মরহুম আনসারী সাহেবের জানাজা এবং বাংলাদেশের কোয়ারেন্টাইন!

ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী

গত শনিবার খবরে দেখলাম প্রখ্যাত আলেম যুবায়ের আহমদ আনসারী সাহেবের জানাজার নামাজে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নেমেছিলো।  মুসলিম হিসাবে আমরা ভালো করেই জানি জানাজার নামাজ ফরজ নয়, ফরজে কেফায়া।  অর্থাৎ সবাইকে অংশ গ্রহণ করতে হবে এরকম কোন ধরা বাধা নিয়ম নাই। জানাজার নামাজ একদিকে যেমনি রয়েছে ধর্মীয় বাধ্যবাদকতা আর অপরদিকে তেমনি রয়েছে আবেগের বহিঃপ্রকাশ। নিকট আত্মীয় কিংবা ভালোবাসার কোন প্রিয়জন মারা গেলে  কষ্ট করে হলেও তার শেষ বিদায়ের অনুষ্টানে অংশ নেয়া সবারই থাকে। সে ক্ষেত্রে আনসারী সাহেবে ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলিম সুতরাং উনার জানাজায় লক্ষ মানুষ অংশ নেয়া কোন অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।  প্রশ্ন হলো, জানাজাটি যখন অনুষ্টিত হয় তখন করোনা ভাইরাসের সক্রমণ ঠেকাতে সারা বাংলাদেশে মসজিদে নামাজের পরিসর ছোট করা হয়েছে, সরকারি অফিস আদালতে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এমনকি মানুষের জটলা বন্ধ করার জন্য পুলিশ এবং মিলিটারি তদারকি সার্বক্ষণিক করছে। শনিবার দেশ থেকে আমার এক বন্ধু ফোন করে বললো, সন্ধ্যা ৬ টার পর পুলিশ বাজারে লাটি চার্জ করে মানুষকে বাড়ি যেতে বাধ্য করছে। কি আশ্চর্য? সকল বাধা বিপত্তি ভয় শঙ্কা ফেলে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঐ জানাজায় অংশ নিয়েছে!  প্রশ্ন হলো এই অংশ নেয়া কতটুকু যৌক্তিক ছিল?

১৮ এপ্রিল, শনিবার অনুষ্ঠিত মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনসারীর জানাজা নামাজের দৃশ্য

ব্রিটেনে এই করোনা ভাইরাসের সময় সংক্রমণ ঠেকাতে জানাজার নামাজের পরিসর খুবই ছোট করা হয়েছে। গত সপ্তাহে আমার লোকাল ফিউনারেল সার্ভিস গার্ডেন অব পিস্ থেকে লেখা একটি চিঠি আমার পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। তারা খুব বিনয়ের সাথে সংক্রমণ ঠেকাতে সবাইকে অনুরোধ করেছে, জানাজার নামাজ ছুটো পরিসরে করার জন্য এবং তারা সর্বোচ্চ ৫ জন অংশ গ্রহণের জন্যে। ইস্ট লন্ডন মসজিদে সংক্রমণ ঠেকাতে জামাতে নামাজ বন্ধ ঘোষণার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় মৌলানা আব্দুল কাইয়ুম সাহেবের একটি ভিডিও মেসেজ আমি শুনেছি। তিনি খুব সুন্দর করে অনেক উদাহরণ টেনে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন এই মহামারীর সময় জটলা পাকিয়ে ফরজ কিংবা নফল ইবাদত করার প্রয়োজন নাই।  এতে হিতে বিপরীত হবে।  আমার এখনো মনে আছে তিনি বলেছেন, প্লেগের সময় যখন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছিলো তখন একটি রাষ্ট্রে সকল মুসলমান মিলে চিন্তা করলেন সবাই দোয়া করবেন।  লক্ষ লক্ষ মানুষের জামায়াতে দোয়া করার পরদিন থেকে সক্রমণ আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিলো এবং মৃতের হার দ্বিগুন হয়েছিলো।

সমস্ত বিশ্বে যখন সকল ধর্মীয় প্রতিষ্টান বিশেষ করে মসজিদ, যেখানে আমরা ফরজ নামাজ আদায় করি সেগুলো এখন বন্ধ। এমনকি সংক্রমনের ভয়ে পবিত্ৰ কাবা শরীফও বন্ধ করে রাখা হয়েছে সেখানে ফরজে কেফায়া নামাজ আদায় করার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল সত্যি অবাক করার বিষয়!  বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে এমনিতে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় বিশ্বের সকল পরাশক্তিগুলো যখন পর্যদুস্ত সেখানে বাংলাদেশের মোকাবেলা করার মতো ক্ষমতা নিয়ে পর্যালোচনা করার কোন অবকাশ নাই। বাংলাদেশে এমন অনেক জ্ঞানী ও গুণী (?) ব্যাক্তি আছেন যারা এখনো মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন করোনা ভাইরাস মুসলমানদের কোন রোগ নয় এবং এই রোগ হলো ইহুদি, ক্রিস্টান কিংবা নন মুসলিমদের।  আমি জানি না তারা এই কথাগুলো কোথায় পেলেন কিংবা কি ভাবে পেলেন? শুধু তারা বিশ্বাসই করেন না তারা প্রকাশ্যে মানুষদের এই জ্ঞান দিচ্ছেন। আমার মনে হয় এতো বিপুল সংখ্যক মানুষ এই জানাজার নামাজে অংশ গ্রহণ এই তথা কথিত জ্ঞানী ব্যক্তিদের বেফাঁস মন্তব্যের কারণে হয়েছে। অবস্থা দৃষ্টি মনে হচ্ছে করোনা বাংলাদেশের মানুষকে নয়, বরং দেশের মানুষই করোনাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।  জানিনা ভবিষ্যতে কি হবে? তবে বাংলাদেশ যদি সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখতে পারে তাহলে নির্ধিদায় কপালে দুঃখ আছে। ইন্ডিয়ার তবলীগ জামাতে অংশ নেয়াদের খবর আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি। জানিনা এই অনুষ্টানে অংশ গ্রহণকারীদের কি পরিণতি হবে।  আল্লাহ না করেন যদি এই জমায়েতের মধ্যে কোন করোনা ভাইরাসের রোগী থেকে থাকে তাহলে এক কঠিন ভয়ঙ্কর পরিণতি অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য। এমনিতেই জাতিসংঘ বলছে, করোনার কারণে বাংলাদেশে কম পক্ষে বিশ লক্ষ লোক মারা যাবার সম্ভবনা রয়েছে তার  উপর যদি সোশ্যাল ডিস্টেনসিং এরকম হয় তাহলে কি ফলাফল আসবে সবার ভেবে দেখার বিষয়। পরিশেষে সবার প্রতি অনুরোধ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন।  অপ্রয়োজনে বাহিরে যাবেন না। নিজে বাচুন এবং অন্যকে বাঁচার সুযোগ দেন। প্রার্থনা করি – প্রিয় বাংলাদেশ ভালো থাকুক, ভালো থাকুক আমার প্রিয় মানুষগুলো।

লেখক: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী

কলামিস্ট, কন্ট্রিবিউটর ব্রিট বাংলা২৪ কম এবং প্রিন্সিপাল সলিসিটার,কেসি সলিসিটার লন্ডন।

Advertisement