পাকিস্তানে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা; ইমরান খানের বিদায় নিশ্চিত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র!

রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা পাকিস্তানজুড়ে। ভারত উপমহাদেশ সহ সচেতন বিশ্বের চোখ ইউক্রেনের পর এখন পাকিস্তানে। সেখানে যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তাতে যেকোনো সময় পদ হারাতে পারেন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। আবার এমনও হতে পারে তিনি আগাম নির্বাচন ঘোষণা করে প্যাভিলিয়নে ফিরে যেতে পারেন। তার বিরুদ্ধে যে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছে জাতীয় পরিষদে কয়েকদিন অধিবেশন মুলতবি রাখার পর বৃহস্পতিবার বিকালে তা আবার শুরু হয়। এ সময় বিরোধী দলগুলো তীব্র হট্টগোল শুরু করে। ব্যাস শুরু হতে না হতেই জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আবার আগামী রোববার স্থানীয় সময় সকাল ১১টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করা হয়েছে। ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে বৃহস্পতিবার অধিবেশন শুরু হয়।

ইমরান খানের বিরুদ্ধে বিরোধীদলীয় নেতা শাহবাজ শরীফ ২৮শে মার্চ জাতীয় পরিষদে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সেদিনই স্বল্প সময়ের অধিবেশনে প্রস্তাবটি বিতর্কে দেয়ার জন্য অনুমোদন দেয়া হয়। অধিবেশন ৩১শে মার্চ, বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত মুলতবি হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার অধিবেশন শুরু হয় ২৪ দফা এজেন্ডা নিয়ে। এর মধ্যে অনাস্থা প্রস্তাব ছিল চার নম্বর এজেন্ডা।
এ নিয়ে অনলাইন ডনে একটি মতামত কলাম লিখেছেন এফ. এস ইজাজুদ্দিন। তাতে তিনি বলেছেন, মিউজিক্যাল চেয়ারস শিশুদের উপযোগী করে সাজানো একটি গেম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই খেলা খেলছেন রাজনীতিকরা। ইসলামাবাদের ‘কিন্ডারগার্টেনে’ এই খেলায় আছেন চকচকে একজন ধর্মীয় নেতা, একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট, একজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী। এই খেলায় শেষ চেয়ারটিতে কে বসবেন, তা নিয়ে এক অদৃশ্য লড়াইও আছে। তাদের সঙ্গে টক্কর দিচ্ছেন একজন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে এ চেয়ারে যারা বসতে পেরেছেন তারা জানেন যে, এটা শক্তির চেয়ে বেশি প্রতীকী। বর্তমান সময়ের ফ্যান্টাসি গেম ‘আয়রন থ্রোন’-এর সমতুল্য বিষয়টি। ইসলামাবাদের ‘আয়রন থ্রোন’ দখল করতে কঠোর লড়াই করতে হচ্ছে। নানাভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে। পাল্টা আক্রমণ করা হচ্ছে। ১৯৪৭ সাল থেকে পাল্টাপাল্টি, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অমানবিক নির্যাতনকে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যদিয়ে রাজনীতিকরা তাদের সুনাম নষ্ট করেছেন। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বিরোধীদের চাপে তারই নির্বাচিত পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে উসমান বুজদারকে সরিয়ে দেয়ার ইস্যুতে ইমরান বুঝাতে চেয়েছেন তিনি অপরিবর্তনীয় ও অপরিহার্য।
