ইউকে ফ্যামিলি ভিসা এবং থার্ড পার্টি সাপোর্ট, যা জানা খুবই জরুরি

:ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী:

বিগত জুলাই ২০১২ সালে ইউকে হোম অফিস ফ্যামিলি ভিসায় নতুন নীতিমালা প্রকাশ করে। যেখানে স্বামী অথবা স্ত্রী নিয়ে আসার ক্ষেত্রে মিনিমাম ইনকাম রিকোয়ারমেন্ট £১৮৬০০ পাউন্ড জুড়ে দেয়া হয়, সেই সাথে বাচ্চাদের বেলায় প্রথম বাচ্চা £৩৮০০ এবং পরবর্তী বাচ্চাদের বেলায় £২৪০০ নির্ধারণ করা হয়। শুরু থেকেই আইনটি নিয়ে বেশ বিতর্ক ছিলো। কারণ আইনে কোন প্রকার ফাঁকফোকর ছিল না। অর্থাৎ বিষয়টি এরকম ইনকাম নাই সুতরাং ভিসা ও নাই।

যদি ও আইনে কিছুটা ব্যতয় ছিল শারীরিক এবং মানসিক ভাবে কাজে অক্ষম ব্যক্তিদের এবং কেয়ারার বা পরিচর্যার জন্য যারা বেনিফিট পান শুধু মাত্ৰ তাদের বেলায়।

আইনটি ইমিগ্র্যান্ট কমিউনিটির মধ্যে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতে চলে আসে এই আইন। সুতরাং একেবারে মরার উপর খোড়ার ঘা। তবে আইনতো আইন।
ইংল্যান্ডের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আইনটিকে চ্যালেঞ্জ করে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় হাইকোর্টে, কিন্তু হাইকোর্ট রায় দিলেন হোম অফিসের সিদ্ধান্ত সঠিক।

পরবর্তীতে বিষয়টি চলে যায় সুপ্রিম কোর্টে। কমিউনিটির অনেকের ধারণা ছিলো, হয়তো সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টিকে অন্যায় বলে আখ্যায়িত করতে পারেন। দীর্ঘ দিন পর এবছর ফেব্রুয়ারী মাসে সুপ্রিম কোর্ট থেকে ও রায় আসে আইনটি বৈধ। অর্থাৎ হোম অফিসের এই বেঁধে দিয়া ইনকাম যৌক্তিক। তবে কোর্ট আইনের কিছু দোষ থ্রুটি তোলে ধরেন। বিস্তারিত রায় MM and others v Secretary of State for the Home Department [2017] UKSC 10. সুপ্রিম কোর্টের রায়টি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, কোর্ট মনে করেন নির্ধারিত এবং বেঁধে দেয়া ইনকামের মধ্যে কিছু ব্যতিক্রম বা এক্সেপশন থাকা উচিত ছিলো যেখানে ইনকাম নাই অথবা ইনকাম বেঁধে দেয়া নিয়ম থেকে কম তথাপি আবেদন প্রত্যাখ্যান করা সঠিক হবে না, কারণ আবেদনের সাথে ১৮ বছরের নিচে কোন বাচ্চা আছে এবং আবেদন প্রথ্যখান করলে সে সরাসরি প্রভাবিত বা এফেক্টেড হবে।

অথবা আবদেন করি এমন কিছু বিষয় আবেদনের সাথে উত্থাপন করেছেন যেখানে আবেদন প্রত্যাখান করা অমানবিক হবে। সেই সাথে কোর্ট আরো মনে করেন যে, থার্ড পার্টি স্পনসর বা তৃতীয় পক্ষের কোন সাপোর্ট বা সমর্থনের সুযোগ রাখা উচিত ছিল, যেখানে স্পনসর পুরোপুরি অথবা আংশিক ভাবে ইনকাম দেখতে ব্যর্থ অথচ আবেদন প্রথ্যখান করা হবে অমানবিক।
কোর্টের রায় আইনে পরিণত করা বাধ্যতা মূলক তবে নিয়ম অনুযায়ী কোর্টের আলোকে আইন কার্য্যকর করতে হোম অফিস কিছু সময় পান, নতুন ভাবে আইনটি তৈরী করতে এবং বাস্তবে প্রয়োগ করতে।

