ভেনেজুয়েলায় চাই আইনের শাসন

মেরিহেন হিমেনেজ মোরালেস :: বিভিন্ন স্বৈরশাসকের অধীনে ভেনেজুয়েলার জনগণের দুর্ভোগের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এসব শাসক এমন কর্তৃত্বমূলক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, যেখানে রাষ্ট্রের কল্যাণের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থই প্রাধান্য পায়। ভেনেজুয়েলা রাষ্ট্রের জন্মমুহূর্ত থেকেই এই শাসনব্যবস্থা চালু হয়।

লাতিন আমেরিকার মুক্তির দূত হিসেবে পরিচিত সিমন বলিভার স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ১৮২১ সালে ভেনেজুয়েলাকে স্বাধীন করার পর দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট হন। তিনিই এখানে এবং আরও চারটি দেশে (কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, বলিভিয়া ও পেরু) স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। তবে এর সব কটি দেশেই তিনি চরম কর্তৃত্বমূলক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। তিনি শীর্ষ পদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশ্বাসী ছিলেন এবং কোনো ধরনের সমালোচনা বা চ্যালেঞ্জ সহ্য করতেন না। বলিভারের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এই কর্তৃত্বমূলক শাসনব্যবস্থা অদৃশ্য হয়ে যায়নি। হোসে আন্তোনিও পায়েজ, আন্তোনিও গুজমান ব্লাঙ্কো বা হুয়ান ভিনসেনতে গোমেজসহ বলিভারের সব উত্তরসূরি তাঁকেই অনুসরণ করেছেন। বলিভারের মতো মহিমান্বিত হওয়ার জন্য তাঁরা উদীয়মান একটি রাষ্ট্রে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেয়ে নিজের মর্যাদা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছেন।

প্রেসিডেন্ট মার্কোস পেরেজ দিমেনেজের শাসনের অধীনে ১৯৫০-এর দশকে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অঙ্গনে আধিপত্য বিস্তারের জন্য অভিজাততন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদ অব্যাহত ছিল। মার্কোস পেরেজ ভেনেজুয়েলার প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রোমুলো গালেগসকে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। পেরেজের ক্ষমতার অপব্যবহার ও নির্মম দমননীতি ভেনেজুয়েলার সমাজের শ্বাসরোধ করে ফেলেছিল। ফলে জনগণ তাঁর বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে। পরে সামরিক বাহিনীর জুনিয়র কর্মকর্তাদের একটি দল ১৯৫৮ সালে পেরেজকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং একটি নতুন রাজনৈতিক সূচনা করার পথ সুগম করে।

ভেনেজুয়েলার প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো তথাকথিত পুন্টোফিজো নামে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যা দেশটিতে গণতন্ত্রের উত্তরণের সূচনা করে। এই চুক্তির ফলে অন্ততপক্ষে তিন দশক দেশটিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় ছিল এবং আর্থসামাজিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। তবে কর্তৃত্ববাদের সংস্কৃতিটি একেবারে অদৃশ্য হয়ে যায়নি।

কার্লোস আন্দ্রেজ পেরেজ ব্যক্তিগত স্বার্থে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের জন্য নিজের মহিমান্বিত ভাবমূর্তিকে ব্যবহার করেছিলেন। তিনি দুই দফায় ১৭৭৪-১৯৭৯ এবং ১৯৮৯-১৯৯৩ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা শাসন করেন।

অভিজাত বলে পরিচিত এসব শাসকের কর্মকাণ্ডের দাম দুই শতক ধরে ভেনেজুয়েলাকে দিতে হয়েছে। তারা পদ্ধতিগতভাবে রাষ্ট্রের জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। জনগণ তাঁকে পেয়েছে একজন মজার মানুষ হিসেবে। তাঁর সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করা যেত। তিনি কথা বলতেন সাধারণ ভেনেজুয়েলানদের মতো। তাঁর জনপ্রিয়তা দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর লোকরঞ্জনবাদী বক্তৃতার কারণে তিনি সারা বিশ্বের বহু মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হন। চাভেজের বিদেশি সমর্থকেরা এই ধারণা দিয়েছিলেন যে ভেনেজুয়েলায় অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র রয়েছে, যা সে দেশের দুর্নীতির মূলোৎপাটন করবে। কিন্তু তা হয়নি। চাভেজ এবং তাঁর উত্তরাধিকারী নিকোলা মাদুরো ক্রমপরম্পরায় গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছেন এবং রাষ্ট্রীয় সব সংস্থার মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করেছেন। এর ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর চাভেজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তাঁর ব্যক্তিগত অনুমোদন ছাড়া দেশে কোনো কিছুই হয়নি। এদিকে মাদুরোর পরিস্থিতিটা একটু ভিন্ন, ক্ষমতাসীন জোটের অংশীদারদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা করতে হয়েছে, তবে এটা সত্য যে এতে ভেনেজুয়েলার প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং ক্ষমতাহীন হয়েছে এবং এ মুহূর্তে নির্বাহী ক্ষমতার কোনো কার্যকর ভারসাম্য নেই।

গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা নয়, সেখানে ক্ষমতার ভারসাম্যও থাকতে হবে, যেখানে সংসদ, বিচার বিভাগ ও সমাজ সবাই সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নির্বাহীদের ওপর নজর রাখতে সক্ষম।

ভেনেজুয়েলাকে কর্তৃত্ববাদের শাসন থেকে বের করে আনার জন্য এমন একজন নেতার প্রয়োজন, যিনি কোনো ধরনের মহিমায় বিশ্বাস করেন না (যেমন হুয়ান গুয়াইদো) এবং যিনি নিজের ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেয়ে প্রতিষ্ঠান নির্মাণের দিকে বেশি মনোযোগী হবেন। প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর পদত্যাগের দাবিতে গুয়াইদো কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ করছেন। তিনি নিজেকে ইতিমধ্যে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি মানবাধিকার, আইনের শাসন, শান্তিপূর্ণভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি পুনরুদ্ধারের কথা বলছেন। গুয়াইদো হয়তো ভালো ভাষণ দিতে পারেন, কিন্তু তাই বলে তিনি সবকিছু ঠিক করে দেবেন, এমনটা ভাবার এখনই কোনো প্রয়োজন নেই। তবে তিনি আসলেই কী করবেন, তা জানার জন্য হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Advertisement