পাকিস্তান কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?

বকর আহমেদ :: পাকিস্তানের ৭১ বছরের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো সফলভাবে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা নিয়েছে গত বছর। দুর্নীতিবিরোধী স্লোগান সামনে নিয়ে ইমরান খান সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। ইমরানের নতুন এই সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। সরকারের মধ্যেও চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার সদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে।

সরকার এখন অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই নয়, বরং অর্থনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই করাও নতুন সরকারের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

দেশটির বর্তমান পরিস্থিতি মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। ২০১৮ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভয়ানকভাবে কমে গেছে। রপ্তানি স্থবির হয়েছে এবং আমদানির পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। উপরন্তু ক্রমবর্ধমান আর্থিক ঘাটতি পূরণ করতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ধারদেনা করতে হচ্ছে। সরকারি খাতের উদ্যোগ ও জ্বালানি খাতে ব্যাপক লোকসানের কারণে মূলত এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ডলারের বিপরীতে পাকিস্তানি রুপির দাম পড়ছেই। মুদ্রানীতি ও সরকারি খাতের উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করায় চাহিদা কমে গেছে। ২০১৯ সালে মোট দেশজ উৎপাদন ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসবে বলে বলা হচ্ছে। এই বছরে যে পরিমাণ দেনা শোধ করার কথা ছিল, সে লক্ষ্যও অর্জিত হবে না বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

এই অবস্থায় ইমরানের নতুন সরকার আস্তে আস্তে জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে আরেক দফায় ঋণ নিতে হবে। একই সঙ্গে সরকার বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর কাছ থেকে স্বল্পমেয়াদি অর্থ সহায়তা পাওয়ার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে বলে আপাতত মনে হচ্ছে। দিন দুই আগে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি চুক্তি হলো। সেই চুক্তি অনুযায়ী সৌদি আরব পাকিস্তানে দুই হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। এর আগে পাকিস্তান সরকার সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছ থেকে চার শ কোটি ডলার নিয়েছে। চীনের কাছ থেকেও আড়াই শ কোটি ডলার পাওয়া যাবে বলে তারা আশা করছে। এই ধরনের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা পেলে হয়তো আইএমএফ পাকিস্তানের প্রত্যাশামতো না হলেও কিছু অর্থ নতুন করে দিতে পারে।

পুরোনো ঋণ শোধের কিস্তির অর্থ সরবরাহ অব্যাহত রেখে নতুন করে ঋণ পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা মোটেও উদ্‌যাপন করার মতো বিষয় হতে পারে না। এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মডেল হতে পারে না। জনগণকে এই ধরনের অর্থনৈতিক মডেল উপহার দেওয়া কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য সুখকরও নয়। ইমরানের সরকার মাত্র ছয় মাস আগে ক্ষমতায় এসেছে। অন্যদিকে গত ছয় দশকে আইএমএফের কাছ থেকে ২১টি গুচ্ছ সহায়তা নিয়েছে পাকিস্তান। তার মানে বোঝাই যাচ্ছে, পাকিস্তান হঠাৎ করে এই সংকটে পড়েনি। এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি ও ক্রনিক পর্যায়ের।

এই পরনির্ভরশীলতার শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসতে হলে পাকিস্তানের নতুন সরকারকে সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমি মনে করি, চারটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলে পাকিস্তান এই সংকট থেকে বের হতে পারবে।

এক. সরকারি খাতে সবচেয়ে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত লোক নিয়োগ করতে হবে। যথাসম্ভব প্রণোদনা দিয়ে এসব কর্মীকে ধরে রাখতে হবে এবং জবাবদিহিমূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

দুই. প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পাকিস্তানকে সাহসী রূপরেখা নিয়ে এগোতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের পাঁচসালা উন্নয়ন পরিকল্পনাকে ঢেলে সাজাতে হবে। সেই পরিকল্পনায় কৃষি ও কলকারখানার উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন উদ্যোক্তাদের সার্বিক সহায়তা দেওয়ার কথা ভাবতে হবে।

তিন. প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য ও টেকসই হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সরকারকে ‘আগামীকালের অর্থনীতি’র প্রতি জোর দিতে হবে। বাণিজ্যনীতিকে অভিজাতদের খপ্পর থেকে মুক্ত করে ভোক্তাবান্ধব করে তুলতে হবে। পানি ও জ্বালানির মতো সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।

চার. সরকারকে নতুন নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ করে দিতে হবে। পাকিস্তানের ৬০ শতাংশ লোক ২৫ বছরের কম বয়সী। তাঁদের মধ্য থেকে বহু তরুণ উদ্যোক্তা উঠে আসছেন, তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে।

এসব বিষয়ে নজর না দিলে পাকিস্তানকে আরও অনেক বড় সংকটের মুখে পড়তে হবে।

Advertisement