হাসান মাসুমের গল্প : ত্রুটিবিহীন রুটি বানানোর প্রক্রিয়া

বিথী থাকত শামসুন্নাহার হলে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে বি.এ. শেষ করার আগেই বিয়ের পিড়িতে বসতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি সে তার পছন্দের পাত্র সুমনের সাথে। তিন বছরের প্রনয় পরিনয়ে পরিনত হয়েছে বিথীর জিদের কারনেই। পড়াশুনা আর ভাল লাগছিল না তার। লাগবে কি করে, ঘুম থেকে উঠতেই সুমনের ঘোরে ঘোরাক্রান্ত হয়ে না হচ্ছিল পড়াশুনা, না হচ্ছিল ক্লাসে লেকচার শোনা। উপড়ন্ত, ক্লাস টেস্টে একদিন এমন এক বিচ্ছিরি কান্ড হল যে আর ঐ শিক্ষকের ক্লাসে ঢোকা তো দুরের কথা, ঐ শিক্ষকের রুমের বাইরের করিডোরে মাথা ঢোকানের কথা কল্পনাতেও আনা সম্ভব ছিল না। ব্যাপারটা এরকম, পরীক্ষায় সমনজারি বিষয়ক প্রশ্নে বিথী প্রতিপদে খাতায় এতবার সুমনজারি করেছে যে, শিক্ষক পারলে তখনি সুমনকে সমনজারি করে হাজির করেন। সে যাত্রা পালিয়ে শিক্ষকের হাত থেকে রক্ষা পেলেও সহপাঠিদের হাত থেকে বেঁচে থাকা দায় হয়ে দাঁড়াল। গোদের উপড় বিঁষ ফোড়ার মত যখন তখন যাকে তাকে সুমন ভাবা রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটায় সুমনের মাঝে নিজেকে জড়িয়ে নেয়ার এরচেয়ে উত্তম পথ আর পাওয়া গেল না। অচিরেই বিয়ে হয়ে গেল দুজনের । এ এক কঠিন প্রেম !
সুমন তখন ঢাকায় একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকুরি করছে। যদিও বিয়ের আগে মেসে থাকত, কিন্তু বিয়ের তারিখ ঠিক করার আগেই ভাড়ায় বাড়ি ঠিক করতে হল তাকে। সুমনের বাবা-মা দেশের বাড়িতে থাকতেন। সুমন ঠিক করলো, তাদের ঢাকায় নিয়ে আসবে। তবে, বুদ্ধিমানের মত বিথীর মতামত যাচাই করে নিল আগেই। সুমন জানে, আগে থেকে কথাবার্তা বলে সিদ্ধান্ত নিলে সেখানে জোড়াজুড়ির কিছু যেমন থাকে না, উপড়ন্তু সমঝোতা হয় তেমনই সুন্দর। বিথী মূলত আবেগপ্রবন একটি সাধারন বাঙালী পরিবারের মেয়ে, শ্বশুড়-শ্বাশুড়ি নিয়ে সংসার করা তার অপছন্দের বিষয় হতে পারে না। তবে একমাত্র মেয়ে হওয়ার কারনে একটু আহলাদী আর কি ! ঘটা করেই বিয়ে হল তাদের। দেখতে দেখতে ছ’মাস কেটে গেল সময়ের স্রোতে ভেসে ভেসে। বিয়ের পরেই সই, শ্বশুড়ের উৎসাহে বি.এ. পরীক্ষাটা দিয়েই ফেললো বিথী। রেজাল্টও ভাল করলো।
বিথী বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের কন্যা হিসেবে ঘরের কাজ-কর্ম করার সুযোগ পায়নি খুব একটা। বিশেষ করে, রান্না-বান্নার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক পারদর্শী (!) সে। সবচেয়ে ভাল পারে সে, চা বানাতে আর ডিম ভাজতে। পোঁচও করতে পারে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডিমের আকৃতির পরিবর্তনের কারনে সেটিকে পোঁচের চেয়ে অন্য কিছু বলাই ভাল