সমাজে অচল।

মাঝে মাঝে অচল মানুষদের সচলদের হাতে শায়েস্তা হওয়ার খবর পত্রিকায় পাওয়া যায়। ম্যাজিস্ট্রেট, প্রকৌশলী, প্রধান শিক্ষক প্রমুখ চপেটাঘাত, প্রহার বা পদচ্যুতির মতো অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। তা নিয়ে মাননীয় জনপ্রতিনিধিরা থোড়াই মাথা ঘামান। যদি ঘামাতে হয় তাহলে উপরমহলে যোগাযোগ বাড়িয়ে দায়মুক্তির ব্যবস্থা করেন।

ইংরেজিতে একটি মহাজন বাক্য এ রকম: যখন সম্পত্তি হারায়, তখন কিছুই হারায় না, যখন স্বাস্থ্য হারায়, তখন কিছু একটা হারায়, আর যখন চরিত্র হারায়, তখন সবকিছুই হারিয়ে যায়। একালে আমাদের দেশে সম্ভবত উল্টো দিক থেকেই কথাটা গ্রহণ করা হয়েছে। যে ধরনের ‘সফল’ মানুষদের কথা বলছি, তাঁদের প্রথম বাদ দিতে হয় চরিত্রশক্তি। শিখে নিতে হবে নিজের কথাটা উঁচু গলায় সবাইকে ছাপিয়ে বলার দক্ষতা। যখন একা সম্ভব হবে না, তখন দলেবলে চালাতে হবে, কথায় কাজ না হলে হাত চালাতে হবে, হাতে অস্ত্র থাকাও অস্বাভাবিক নয়। সত্যটা নিজেকেই তৈরি করে নিতে হবেÑ নিজের জন্য নিজের সুবিধামতো। এই হিসাবটা নিজের স্বার্থ যঁারা ভালো বোঝেন, তাঁদের বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। তাঁরা দলে দলে বড় দলের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন।

মানুষ, বিশেষত তরুণসমাজ, আশপাশ থেকেই দেখে–শুনে শেখে। মনে আছে, স্বাধীনতার পরপর যখন পাবলিক পরীক্ষায় গণহারে নকল উৎসব চলছিল, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ফেরত বেসরকারি কলেজের তরুণ প্রভাষক হিসেবে নকলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর পর এক নেতা গোছের ছাত্র নিতান্ত সরলভাবে বলেছিল, ‘স্যার, আপনি এতে এত সমস্যা দেখছেন কেন? আমরা তো এভাবেই পরীক্ষা দিয়ে আসছি।’ তার সরল–সহজ উপলব্ধির কথা শুনে আমার মুখে আর কথা জোগায়নি। একালে অনেকেরই রাজনীতিতে দীক্ষা হচ্ছে এলাকার ভালো-মন্দের দায় গ্রহণকারী বিত্তবান-ক্ষমতাবান দাপুটে নেতাদের দেখে। রাজনীতি ক্ষমতা ও বিত্তের মই হিসেবেই ব্যবহৃত হতে দেখছে তারা। হয়তো এটাকেই রাজনীতির দস্তুর, অন্তত রাজনীতিতে ‘সাফল্য’ লাভের পথ হিসেবেই দেখছে তারা। তবে বিপদ এলে এর ফাঁকির দিকটা ধরা পড়ে। আওয়ামী লীগের দিকে তাকিয়ে বলা যায়, এ রকম মানুষদের হাতে রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বাঙালির অসাম্প্রদায়িক মানবিকবোধ এবং এমনকি খোদ আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক চেতনা উপেক্ষিত, অগ্রাহ্য হয়।

তবে বাংলাদেশ এক আজব দেশই বটে। ওপরের দুর্নীতি, ক্ষমতার ব্যাপক অপব্যবহার, আইনের শাসন বা মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির মধ্যেও কোথায় যেন শুভ বাংলাদেশের জাগরণও ঘটে চলে। দৃষ্টান্ত হিসেবে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক-দালালবিরোধী আন্দোলন, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন, গণজাগরণ মঞ্চ এবং সাম্প্রতিক সময়ের কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনসহ নানা সৃজনশীল মানবিক কাজের কথা বলা যায়। বহু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা ক্ষুদ্র দলের অনেক সার্থক কাজের পরিচয়ও পাই। একদল তরুণ নিজেদের লেখাপড়ায় মনোযোগী, কেউ কেউ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের কাজ করছে, নানা মানবিক উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট হচ্ছে, কেউ কেউ মানুষের কল্যাণে প্রকল্প তৈরি ও বাস্তবায়ন করছে। অনেক বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে, নতুন নতুন ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ছে, অনুসন্ধিৎসু, জিজ্ঞাসু মনেরও পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। এদের ভূমিকা সমাজে ধীরে ধীরে অনুভূত হবে। শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও এর গুরুত্বের বিষয়ে সচেতনতা বেড়েছে। একে ডিগ্রি ও সনদের বৃত্ত থেকে জ্ঞানের দিকে আনতে হবে। তেমন আলামত কিছু কিছু তরুণের মধ্যে দেখাও যাচ্ছে। ইংরেজি জানার বিস্তার ঘটেছে, গণিতে দক্ষতা বাড়ছে, প্রযুক্তির দক্ষতা অর্জনে ও এর বিজ্ঞানে আগ্রহও বাড়ছে, যদিও ধর্মান্ধতার প্রকোপ এখনো কমেনি।

এ কথা ঠিক, সর্বত্র অশুভ রাজনীতি ও বিকৃত সাফল্যের দাপট তরুণদের অনেকেরই দেশে থাকার আগ্রহ নষ্ট করে ফেলছে। নতুন করে যেন এখন আবার মেধা পাচার হচ্ছে। এমন অনিশ্চয়তা ও টানাপোড়েনের মধ্যে মনে হয় সেটিই হবে ভবিষ্যতের বা একালের রাজনীতি, যা সম্ভাবনাগুলোকে লালন করবে, বিকাশে সহায়তা দেবে। ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতা ও বিত্তের দাপটভিত্তিক যে রাজনীতি তার কাল যে শেষ হয়ে গেছে, হয়তো তারা একসময় তা বুঝবে। আরও শক্তির প্রয়োগ, আরও অপরাধের সংযোজন এবং এর পুনরাবৃত্তি বর্তমান ব্যবস্থার নাভিশ্বাসেরই প্রমাণ দেয়।

এখনকার কিছু তরুণ দেখেছে ‘গোপন হিংসার কপট রাত্রি-ছায়ে/ হেনেছে নিঃসহায়ে।’ তারা আরও দেখছে, ‘প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।’ তারা তো তরুণ, তাই কত দিন তারা তাদের ভুবনকে এভাবে দুঃস্বপ্নের তলে লুপ্ত হতে দেবে? তারও তো একটা সীমা আছে। যারা সভ্যতা ও মানবতার বায়ুকে বিপর্যস্ত করে তোলে, সভ্যতা-সংস্কৃতির আলো নিভিয়ে দেয়, তাদের দাপট চিরস্থায়ী নয়। এখন প্রশ্ন হলো তাদের পতনের পরে আমরা কি এক হতাশা থেকে অধিকতর হতাশার মধ্যে পড়ব? নাকি সত্যিই নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে যে তরুণেরা জেগে উঠেছিল তারা বড় পরিসরে বড় ভূমিকায় নামবে? সুযোগ তৈরি হবে নতুন রাজনীতির?

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Advertisement