সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে বিদেশি পণ্য বিক্রির মহোৎসব

মিসবাহ উদ্দীন আহমদ

ব্রিটেনের কাছে সিলেটের যেমন আলাদা কদর। তেমনি সিলেটের মানুষের কাছে বিলেতি পণ্যের কদরও আলাদা। ব্রিটেনে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিরা যখন দেশে আসেন, তারা সেখানকার নিত্য ব্যবহার্য প্রসাধনী সামগ্রী নিয়ে আসেন দেশে থাকা স্বজনদের জন্যে। আর সাম্প্রতিক সময়ে কার্গো ব্যবহার করেও আনা হচ্ছে এসব প্রসাধনী। এ তালিকাতে আছে তরুণীদের জন্য পারফিউম, লিপস্টিক, নেইলপলিস, সাবান, শ্যাম্পু, ফেইসওয়াস, ক্রিম, জেল, লোশনসহ রূপসজ্জার নানারকম সামগ্রী।

ব্যক্তিগত ব্যবহারের কথা বলে ব্রিটেনসহ অন্যান্য দেশে থাকা প্রবাসীদের সাহায্যে দেশে আনানো হচ্ছে রূপচর্চার এসব সামগ্রী। পরে এগুলো চলে যাচ্ছে নগরীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনলাইনকেন্দ্রিক অন্তত একডজন দোকানে। ব্যক্তিগত ব্যবহারের নামে দেশে আনা এসব সামগ্রী ওইসব দোকানওয়ালারা বিক্রি করছেন ছড়া দামে। আর এতে করে সিলেটের মানুষ ন্যায্যমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মূল্য দিয়ে কিনছেন এসব পণ্য। কার্গোর মাধ্যমে আসা এসব পণ্য ‘অরিজিনাল’ হওয়াতে সিলেটের ক্রেতাদের কাছে চাহিদাও বেশি। আর এ কারণেই সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে দ্বিতীয় লন্ডন খ্যাত সিলেটে বেড়ে চলেছে অনলাইনভিত্তিক এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

আইনগতভাবে এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কার্গো ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ব্যবহারের কথা বলে, ব্যক্তিগত ঠিকানায় এভাবে নিত্য ব্যবহার্য প্রসাধনী সামগ্রী নিয়ে এসে; ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিক্রয় করার কোন নিয়ম নেই। দেশে-বিদেশি পণ্য বিক্রয় করতে হলে আমদানি/রপ্তানি নীতিমালা মানতে হয়। কিন্তু সিলেটে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো মানছে না সরকারি নিয়মনীতি। তাদের নেই কোন বৈধ অনুমোদনও। শুধুমাত্র সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে তারা দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে বিদেশি পণ্য বিক্রির মহোৎসব।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে নগরের প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজার, নয়াসড়ক, শাহজালাল উপশহর, দরগা মহল্লাসহ বেশ কিছু এলাকায় এমন কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা ব্যক্তিগত ব্যবহারের কথা বলে আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে এসব নিত্য প্রয়োজনীয় প্রসাধনী সামগ্রী দেশে নিয়ে আসে। পরে এগুলো তাদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরাসরি বিক্রয় করে। তারা মূলত নিজেদের প্রতিষ্ঠানের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের পেজ দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে থাকে। প্রসাধনী সামগ্রীর বর্ণনা, উপকারিতা দিয়ে তারা পেজ থেকে ‘লাইভ অনুষ্ঠান’ও প্রচার করছে। পাশাপাশি পেজগুলোতে তারা প্রকাশ্যেই ক্রেতাদের জানাচ্ছে কার্গোর মাধ্যমে বিদেশ থেকে আনা মালামালের আপডেট তথ্যাদি।

এরকম কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে নগরীর নয়াসড়কের স্টুডিও লন্ডন বিডি, জিন্দাবাজারের মিলেনিয়াম শপিং সেন্টারের ১৩ নম্বর দোকান ইউকে এক্সপ্রেস, একই শপিং সেন্টারের প্রথম তলার ৪ নম্বর দোকান ফরেইন প্রোডাক্টস অনলাইন বিডি। আরোও রয়েছে রেড সিলেট অনলাইন শপ, অনলাইন সিলেট ইউকে বাজার শপ, নগরের দরগামহল্লার ইউকে সিক্সটিনাইনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

মঙ্গলবার এরকম কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের সাথে যোগাযোগ করা হয় একাত্তরের কথা’র পক্ষ থেকে। তখন তারা নিজেরাও স্বীকার করেন আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের মাধ্যমে এসব প্রসাধনী সামগ্রী সংগ্রহ করেন। কার্গো সার্ভিসের মাধ্যমে এসব মালামাল বাংলাদেশে পৌঁছে। পরে ওগুলোতে নিজেদের মতো ট্যাগ লাগিয়ে শোরুমে বা দোকানে বিক্রি করা হয়। তারা নিজেদেরকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দাবি করে বলেন সিলেটে এসব প্রতিষ্ঠানের বেশ চাহিদা থাকায় তারা এসব পণ্য আনিয়ে বিক্রি করেন। নিজেদের ট্রেড লাইসেন্সও আছে। তবে বেশিরভাগই জানালেন টিআইএন সার্টিফিকেট, আমদানি/রপ্তানির কাগজ কিংবা অন্যান্য আনুষাঙ্গিক অনুমোদন নেই। এভাবেই তারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। কোন বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি তাদেরকে।