হয় তখন। ডিম উল্টাতে গিয়ে ছ্যাড়াব্যাড়া করে ফেলে সে। বৌয়ের কির্তী দেখে শ্বাশুড়ি তখন হাসেন। আর দশটা শ্বাশুড়ির মত অবশ্য দোষ খুজে বেড়ান না তিনি। মাঝে মাঝে এমন হয় যে, বিথীর ঐ ডিম ছ্যাড়াব্যাড়া করার দৃশ্য দেখার জন্যই নিজের জন্য ডিম পোঁচ করতে বলেন তিনি। ডাক্তারের নিষেধের কারনে ঐ ডিম খান না পর্যন্ত। কিন্তু বৌমার রান্নার ঐ দৃশ্য তাঁকে লক্ষ টাকার সুখ দেয়। লোকে ভাববে ব্যঙ্গ করার সুখ পান তিনি। তা নয়। এ এক অন্যরকম ভালবাসার সুখ। বিথীর এই রান্নার ঐ পারদর্শিতার কথা বৌ-শ্বাশুড়ি ছাড়া অন্য কেউ কিন্তু জানে না পর্যন্ত। বিথীর ইচ্ছা ছিল, শ্বাশুড়ির কাছ থেকে রন্ধন প্রনালীর উপড় থিসিস করবে। যা চমৎকার রান্না জানেন তিনি। কিন্তু নতুন বৌ করতে করতে শ্বাশুড়ির ছয় মাস কাটাতে না কাটাতেই পরীক্ষার কর্মসূচি হাতে নিতে হল। রন্ধন শিক্ষা কার্যক্রম পিছিয়ে গেল আরো দেড় মাস।
কপালের নাম গোপাল, পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই শ্বাশুড়িকে ছুটতে হল গ্রামের বাড়িতে ছোট ছেলের অসুস্থতার খবর পেয়ে। স্বামীকে রেখে গেলেন ঢাকায়, বৌমা একা থাকবে দেখে। বৌমাকে বুঝিয়ে গেলেন, শ্বশুড়ের জন্য কিভাবে রুটি বানাতে হবে। ভাত রান্না করার জন্য তো আর বিভিন্ন রেসিপির অনুষ্ঠান দেখতে হয় না। শুধু সাথে তিন/চার রকমের তরকারী রান্না করে ফ্রিজে তুলে রেখে গেলেন। প্রয়োজনে সেগুলো বের করে ওভেনে গরম করে নিলেই হবে। তারপরেও বিথীর কপাল চাপড়ানো ছাড়া কিছুই করার নেই। তার শ্বশুড় মাটির মত মানুষ। বিথীকে যে কি পরিমান ভালবাসেন, তা না দেখলে বোঝার উপায় নেই। লোকে বলবে, কোন মেয়ে নেই দেখে বৌমাকে এত আদর! কিন্তু বিথীর ধারনা, উনার মত মানুষ দশটি মেয়ের বাবা হলেও বিথীকে এতটাই ভালবাসতেন। সেই মানুষটি নরম পাতলা ময়দার রুটি ছাড়া খেতে পারেন না। আর বিথী নরম রুটি তো দুরের কথা, দূর থেকে দেখে রুটি বলে মনে হতে পারে, এমন বস্তুও বানাতে পারবে কিনা সন্দেহ!
শ্বাশুড়ি দেশে যাবার দিনটা তো কোনমতে পার হল। কিন্তু পরদিন সকালে শ্বশুড়ের জন্য নরম রুটি বানানোর চিন্তায় ভালমত ঘুমই হল না তার। একবার স্বপ্ন দেখল যে তার শ্বশুড় বিথীর বানানো ইটের মত শক্ত রুটি দিয়ে তার মাথা ভেঙে ফেলছেন আর একবার দেখল ওর মাথা দিয়ে শক্ত রুটি ভাঙছেন। দুইবারই ঘুম ভেঙে গেল তার। প্রতিবারে দুই গ্লাস করে পানি খেয়েও তৃষ্ণা মিটলো না, বরং মাত্রাতিরিক্ত পানি পানের কারনে রাতের বেলা গভীর ঘুমের মাঝেও আরো দুইবার বিছানা ত্যাগ করতে হল তাকে।
