প্লাস্টিক থাকলে মানুষ থাকবে না

ব্রিট বাংলা ডেস্ক :: পৃথিবী নামক গ্রহ একটাই, তাই পরিবেশ-প্রকৃতির গুরুত্ব জীবনেরই সমান। ২০১৮ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়ে গেল। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করা। ভাবা যায়, বর্তমান সময়ে বিশ্ববাসীর সামনে অন্যতম একটা চ্যালেঞ্জ হলো এই প্লাস্টিক!

প্লাস্টিক দূষণে বিশ্বের মধ্যে দশম বাংলাদেশ
প্লাস্টিক আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অপরিহার্য অংশগুলোর একটি এবং এর একক ব্যবহার বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। স্থায়িত্ব, কম খরচ এবং বিভিন্ন আকার ও এর সহজলভ্যতার কারণে প্লাস্টিক ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। ভোক্তা সমাজ ও উৎপাদনকারীদের মানসিকতা এবং আচরণ এর জন্য দায়ী। একক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত প্লাস্টিক সামগ্রী যেমন পানির বোতল, স্ট্র, প্লাস্টিকের চামচ ইত্যাদি একবার ব্যবহার করার পর ফেলে দেওয়া হয় এবং এসব দ্রব্যের চূড়ান্ত¯গন্তব্য হয় আমাদের নদী বা সমুদ্রে। বাংলাদেশে প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে আরও বাড়বে যদি এর লাগাম টেনে ধরা না হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্লাস্টিক দ্রব্যাদির বাজার প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার, যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ হাজার প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে প্রায় ২০ লাখের বেশি লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।

এখানে প্রতিবছর মাথাপিছু প্রায় পাঁচ কেজি প্লাস্টিক দ্রব্যাদি ব্যবহৃত করা হয় এবং জিডিপিতে এর পরিমাণ প্রায় ১ শতাংশ। ঢাকা শহরে প্রতিদিন ১ কোটি ৪০ লাখ পলিব্যাগ পরিত্যক্ত হচ্ছে আর তা জলাধার, নদী ও মহাসাগরে গিয়ে জমা হচ্ছে। জীববৈচিত্র্যের ওপর ফেলছে মারাত্মক প্রভাব। শহরের পয়োনিষ্কাশন-ব্যবস্থায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। সাম্প্রতিক সময়ে আর্থ-ডে নেটওয়ার্কে প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০১৮ সালে বিশ্বের সর্বাধিক ২০টি প্লাস্টিক দূষণকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে চীন ও ইন্দোনেশিয়া। দেশের বর্জ্যের প্রায় ৮ শতাংশ হলো প্লাস্টিক। এর চার ভাগের এক ভাগ গিয়ে পড়ে সাগরে ও নদীতে। এসব কারণে ব্যবহার-পরবর্তী প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সাম্প্রতিক বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৩ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক প্রতিবছর সাগরে পতিত হওয়ার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে সাগরে মাছের তুলনায় প্লাস্টিকের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। পৃথিবীব্যাপী প্রতি মিনিটে ১০ লাখ প্লাস্টিক বোতল সাগরে পতিত হয়, যা জলজ প্রাণীর জন্য হুমকি। ব্যবহৃত প্লাস্টিকের অধিকাংশ মাটির সঙ্গে মিশে যায় না এবং কিছু কিছু মিশলেও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

জলবায়ু পরিবর্তনে প্লাস্টিকের কুপ্রভাব
দেশে প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহার দরকার, কারণ এটি মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। পয়োনিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বন্যার কারণ হিসেবে দেখা দেয়; সাগর ও নদীর তলদেশে জমার কারণে মাটি, পানি, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং সামুদ্রিক জীবের ক্ষতি করে এবং যেসব প্লাস্টিক পুনরায় ব্যবহারের অনুপযোগী, তা মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণ করে; মাটিতে প্লাস্টিকযুক্ত হওয়ার কারণে বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা আরও ব্যয়বহুল হয়। প্লাস্টিক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করে এবং প্রজনন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে, শ্বাস-প্রশ্বাসের অসুবিধা এবং ক্যানসারের কারণ হিসেবে দেখা দেয়।

প্লাস্টিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রতিবছর প্লাস্টিক উৎপাদনে প্রায় ১৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহার করা হয়। এক কেজি প্লাস্টিক উৎপাদনে প্রায় দুই থেকে তিন কেজি পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, যা বৈশ্বিক উঞ্চায়নে ভূমিকা রাখে।

