মিউনিখ সম্মেলন এখনো প্রাসঙ্গিক

সরাফ আহমেদ :: পঞ্চাশের দশকে ঠান্ডা যুদ্ধ বা স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। তখন পৃথিবী ছিল দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক শিবির, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী শিবিরের দেশগুলো। এই দুই শিবিরেই গঠিত হয়েছিল দুটি সামরিক জোট। একটি নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো), অন্যটি ওয়ারশ জোট। পুরো স্নায়ুযুদ্ধের কালজুড়ে মধ্য ইউরোপের উভয় পক্ষের দেশগুলো পরস্পরের দিকে তাক করে রেখেছিল পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।

১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিলোপ ঘটলে সেই আদর্শিক স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে; এরই একটি বড় অনুষঙ্গ হিসেবে ১৯৮৯ সালের নভেম্বরে বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়। অবশ্য স্নায়ুযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসানের আগেই জার্মানির রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী সমাজ শান্তি ও নিরাপত্তার পক্ষে নানা উদ্যোগ নিতে শুরু করে। এমনকি তীব্র স্নায়ুযুদ্ধের কালেও ১৯৬৩ সালে রাজনীতিক, গবেষক ও নাগরিক সমাজকে নিয়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের উদ্যোগ শুরু হয়। তবে প্রথম এক দশক সে সম্মেলন ব্যাপক আন্তর্জাতিক সাড়া জাগাতে পারেনি; শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোই এতে অংশ নিত।

স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের প্রধান দুই উদ্যোক্তা এভাল্ড ভন ক্লাইস্ট ও হোর্স্ট টেল্টশিক এই সম্মেলনকে বিশ্বজনীন রূপ দেওয়ার প্রয়াসে নতুন রূপরেখা তৈরি করেন। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে ইউরোপের বাইরের বিভিন্ন দেশ এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারপর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কেরা মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নিয়ে পারস্পরিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক ও সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছেন। এখন ব্রাজিল, ভারত ও বাংলাদেশের মতো অনেক দেশ এই সম্মেলনে যোগ দিচ্ছে। এবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সম্মেলনে যোগ দিতে বার্লিন এসে পৌঁছেছেন।

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন একটি উন্মুক্ত ফোরাম, যেখানে নানা দেশের প্রতিনিধিরা দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় নানা বিষয়ে মতবিনিময় ও আলোচনা করেন। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। রাষ্ট্রনেতা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছাড়াও এ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বাণিজ্য ও অর্থনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এবারের সম্মেলনটি ৫৫তম। ১৫ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এটি চলবে, এতে অংশ নিচ্ছেন বিশ্বের ৪০টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, ১০০ জন মন্ত্রীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি। এ সম্মেলনের সভাপতি ভলফগ্যাং ইসিঙ্গার বলেন, ‘সংলাপের মাধ্যমে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার যে প্রয়াস আমরা দীর্ঘদিন আগে শুরু করেছিলাম, তার প্রয়োজন এখনো শেষ হয়ে যায়নি।’

অতি সম্প্রতি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র বিরোধে জড়িয়েছে, তারা মাঝারি পাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র আবার মোতায়েন করেছে, যাতে আগের কিছু আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চুক্তির লঙ্ঘন ঘটেছে। লঙ্ঘন ঘটেছে উভয় দেশের দ্বারাই। ফলে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের গুরুত্ব নতুন করে বেড়েছে। ভলফগ্যাং ইসিঙ্গার দীর্ঘ সময় লন্ডন ও ওয়াশিংটনে জার্মান রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি তাঁর বই ওয়ার্ল্ড ইন ডেনজার–এ লিখেছেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর এখন আবার দুই পরাশক্তির মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এই উত্তেজনা প্রশমনের জন্য জার্মানিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। মিউনিখ সম্মেলন শুরুর দিন মিউনিখ শহরে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে নিয়ে বিশ্বায়নবিরোধী একটি জোট বিক্ষোভ করেছে। তারা বিশ্বজুড়ে সম্পদের অসম বণ্টন ও শোষণের বিরুদ্ধে; যুদ্ধের বিপরীতে শান্তির পক্ষে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে এলেন এই মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন উপলক্ষে। এই সম্মেলনের ফাঁকে তিনি জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল, অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর সেবাস্টিয়ান ক্রুজ, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাতাহ আল-সিসি, নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী এমা সোলবার্গ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি ফেদরিকা মোঘেরিনি, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন বলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানানো হয়েছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় ও সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি একটি প্রীতিকর ফোরাম।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি এবং তথাকথিত আদর্শিক স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পরও বিশ্বজুড়ে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার নতুন করে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার প্রশ্নটি আবার বড় হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি দেশে দেশে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, প্রাকৃতিক পরিবেশ, মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে সম্মিলিতভাবে চিন্তাভাবনা ও মতামত তুলে ধরা, প্রস্তাব পেশ ও গ্রহণ করা এবং সেগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে পৃথিবীকে আরও নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ করার ক্ষেত্রে মিউনিখ সম্মেলনের প্রাসঙ্গিকতা অবশ্যই তর্কাতীত বিষয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Advertisement