যাই হোক বহুল প্রতীক্ষিত এই আইন অবশেষে হোম অফিস সংশোধিত আকারে গত ২১ জুলাই ২০১৭ প্রকাশ করেন। এখন দেখা যাক এই পরিবর্তিত আইনে কি কি জিনিস সংযোজন করা হয়েছে এবং এই পরিবর্তিত আইনে আবেদনকারী কি ভাবে সুফল পেতে পারেন।
তৃতীয় পক্ষের সাপোর্ট (Third Party Support) কখন নেয়া যাবে:
হোম অফিস সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে নতুন ফেমিলি মাইগ্রেশন রুটে নতুন ধারা সংযোজন করেছে যা Paragraph 21A of Appendix FM-SE নামে পরিচিত। সেই সাথে নতুন ধারা GEN 3.1, GEN 3.2 এবং GEN 3.3 ও সংযোজিত হয়েছে। উপরোক্ত ধারা গুলোর সারসংক্ষেপ হলো – যে কোন আবেদন রিফুজ বা প্রত্যাখ্যান করার সময় ভিসা অফিয়ারকে অবশ্যই মানবিক ভাবে স্বামী-স্ত্রী অথবা দম্পতির ১৮ বছরের নিচে কোন ব্রিটিশ ছেলে-মেয়ে থাকলে তাদের ওয়েলফেয়ার অথবা কল্যাণের বিষয় বিবেচনা এবং নিশ্চিত করতে হবে। ভিসা অফিসারকে এই মর্মে নিশ্চিত হতে হবে যে, রিফুজল বা প্রত্যাখ্যান কোন ভাবে অনুপযুক্ত, কঠোর বা অন্যায় হিসাবে বিবেচিত হবে না।এই মানবিক বিবেচনার ক্ষেত্রে যদি তৃতীয় কোন পক্ষের সাপোর্ট থাকে সেটা বিবেচনায় নিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ উপরোক্ত অবস্থায় ভিসা অফিসারকে অবশ্যই বিকল্প হিসাবে তৃতীয় পক্ষের স্পনসর বা সাপোর্ট বিবেচনা করতে হবে। কোন কোন অবস্থায় বিকল্প হিসাবে তৃতীয় পক্ষের সাপোর্ট নেয়া যাবে তার বিস্তারিত বিবরণ GEN 3.1, GEN 3.2 এবং GEN 3.3 দেয়া হয়েছে।
কোন কোন ক্ষেত্রে থার্ডপার্টি সাপোর্ট নেয়া যেতে পারে:
যদিও আইনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট করে কোন ব্যখ্যা নাই তবে বিষয়টি নির্ভর করবে ব্যক্তিগত অবস্থার উপর। প্রচলিত আইনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমার অভিমত হলো নিম্ন লিখিত ক্ষেত্রে থার্ডপার্টি সাপোর্ট নেয়া যেতে পারে:
১. যদি স্পনসর শারীরিক বা মানসিক কারণে কাজ করতে অক্ষম অথচ তিনি FM মাইগ্রেশন রুটের ইনকাম থেকে Exemted নন। যেমন উনি সিক বা অসুস্থতার বেনিফিট নিচ্ছেন।
২. তিনি ফুল টাইম কাজ অথবা নির্ধারিত ইনকাম করতে পারেননা কারণ তার কিছু সীমাবদ্বতা রয়েছে যা বিবেচনা যোগ্য।
৩. স্পন্সরের ১৮ বছরের বয়সী ছেলে-মেয়ে রয়েছে এবং তারা ব্রিটিশ নাগরিক। স্পনসর নিয়মিত তাদের দেখাশুনা করেন।
৪. এমন কোন বিষয় আছে যা বিবেচনা যোগ্য এবং না করলে অমানবিক বা সিদ্ধান্ত কঠোর বলে বীৰেচিত হবে।
উপরের উদাহরণ থেকে স্পষ্ট ঢালাও ভাবে থার্ডপার্টি সাপোর্ট নেয়া যাবে না এবং নিলে সেটা গণ্য ও হবে না। থার্ডপার্টি সাপোর্ট নেয়ার আগে আপনাকে ভালো করে দেখে নিতে হবে আপনার ইনকাম না করার কারণ কি এবং সেটা মানবিক ভাবে বিবেচনার দাবি রাখে কিনা।
থার্ডপার্টির যোগ্যতা:
থার্ডপার্টি যিনি হবেন তাকে অবশ্যই দেখতে হবে উনি সত্যিকার অর্থে সাপোর্ট করতে পারবেন অর্থাৎ আর্থিক ভাবে সাপোর্ট করার মতো তার যোগ্যতা রয়েছে। আইনের মধ্যে এ পর্যন্তই। তবে বাস্তবিক অর্থে এর অর্থ অনেক। যিনি সাপোর্ট করবেন তাকে অবশ্যই আর্থিক ভাবে স্বাভলম্বি হতে হবে। তার ব্যক্তিগত আয়-ব্যয়ের এবং জমা-খরচের একটি হিসাব প্রদান করে যদি দেখানো যায় তিনি তার নিজের খরচের পর সঞ্চিত অর্থ থেকে আবেদনকারীকে সাপোর্ট করতে সক্ষম সেক্ষেত্রে ভালো ফলাফল আশা করা যাবে।