নয়াসড়কের স্টুডিও লন্ডন বিডি নামক প্রতিষ্ঠানে ফোন দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারিকে প্রথমে পাওয়া যায়নি। ঘন্টাখানেক পরে আহমেদ বকুল নামে জনৈক ব্যক্তি ফোন দিয়ে জানান প্রতিষ্ঠানটি তার বোনের। তিনি বলেন, ‘এসব বিদেশী পণ্য আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমেই স্টুডিও লন্ডন বিডির জন্য সংগ্রহ করা হয়, কার্গোর মাধ্যমে নিয়ে আসা হয়। পরে শোরুমে রেখে বিক্রি করা হয়।’ বিষয়টি আইনত অবৈধ বলে তাকে জানালে তিনি বলেন- ‘দেশের কতো বড় বড় ক্ষেত্রে আইনলঙ্ঘন হচ্ছে। আপনারা এসব না দেখে কেনো আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়িকে দেখছেন।

সিলেট মিলেনিয়াম শপিং সেন্টারের ফরেইন প্রোডাক্টস অনলাইন বিডি প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারি তাহমিনা সুলতানা একাত্তরের কথা’কে বলেন, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের মাধ্যমে আমরা এসব পণ্যসামগ্রী সংগ্রহ করি। নিয়ম মেনেই সামগ্রীগুলো সংগ্রহ করা হয়। কার্গোর মাধ্যমে দেশে নিয়ে আসা হয়। যথাযথ নিয়ম বলতে তিনি উল্লেখ করেন, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য এসব সামগ্রী সিলেটে আনা হয়।

‘ব্যক্তিগত ব্যবহারের কথা বলে’ আনা প্রসাধনী সামগ্রী দোকানের মাধ্যমে বিক্রয় করা আইনে নিয়ম নেই; বিষয়টি তাকে জানালে তিনি বলেন, ‘এমন বিষয় আমরা অবগত নই। আমাদের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। অন্যান্য কাগজের বিষয়ে আমরা আবেদনও করেছি।’

এদিকে সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকজন ক্রেতার অভিযোগ, ‘বিদেশী পণ্য বিক্রয়কারী এসব প্রতিষ্ঠানে মূল দামের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি দামে পণ্য বিক্রয় করা হচ্ছে। ইংল্যান্ডের একটি লিপস্টিক যদি ১ পাউন্ড দিয়ে কেনা হয় তবে সেটি এখানে এনে বিক্রি করা হচ্ছে ৬শ থেকে ৮শ টাকায়। হিসেব করে দেখা গেছে একজন ক্রেতা যদি ২ লাখ টাকার মালামাল ক্রয় করেন তবে প্রতিষ্ঠানের পকেটে মুনাফা যাচ্ছে প্রায় লাখ টাকার উপরে। যা রীতিমতো অবাক করার মতোই।

ক্রেতারা জানিয়েছেন, এসব প্রতিষ্ঠান নগরীর দু’টি হোটেলে কয়েকমাস পরপর মেলারও আয়োজন করে। নগরীর দরগাগেইটস্থ হোটেল নূরজাহান গ্রান্ডে এবং জেলরোডের পানসি ইনে। এসব মেলার মাধ্যমে তারা মূলত নিজেদের সাথে ধনাঢ্য ও উচ্চ মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা করে প্রতিষ্ঠানগুলো চালাচ্ছে নিজেদের ব্যবসা। অনেক প্রতিষ্ঠান শোরুম ছাড়াই বাসা-বাড়ি থেকে ব্যবসা চালাচ্ছে। ফেসবুক পেজে ফোনের মাধ্যমে পণ্যের অর্ডার নিয়ে তারা কুরিয়ারের মাধ্যমে কিংবা সরাসরি পৌঁছে দিচ্ছে ক্রেতাদের কাছে।

সাধারণ নিয়মানুসারে এরকম বিদেশী পণ্য বাংলাদেশে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিক্রির জন্য টিআইএন, ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট সার্টিফিকেট, এক্সপোর্ট/ইমপোর্ট লাইসেন্সের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু সিলেট নগরের প্রতিষ্ঠানগুলো শুধুমাত্র সিটি কর্পোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স দিয়েই চালাচ্ছে এরকম প্রতিষ্ঠান।

এ ব্যাপারে কাস্টমস, এক্সাইজ এন্ড ভ্যাট কমিশনারেট সিলেট আঞ্চলিক কার্যালয়ের কমিশনার গোলাম মুনীরকে কল দেওয়া হলে তিনি বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিবেন। প্রয়োজনে সরাসরি অফিসে গিয়ে এ ব্যাপারে কথা বলার অনুরোধ করেন এই কমিশনার।

এদিকে সিলেট জেলা প্রশাসনের একাধিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ব্যক্তিগত ব্যবহারের কথা বলে কেউ যদি বিদেশী পণ্য এনে বিক্রি করেন তবে সেটি আইনত ঠিক নয়। বিদেশী পণ্য বিক্রয়ে নিয়মনীতি রয়েছে। কোন প্রতিষ্ঠানে সেটি লঙ্ঘন হলে এবং প্রশাসনে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আইনত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Advertisement