রোহিঙ্গা শরণার্থী ‘প্রাচ্যের ফিলিস্তিন’ সংকট হবে রোহিঙ্গা ইস্যু?

এম সাখাওয়াত হোসেন :: গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বর বাংলাদেশ যখন নির্বাচন নিয়ে সরগরম ছিল এবং ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে যখন ব্যস্ততা, তারই মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রায় ১ হাজার ৩০০ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু ভারত থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করেছে। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের শূন্যরেখায় আরও ৩১ রোহিঙ্গা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। অবস্থাদৃষ্টে ভারত থেকে আরও রোহিঙ্গা প্রবেশের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভারতের উদ্বাস্তু নীতি ও চরমপন্থী হিন্দু সংগঠনগুলোর তৎপরতার কারণে এমন মনে হওয়া স্বাভাবিক। উল্লেখ্য, ভারতে প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু রয়েছে। অপরদিকে সৌদি আরবও সে দেশে বেআইনিভাবে প্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে বলে জানা গেছে। পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, সৌদি আরবে অবৈধভাবে প্রবেশের অভিযোগে জেলে থাকা রোহিঙ্গারা অনশনে রয়েছে।

এই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করলে বিদ্যমান রোহিঙ্গা সমস্যার ওপর আরও চাপ বাড়বে। প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা ইতিমধ্যেই কক্সবাজার জেলার কুতুপালং এলাকায় শিবিরে রয়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার কার্যক্রম ও অর্থায়ন অনেক কমে আসছে বলে জানা গেছে। সরকার ভাসানচর এলাকায় প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গার অস্থায়ী আবাসনের যে পরিকল্পনা নিয়েছিল, তা কার্যকর হবে বলে মনে হয় না। কারণ, ওই চরে রোহিঙ্গারা যেতে যেমন অনিচ্ছুক, তেমনি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা, বিশেষ করে জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক হাইকমিশন অনিচ্ছার বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করার সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে সহমত নয়।

বিগত বছরে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয়ভাবে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিলেও মিয়ানমারের নানা টালবাহানার কারণে কোনো ফল পাওয়া যায়নি। তথ্যমতে, রোহিঙ্গারাও রাখাইন অঞ্চলে নিরাপত্তার অনিশ্চয়তার কারণে এভাবে ফেরত যেতে ইচ্ছুক নয়। তাদের দাবি, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নাগরিকের মর্যাদা দিতে ইচ্ছুক নয় এবং এমন পরিবেশে তাদের নিরাপত্তা বিধানও হবে না। কাজেই দৃশ্যত দ্বিপক্ষীয়ভাবে এর আশু সমাধান সম্ভব হচ্ছে বলে মনে হয় না। এরই মধ্যে সরকারের ধারাবাহিকতা থাকলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন এসেছে।

বাংলাদেশের এহেন পরিস্থিতির মধ্যে গত ডিসেম্বর থেকে একদা রোহিঙ্গা-অধ্যুষিত উত্তর রাখাইনের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। বছরের শুরুতে ৪ জানুয়ারি মিয়ানমারের স্বাধীনতা দিবসে রাখাইনের একসময়ের রোহিঙ্গা-অধ্যুষিত বুথিডং ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে আরাকান আর্মির (এএ) হামলায় মিয়ানমার পুলিশের ১৩ কর্মকর্তা ও সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন এবং অনেকে আহত হয়েছেন। এই হামলার পর ওই সব অঞ্চল থেকে শত শত বুড্ডিস্ট আরাকান নিবাসী ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। মিয়ানমার টাইমস-এর খবর অনুযায়ী আরাকান আর্মির আক্রমণের প্রেক্ষাপটে কালাদান নদের দক্ষিণের শহর বুথিডংয়ের ৩০ জন গ্রামপ্রধান পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, একদিকে তাঁরা আরাকান আর্মির হুমকির মুখে রয়েছেন, অপরদিকে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী সন্দেহ করে আরাকান আর্মিকে গ্রামপ্রধানেরা সহযোগিতা দেন। এই ক্ষোভ থেকেই তাঁরা পদত্যাগ করেন।

রাখাইনে আরাকান আর্মির তৎপরতা রোহিঙ্গাদের ওই সব অঞ্চল ছাড়ার পর থেকে বাড়ছে। ২০১৭ সালের শেষের দিকে উত্তর কালাদান নদসংলগ্ন অঞ্চলে হামলা করে ১১ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে আরাকান আর্মি তাদের শক্তির পরিচয় দিতে শুরু করেছে। ফলে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আরাকান অঞ্চলে নতুনভাবে বিদ্রোহ দমনে মাঠে নেমেছে। ব্যাপক অভিমান চলছে এখন রাখাইনে। যার ফলে সপ্তাহখানেক আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ঘোষণা করেছে যে ওই অঞ্চলে পাল্টা অভিযানে ১৩ জন এএ সদস্যকে হত্যা এবং তিনটি অস্ত্র উদ্ধার করে তারা।

উল্লেখ্য, ডিসেম্বরে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি বড় ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও আরাকান আর্মির সঙ্গে এমন কোনো সমঝোতা হয়নি। এর প্রধান কারণ আরাকান আর্মি ও তথাকথিত আরসার বিরুদ্ধে রাখাইনে অব্যাহত সেনা তৎপরতা। অথচ আরসা এর মধ্যে কোনো আক্রমণ করেছে-এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

