মার্কিন নির্বাচনের ভোট গণনা শুরু হয়েছে। জরিপ, পন্ডিতদের আগাম অনুমান এবং মিডিয়া যেভাবে ডেমোক্রেট প্রার্থী জো বাইডেনের সহজ বিজয়ের কথা বলে আসছিল – তা ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মোটামুটিভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বিল ক্লিনটনের একটি কথাই মনে পড়ছে আজ। তিনি একবার নিশ্চিত বিজয় জেনেও বলেছিলেন, ‘ইটস নট ওভার আন্টিল ইটস ওভার।’
মার্কিন ইতিহাসে এবারকার নির্বাচন সব চাইতে আইনী দেন-দরবারের মুখোমুখি একটি নির্বাচন! নির্বাচনের আগেই প্যান্ডেমিকের কারণে মেইল-ইন-ব্যালটের সাংবিধানিক নানা খুঁটিনাটি নিয়ে এরইমধ্যে শত শত মামলা ঠোকা হয়ে গিয়েছে।
মার্কিন ইতিহাস বলে, সাধারণত যে প্রার্থী ইলেকটরাল কলেজ ভোটে জেতেন তিনি পপুলার ভোটেও জেতেন। কিন্তু এর যে ব্যতিক্রম হয় না তা তো না। এ পর্যন্ত মার্কিন ইতিহাসে মোট পাঁচ জন পপুলার ভোটে হেরে গিয়েও প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। ১৮২৪ সালে এন্ড্রু জেকসন পপুলার ভোটে জিতেও প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। ১৮৭৬ সালে রাদারফোর্ড হেজ এবং ১৮৮৮ সালে ব্যন্জামিন হ্যারিসন – এরা দুজনেই পপুলার ভোটে হারার পরেও প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।
তারপর এক শতাব্দী পার হয়ে যায়।
১১২ বছর পর আল গোর পপুলার ভোটে জেতার পরও ২০০০ সালে আদালতের রায়ে জর্জ বুশ প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও কিন্তু ইলেকটরাল কলেজ ভোটে জিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন যদিও হিলারী ক্লিনটন, ট্রাম্পের চাইতে ২ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন বেশী পপুলার ভোট পেয়েছিলেন।
জরিপ অনুযায়ী এবং পন্ডিতদের বিশ্লেষণ আনুযায়ী যদি জো বাইডেন সত্যিই যথেষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে থাকতেন তাহলে আজ মার্কিন নির্বাচনী ইতিহাসটি অন্যরকম হতো। তবে প্রাথমিকভাবে এটুকু বলা যায় যে সারা বিশ্ব যতই টিভির পর্দায় চোখ সেঁটে  রাখুক না, কে হচ্ছেন পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট – তা সপ্তাহ গড়িয়ে গেলেও জানা যাবেনা।  
আমাদের স্মৃতিতে এখনো পরিস্কার – কিভাবে ২০০০ সালে গোটা বিশ্বকে নির্বাচনের পরে ৩৬ দিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম জানার জন্যে। পৃথিবী দেখেছে বিশ্ব মাতব্বর মার্কিন মুলুকে কিভাবে  অগণিত ব্যালট গার্বেজে পরিণত হয়েছিল শুধুমাত্র ব্যালটে পানচিং মেশিনে ফুটো করার পর লেগে থাকা ছোট্ট একটু কাগজের টুকরো তথাকথিত ‘hanging chad’ -এর দোহাই দিয়ে। বিশ্বকে বোঝানো হয়েছিল, কিভাবে ভোট করতে হয়  মার্কিনীরা তা জানে না।
২০০০ সালে ড্যামোক্র্যাটরা আদালতের কাছে আবেদন করেছিল নির্বাচনের সবগুলো ভোট যেন গোণা হয় কিন্তু রিপাবলিকানরা তাতে কারচুপির আশঙ্কা করেছিল। এদিকে সময় গড়িয়ে যাচ্ছিল, আর ‘Safe harbour deadline’-এর কারণে তা সম্ভব হয়নি এবং সুপ্রিম কোর্টের আদেশে সব ভোট গণনা থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার আগ মুহূর্তে জর্জ বুশকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। আজ ২০ বছর পর রিপাবলিকানদের মধ্যে সে-ই সুর শুনেছে পাচ্ছি।
বুশের বিরুদ্ধে আল গোরের সুপ্রীম কোর্টে হেরে যাওয়ার ক্ষত ড্যামোক্র্যাটদের এখনো শুকায়নি নিশ্চয়। ওদিকে ডনাল্ড ট্রাম্প বিচার বিভাগকে যেভাবে গুছিয়ে নিয়েছেন তা বলাই বাহুল্য। বারাক ওবামা তার দুই মেয়াদে যে ক’জন বিচারপতি নিয়োগ দিয়েছিলেন ডনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিগুণ বিচারপতি নিয়োগ দিয়েছেন তার প্রথম মেয়াদ শেষ হবার আগেই। বিশেষ করে মাত্র ক’দিন আগে সুপ্রীম কোর্টে এ্যমি ব্যরেটের নিয়োগকে ড্যামোক্র্যটরা রিপাবলিকানদের পক্ষে  মজুত রাখা আগাম ঢাল তলোয়ার হিসেবেই দেখছে।
তাহলে কি বিশ্ব আবারো দেখবে মার্কিন ভোটদাতাদের ভোট গুণতির মধ্যে না আনার দৃশ্য? এভাবে ভোটারদের ভোট গণনা না করার লেগেসি কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে ভূলুন্ঠিত করবে না?
লেখক : ডক্টর জাকি রিজওয়ানা আনোয়ার, মা ও শিশু বিশেজ্ঞ। চ্যানেল এসের সিনিয়র নিউজ প্রেজেন্টার এবং সিনিয়র কমিউনিটি এক্টিভিস্ট।
ডক্টর জাকি রিজওয়ানা আনোয়ারের অন্যান্য লেখার লিঙ্ক নিচে।
Advertisement