বুজদারকে পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার দাবি তুলেছিলেন ইমরান খানের সাবেক ঘনিষ্ঠ জাহাঙ্গীর তারিন। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ইমরান। কিন্তু জাতীয় পরিষদে অনাস্থা ভোটের মুখে পড়ে বাস্তবে কৌশল পুনর্বিবেচনা করেছেন ইমরান খান। তিনিও বাধ্য হয়ে বিরোধী জোটের মতো হর্স- ট্রেডিয়ের আশ্রয় নেন বা প্রলোভন দিয়ে পক্ষে আনার চেষ্টা করেন। তার এ প্রচেষ্টার নিন্দা জানিয়েছে বিরোধীরা। ইমরানের পিএমএলকিউয়ের মিত্র চৌধুরী পারভেজ ইলাহি সুযোগ দেখতে পান। দ্রুত তিনি পল্টি দিয়ে ফেলেন। উসমান বুজদারও পদত্যাগ করে বসেন। শেষ দু’দিনে ইমরান খানের জোটের সঙ্গী করাচিভিত্তিক মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট-পাকিস্তান (এমকিউএমপি) এবং বেলুচিস্তান আওয়ামী পার্টি তাকে ছেড়ে যোগ দেয় বিরোধী শিবিরে। ফলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় ইমরান খানের। তিনি বাধ্য হয়ে সেই সেনাবাহিনীর দ্বারস্থ হন। বলাবলি আছে, তাদের কাছে সহায়তা চেয়েছেন ইমরান খান। কিন্তু সেনাবাহিনী সরাসরি তাকে সমর্থন দিয়েছেন- এমনটা বলা যায় না। বরং তারা কয়েকটি অপশন নিয়ে কথা বলেছেন। কথা বলেছেন, বিরোধী দল সহ সরকার- উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছার কথা। অথবা আগাম নির্বাচন দেয়ার কথা আলোচনা হয়েছে। তাও যদি সম্ভব না হয় তাহলে সরাসরি অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হওয়ার কথা বলা হয়।
ওদিকে ইমরান খান আউট হয়ে গেলে নতুন সরকারের দায়িত্বে আসতে পারেন পিএমএলএনের সভাপতি শাহবাজ শরীফ। এমন এক জটিল অবস্থার মধ্যে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন ইমরান খান। এদিন তিনি জাতীয় নিরাপত্তা কমিটিরও বৈঠক আহ্বান করেছেন। এর আগের দিন তিনি সাক্ষাৎ করেন সেনাপ্রধান জেনারেল কমর জাভেদ বাজওয়ার সঙ্গে। বিরোধীরা যখন আস্তে আস্তে ‘স্লো মোশনে’ বল করা শুরু করেছিল, তখন অভিজ্ঞ, পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন ইমরান খান তা আমলে নেননি। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন ‘ওয়াইড’ বলের মতোই ‘স্ট্যাম্পের’ বাইরে দিয়ে উড়ে যাবে সেই বল। কিন্তু লাইন-লেন্থ ঠিক থাকায় বিরোধীদের বল এখন তার ‘মিডল স্ট্যাম্পের’ ওপর। ব্যাট যদি সংযোগ করতে না পারেন- তাহলেই আউট। এই খেলায় তিনি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সামনে এনেছেন। বলেছেন, একটি বিদেশি দেশ তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার মিশনে নেমেছে। এ বিষয়ে তিনি সিনিয়র সাংবাদিক, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও সেনাপ্রধানকে চিঠির বিষয়ে অবহিত করেছেন।
অনেক রকম সমীকরণ এখন ইমরান খানের সামনে। তিনি কোনটা রেখে কোনটার সমাধান করবেন! তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা বেঁধেছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। গত এক বছরের বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইমরান খানের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে উঠেছে। তিনি চীন এবং রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ হয়েছেন। পাকিস্তানে কমপক্ষে ৬০০০ কোটি ডলারের প্রকল্পে সহায়তা দিচ্ছে বেইজিং। ইউক্রেনে যখন নৃশংস আগ্রাসন চালাচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তখন মস্কো সফরে গিয়েছেন ইমরান খান। কথিত ওই চিঠি নিয়ে এরই মধ্যে ডন রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এই চিঠি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠিয়েছেন পাকিস্তানি সাবেক একজন দূত। আসলে এটি একটি তারবার্তা। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি ওই সাবেক রাষ্ট্রদূতকে যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা সতর্ক করেছেন এই বলে যে, যদি অনাস্থা ভোটে ইমরান খান টিকে যান, তাহলে তাদেরকে গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে। কথিত আছে, ওই চিঠিতে বলা হয়েছে- ইমরান খান ক্ষমতায় থাকলে পাকিস্তানের সঙ্গে কাজ করবে না যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা পাকিস্তানি কোনো সাবেক দূতের কাছে কোনো বার্তা পাঠানোর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

Advertisement