২০০৯ সালে আরাকান আর্মি গঠিত হয় রাখাইন অঞ্চলকে প্রাথমিকভাবে অধিকতর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে। পরে তারা আলাদা রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে। আরাকান আর্মি রাখাইনকে মিয়ানমার কর্তৃক দখলকৃত অঞ্চল মনে করে। একসময়ের স্বাধীন আরাকান (রাখাইন) পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য তাদের এই যুদ্ধ। ইদানীং আরাকান আর্মি নতুনভাবে পুনর্গঠিত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে যে এদের জনবল পাঁচ হাজারের কাছাকাছি এবং কাচিন ইনডিপেনডেন্ট আর্মির দ্বারা প্রশিক্ষিত। তারা নতুন স্বয়ংক্রিয় চীনা অস্ত্রে সজ্জিত, যার উৎস উত্তর-পূর্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ওয়া স্টেট আর্মি (ইউডব্লিউএসএ)। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ওয়া স্টেট আর্মি পরোক্ষভাবে চীন থেকে প্রচুর অস্ত্রের চালান পেয়েছে (এশিয়া টাইমস: মে ২২ ২০১৭)। উল্লেখ্য, ওয়া স্টেট নামের জায়গাটি সম্পূর্ণভাবে ইয়াঙ্গুন থেকে বিচ্ছিন্ন এবং নিজস্ব বিদ্রোহী সরকার দ্বারা পরিচালিত। এই অঞ্চলে চীনের সহযোগিতায় জলবিদ্যুৎকেন্দ্র হয়েছে এবং অস্ত্র ও মাদকের চালানের মাধ্যমে তারা অর্থ উপার্জন করে। মিয়ানমারের অন্যান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনও ওয়া অঞ্চলের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে চীনা অস্ত্র পায়। ওয়া আর্মির রয়েছে আর্টিলারি এবং এপিসি (আর্মার্ড পারসান ক্যারিয়ার)। ওয়া অঞ্চলে আরও কয়েকটি স্বতন্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী রয়েছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এবং সু চি সরকার পশ্চিমা দেশ থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় পুনরায় চীনের মুখাপেক্ষী হয়েছে। চীন এখন আগের থেইন সেইন সরকারের বাতিল করা উত্তরাঞ্চলের মাইটসন বাঁধ নির্মাণে নতুন করে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং সু চি সরকারের সঙ্গে নতুনভাবে সহযোগিতা ব্যাপারে আশাবাদী। এই প্রকল্পের ব্যয় হবে ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা মিয়ানমারের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে রক্ত জোগাবে। এই প্রকল্প শুরু হলে বিরাট অঞ্চল প্লাবিত হবে এবং সেই কারণেই তা বাতিল হয়েছিল। তবে এখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ চীনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জন্য অতীব জরুরি। এখানে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৯০ শতাংশ চীনে রপ্তানি হবে। এ ছাড়া চীন আটকে থাকা রাখাইনের কিকিয়াপু গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে প্রস্তাবিত অধিক গতিসম্পন্ন রেলপথ তৈরির পুনঃ উদ্যোগ নিচ্ছে। বর্তমানে মিয়ানমারের ৪০ শতাংশ বাণিজ্য রয়েছে চীনের সঙ্গে। এশিয়া টাইমস-এর রিপোর্ট মতে, চীন একদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দিয়ে মিয়ানমারকে একধরনের চাপে রাখতে চায়। অন্যদিকে চীনের মধ্যস্থতার কারণেই বর্তমানের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধবিরতি। আরাকান আর্মির এই তৎপরতাও ওই প্রভাবে প্রভাবিত কি না, তা দেখার বিষয়। তবে মিয়ানমার যে ক্রমেই চীনের ওপর অভ্যন্তরীণ, আন্তর্জাতিক এবং অর্থনৈতিক কারণে পুনরায় ঝুঁকছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দক্ষিণ রাখাইনে চীনের ওবিওআর এবং প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ ভূকৌশলগত দিক থেকে তেমনটাই মনে হচ্ছে। রাখাইনে চীন-ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষণীয় হলেও চীনের পাল্লাই ভারী। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে এসব কারণেই চীনের সদিচ্ছা অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ।

তবে আরাকান আর্মির উত্তর রাখাইনে ক্রমবর্ধমান শক্তি প্রদর্শন এবং তৎপরতায় যে দেশটি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে ধারণা করা হয়, সেটি হলো ভারত। আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে রাখাইনে মিয়ানমারের অভিযান পাল্টা-অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে রাখাইন অঞ্চল যে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, তাতে সন্দেহ নেই। এই প্রেক্ষাপটে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা যে সহজে তাদের নিজস্ব জন্মভূমিতে ফিরে যেতে পারবে-বর্তমান পরিস্থিতি তেমন ইঙ্গিত দেয় না। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সামনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এটাই এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার অঞ্চলে অনিশ্চিত কালের অবস্থান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তসীমান্ত নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। অনেকেরই ধারণা, রোহিঙ্গা ইস্যু হয়ে উঠতে পারে ‘প্রাচ্যের ফিলিস্তিন’ সংকট।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন: সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, বর্তমানে এনএসইউর অনারারি ফেলো

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Advertisement