থার্ড পার্টি সাপোর্ট কত দিনের হবে:
প্রশ্ন হলো তৃতীয় পক্ষ বা বিকল্প সাপোর্ট দিলে তা কতদিনের হতে হবে। এ বিষয়ে ও একটি ব্যখ্যা প্রদান করা হয়েছে। বলা হয়েছে এই সাপোর্ট হতে হবে মিনিমাম ৩০ মাসের। অর্থাৎ আবেদনকারীকে দেখতে হবে যে, ভিসা প্রদান করলে আগামী ৩০ মাস থার্ড পার্টি নিয়মিত ভাবে সাপোর্ট করতে পারবেন।
কে হবেন থার্ডপার্টি:
আইনের মধ্যে বলা হয়েছে থার্ডপার্টিকে Genuine হতে হবে, তবে কে হতে পারবেন অথবা কে হতে পারবেন না এর কোন সঠিক ব্যখ্যা নাই। তথাপি ধরে নেয়া যায় থার্ডপার্টি যিনি হবেন তার এই সাপোর্ট করার পেছনে একটি ইন্টারেস্ট থাকতে হবে। যেমন যদি ছেলে-মেয়ে যদি মা-বাবার সাপোর্ট করে অথবা পরিবারের কিংবা নিকটাত্মীয় কেউ যদি করো সাপোর্ট করে সেক্ষেত্রে জেনুইন বলা যেতে পারে। এমনকি খুব কাছের বন্ধু-বান্ধব ও হতে পারে যে কিনা মানবিক ভাবে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসতে চাইছে। তবে একটি কথা মনে রাখতে হবে এই থার্ডপার্টিকে কিন্তু আগামী ৩০ মাসের জন্য সাপোর্ট করার জন্য দ্বায়বদ্ব হতে হবে। সুতরাং যে কারো সাপোর্ট নিয়ে আবেদন করলে ভিসা অফিসারকে বুঝানো খুব মুশকিল হবে। সুতরাং থার্ডপার্টি নির্বাচনে খুব যত্ন নেয়া জরুরি।
জব অফার বা সেভিংস:
থার্ডপার্টি সাপোর্ট ছাড়াও আবেদনকারীর ভবিষ্যত ইনকাম অর্থাৎ ইউকেতে আসার পর উনি কাজ করবেন এবং এই কাজ করার জন্য তিনি যদি কাজের অফার দেখতে পারেন সেটা ও আবেদনকারীর বিকল্প ইনকাম হিসাবে আবেদনের সাথে বিবেচিত হবে। এছাড়া বর্তমানে প্রচলিত আইন অনুযায়ী যদি স্পনসর অথবা আবেদনরীর ব্যংক একাউন্টে সঞ্চিত টাকা থাকলে এবং তা আবেদনের সাথে জমা দিলে বিকল্প সাপোর্ট হিসাবে বিবেচনায় আসতে পারে।
থার্ডপার্টি সাপোর্ট নিয়ে কেমন ভিসা দেয়া হবে:
সাধারণত স্বামী-স্ত্রীর ভিসা ফ্যামিলি মাইগ্রেশন রুটে দেয়া হয় ৬০ মাসের বা ৫ বছরের। প্রথমে ৩০ মাসের এবং পরবর্তীতে আরো ৩০ মাসের আর মোট ৬০ মাস বা ৫ বছর পর স্থায়ী ভিসা প্রদান করা হয়। কিত্নু যদি আবেদনকারী থার্ডপার্টি বা বিকল্প ইনকামের উপর নির্ভর করে আবেদন করেন সেক্ষেত্রে আবেদনকারীকে ভিসা প্রদান করা হবে ১০ বছর রুটে। প্রথমে ৩০ মাস এবং এর পর প্রতি ৩০ মাস অন্তর অন্তর আবেদনকারীকে ভিসা বাড়াতে হবে। মোট ১২০ মাস বা ১০ বছর পূরণ করার পর আবেদনকারী স্থায়ী বসবাস করার সুযোগ পাবেন।

বেনিফিট পাওয়ার সম্ভাবনা:সাধারণত এন্ট্রি ক্লিয়ারেন্স ভিসায় বেনিফিট পাবার কোন অনুমতি থাকেনা। তবে থার্ডপার্টি কিংবা বিকল্প ইনকাম নিয়ে মানবিক বিবেচনায় যারা আসবেন তাদের ভিসা অফিসার বেনিফিট পাবার অনুমতি দিতে পারেন। যদি ভিসা অফিসার মনে করেন আবেদনকারীকে বেনিফিট প্রদান না করলে মানবিক ভাবে কঠোর হবে এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব পড়বে এবং তারা দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করবে।
লেখক:
ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
প্রিন্সিপাল সলিসিটর্ কেসি সলিসিটর্স
সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং সহ-সভাপতি
দি সোসাইটি অব ব্রিটিশ-বাংলাদেশী সলিসিটর্স

ACB#17

Advertisement