যাক, ভোর ছয়টায় কোনমতে ঘুমু ঘুমু চোখে রান্নাঘরে হাজির হল বিথী। ছোট একটা গামলায় ময়দা নিয়ে রুটি বানানোর যুদ্ধে অবতীর্ন হল সে। প্রথম দফায় পানির পরিমান বেশি পড়ায় প্যাঁচপ্যাঁচে কাদার রূপ ধারন করল সেটি। বেশ কয়েকবারের চেষ্টায় কোনভাবেই সেটি নিয়ন্ত্রনে তো এলোই না উল্টো দুই/তিনবার হাত পিছলে মাটিতে গড়াগড়ি খেল, তখন রাগে ময়দার পুরো দলাটাকে আবর্জনাগারে নিক্ষেপ করলো এতটা নিখুত নিশানায়, যে রবিন হুডও মনে হয় এত নিখুত নিশানায় তীর নিক্ষেপ করতে পারত না। দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় অল্প অল্প পানি ঢেলে ঢেলে ময়দা মাখতে মাখতে এক পর্যায়ে ওর হাতের আঙুলগুলো এমনভাবে আকড়ে থাকলো যে এ জীবনে সেগুলো আর সোজা হবে এমনটা মনে হল না। বহু কষ্টে ময়দার একটা গোলা তৈরি হল। কিন্তু বিথীর মনে ভরসা হল না, সেই ময়দার গোলা থেকে নরম রুটি বের হতে পারে, বরং সেই গোলা ছুড়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ (!) জয়ের সম্ভাবনা থাকলেও থাকতে পারে। বহুকষ্টে ময়দার গোলা তো বানানো হল, কিন্তু সেই গোলা থেকে গোল গোল রুটি বানানো তো তখনো বাকি ! পিড়ি বেলন দিয়ে গোল রুটি বেলার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখা দিল আরেক সমস্যা। বেলন দিয়ে যেদিক দিয়ে যেভাবেই বেলে না কেন, রুটি তো গোল হয় না। অথচ, শ্বাশুড়ির হাতে পড়লে শয়তান ময়দাগুলো নিজে থেকেই যেন সুন্দর গোল হয়ে বেলে যায়! রুটি গোল করা যায় কিভাবে চিন্তা করতে করতে মাথায় দারুন এক আইডিয়া এল। বিথী চট জলদি খুঁজতে শুরু করলো বোয়ামের গোল ঢাকনি বা এই জাতীয় কিছু, যা দিয়ে বেলানো রুটির মাঝখান থেকে গোল করে কেটে নেয়া যায়। হাতের কাছে যেগুলো পেল, সেগুলো দিয়ে কাটলে বস্তুটাকে রুটি নয়, পুরির আকার ধারন করবে। কি মুসকিল, রুটির আকারের ঢাকনি কোথায় পায় ? শেষে পাওয়া গেল, গোল প্লাস্টিক বক্সের একটা ঢাকনি। সেটি দিয়ে চমৎকার সাইজের দুটি গোল রুটি বের করা সম্ভব হল। শ্বশুড় মশায় খেতে বসে রুটির আকার দেখে যতটা না চমৎকৃত হলেন, তার থেকে অনেক বেশি কষ্ট পেলেন রুটিটা দাত দিয়ে কামড়ে ছিড়ে চিবিয়ে খেতে। কিন্তু মুখে কিছু বললেন না, বুঝতেও দিলেন না কিছুই। প্রতিদিনের মত একইরকম ভাবে খেয়ে বৌমার সাথে হেসে কথা বলতে বলতে ভিতরের রুমে চলে গেলেন। বিথীর বোঝার উপায় রইল না, রুটি দুটো কি রুটি হয়েছে, না অন্য কিছু। সুমনকে নিয়ে সমস্যা হল না। দুই পিস পাউরুটির সাথে ডিম ভাজি দিয়ে ওকে পার করা গেছে।
ছয়দিন পরের কথা। শ্বাশুড়ি ফিরে এসে বৌমাকে উদ্ধার করলেন। বিথীর রুটি বানানোর প্রক্রিয়ার গল্প শুনলেন তার কাছে। এতটা মজা পেলেন তিনি, যেন বান্ধবীর কাছে কোন মজার কৌতুক শুনলেন। আরো অনেক বেশি ভালবেসে ফেললেন মেয়েটাকে। স্ত্রীকে দেখে বিথীর শ্বশুড় স্বস্থির যে নি:শ্বাস ফেললেন, তা কেউই বুঝতে পারলো না। কিন্তু, সেখানে অভিযোগের কোন চিহ্নই ছিল না। কোন বাবাই তার মেয়ের হাতের রান্নায় অমৃতের স্বাদ না পেয়ে থাকতে পারেন না।

Advertisement