প্লাস্টিক দূষণ ব্যবস্থাপনায় কিছু সুপারিশ
বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ, যা ২০০২ সালে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করে এবং গত বছর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত সমুদ্র সম্মেলনে ২০২৫ সালের মধ্যে স্বেচ্ছায় সামুদ্রিক দূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। প্লাস্টিক দূষণ হ্রাস করার জন্য আমাদের ভোগ, উৎপাদন, ভোক্তা আচরণ ও রাজনৈতিক চিন্তাচেতনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো বিভিন্ন সমাধানের উপায় উৎসাহিত করে ভোক্তা ও উৎপাদনকারীর ব্যবহারের দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনা। প্লাস্টিক দূষণ রোধের কার্যক্রমকে গতিশীল করতে এবং এই বিশ্ব পরিবেশ দিবসকে ব্যবহার করে উৎপাদনকারী, ভোক্তা, অ্যাকটিভিস্ট, গণমাধ্যমকর্মী এবং নেতাদের বর্তমানে প্লাস্টিক দ্রব্যের ব্যবহার কমাতে উৎসাহ প্রদান করতে হবে।

প্লাস্টিক উৎপাদন ও ব্যবহারে নতুন মডেল সৃষ্টি করা দরকার। আমরা বিশ্বাস করি এবং ব্যক্তিরা, ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নীতিনির্ধারকেরা এই পৃথিবীর কল্যাণের কথা চিন্তা করে প্লাস্টিক দূষণ রোধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রথমত, আমরা আমাদের আচরণ ও ভোগব্যবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে যেমন প্যাকেজিং উপকরণ, বোতলজাতীয় পানিসহ, কোমল পানীয় প্লাস্টিক বোতলের পরিবর্তে মাটির সঙ্গে মিশে যায় এমন পাটের ব্যাগ, কাচের তৈরি বোতল এবং কাগজের তৈরি ট্রেট্টা প্যাক, কোমল পানীয়ের জন্য কাচের বোতলের ব্যবহার করতে পারি, যা আমরা আগেও ব্যবহার করতাম।

দ্বিতীয়ত, প্রাইভেট সেক্টরকে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তারা অধিক হারে মাটির সঙ্গে মিশে যায়, এমন দ্রব্যাদির ব্যবহার করতে পারে এবং ক্রমান্বয়ে পলিথিন বা প্লাস্টিক উপকরণ উৎপাদন হ্রাস করে। এ বিষয়ে অধিক গবেষণা, কারিগরি উন্নয়ন দরকার, যা বিকল্প বা বাণিজ্যিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিকভাবে স্থায়িত্বশীল হবে।
তৃতীয়ত, সরকার শক্তিশালী নীতিমালা তৈরি করে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহনীয় পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যাতে প্লাস্টিক দ্রব্যের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমে যায়। সরকার বর্তমানে প্লাস্টিকের বিকল্প দ্রব্য উৎপাদন পদ্ধতি প্রণয়নের জন্য ব্যক্তি খাতে কারিগরি এবং আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করতে পারে।

সর্বশেষে, প্লাস্টিক দ্রব্য ব্যবহারের ওপর আমাদের বিদ্যমান করপোরেট সংস্কৃতি ও আচরণ পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের অফিস বা কর্মস্থলে প্লাস্টিক ও পলিথিনের বিকল্প উপকরণ ব্যবহার, যেমন প্লাস্টিকের বোতলের পরিবর্তে কাচের জগ বা বোতলের ব্যবহার, পলিথিন ব্যাগের পরিবর্তে পাটের ব্যাগের ব্যবহার, প্লাস্টিকের কাপের বদলে সিরামিকের কাপের ব্যবহার এ উৎসাহিত করতে হবে। অফিস বা কর্মস্থলে এমন সংস্কৃতি আমাদের লালন করতে হবে, যাতে বড় কর্তা থেকে কর্মচারী—সবাই প্লাস্টিক ও পলিথিনের বিকল্প উপকরণ ব্যবহার করতে বাধ্য হন।

সময় এসেছে এখন সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করে প্লাস্টিক দূষণ রোধ করা এবং পৃথিবী নামক গ্রহটিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখা।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল: সহযোগী অধ্যাপক, ফলিত রসায়ন বিভাগ. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির জাতীয় পরামর্শক।
আরিফ মো. ফয়সল: জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচিতে কর্মরত।

Advertisement