শ্রীলংকা হামলা : ইসলামিক স্টেটের ‘দ্বিতীয়’ উত্থান

তারেক শামসুর রেহমান ::

শেষ অবধি ইসলামিক স্টেট বা আইএস স্বীকার করল, তারা শ্রীলংকায় গত ২০ এপ্রিল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। রাজধানী কলম্বো ও শহরতলির তিনটি গির্জা ও কয়েকটি ফাইভ স্টার হোটেলে যে সন্ত্রাসবাদী আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়েছিল, তাতে এখন পর্যন্ত ৩৫৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বরাবরের মতো ওয়াশিংটনভিত্তিক সন্ত্রাস পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা Site intelligence কয়েকজন যুবকের ছবি প্রকাশ করে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিল, এরাই আত্মঘাতী বোমারু। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আইএস যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছিল Site intelligence
কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাদের ওয়েবসাইটে তা প্রকাশ করেছিল। এটি পরিচালনা করেন রিটা কাট্‌জ নামে একজন নারী। যিনি এক সময় ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করতেন।

শ্রীলংকায় আত্মঘাতী বোমা হামলার পরপরই আমি গণমাধ্যমকে বলেছিলাম, এটা আইএসের কাজ। তারা মার্চে ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে যে ৭১ জন মুসল্লিকে হত্যা করা হয়েছিল, আইএস প্রতিশোধ নিল এর মধ্য দিয়ে। আইএস আগেই এর প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু মাত্র এক মাসের ব্যবধানে তারা যে প্রতিশোধটি নেবে এবং শ্রীলংকার মতো একটি দেশকে বেছে নেবে, এটা ছিল আমার কাছে অকল্পনীয়। আইএস কেন শ্রীলংকাকে বেছে নিল, এটা নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে।

এখন শ্রীলংকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংঘটিত করে আইএস তার ‘দ্বিতীয় উত্থান’কে জানান দিল। ২০১৪ সালে সিরিয়া-ইরাকে আইএসের জন্ম ছিল অবাক করার মতো একটি ঘটনা। সারাবিশ্ব সেদিন প্রত্যক্ষ করেছিল একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের জন্মের পর ইসলাম ধর্মের নামে তারা উদ্যোগ নিয়েছিল তথাকথিত একটি খেলাফত প্রতিষ্ঠা করার। সেই ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু মুসলমানপ্রধান দেশগুলো থেকে শত শত তরুণ সিরিয়ায় গিয়েছিল এদের পক্ষ হয়ে সিরিয়ায় যুদ্ধ করতে। সরাসরি যুদ্ধেও তারা অংশ নিয়েছিল। কিন্তু মাত্র চার বছরের ব্যবধানে ভেঙে পড়ে ইসলামিক স্টেটের সেই খেলাফতের ধারণা। সিরিয়া-ইরাক থেকে এরা পালিয়ে যায়, আশ্রয় নেয় ফিলিপাইনসহ মুসলমানপ্রধান কিছু কিছু দেশে। আইএসের মূল কাঠামো ভেঙে গিয়েছিল সত্য; কিন্তু আদর্শের মৃত্যু হয়নি। তাই মুসলমানপ্রধান দেশগুলোতে স্থানীয় কিছু সংগঠনকে উৎসাহিত করে এদের ব্যানারে আইএসের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে এখন আমরা দেখি। যেমন বলা যেতে পারে- আল শামান (সোমালিয়া), ইসলামিক স্টেট-খোরাসান (আফগানিস্তান), হাক্কানী নেটওয়ার্ক (আফগানিস্তান), দোজো মিলিশিয়া (মালি), জইশ-ই-মোহাম্মদ (কাশ্মীর), তেহরিক-ই তালেবান (পাকিস্তান), বোকো হারাম (নাইজেরিয়া), আল কায়দা ইন ইসলামিক পেনিনসুলা (ইয়েমেন), ইউনাইটেড জিহাদি কাউন্সিলের (পাকিস্তান) নাম। তবে সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এখনও জড়িত আইএস ও তালেবান। এরা সবাই ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করছে তাদের সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডে। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হলো শ্রীলংকার ন্যাশনাল তওহিদ জামাতের (এনটিজে) নাম। অতীতে শ্রীলংকায় সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত ছিল তামিল টাইগাররা। এখন সেটা অতীত। এখন যুক্ত হলো ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীরা। এটা শ্রীলংকার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য কোনো ভালো খবর নয়। লক্ষণীয়, শ্রীলংকার এই জাতীয় সংকটে সরকারি দল, বিরোধী দল, জাতীয় গণমাধ্যম ও নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী, সবাই নূ্যনতম ইস্যুতে একত্রিত হয়নি। শ্রীলংকার স্থিতিশীলতার জন্য এটা ভালো খবর নয়। তবে এটা ভুলে গেলে চলবে না, জঙ্গিবাদ এখনও একটি বৈশ্বিক সমস্যা। ইসলামিক স্টেটের উত্থান (২০১৪) ও পতনের মধ্য দিয়ে ইসলামিক জঙ্গিবাদের অবসান হয়েছে- এটা আমার মনে হয় না। বরং খোঁজ নিলে দেখা যাবে, আইএসের সঙ্গে যেসব জঙ্গি সেখানে যুদ্ধ করেছিল এবং যারা বেঁচে গিয়েছিল, তারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সেখানে স্থানীয় জঙ্গিদের সঙ্গে মিলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখছে। ফিলিপাইনের মিন্দানাও প্রদেশে ইসলামিক জঙ্গিরা আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৭ সালে আইএস জঙ্গিরা মারাভি নামে একটি শহর দখল করে নিয়েছিল। দীর্ঘ ৫ মাস মারাভি দখল করে সেখানে তারা ইসলামী শাসন চালু করেছিল। পরে অবশ্য মারাভি জঙ্গিমুক্ত হয়েছে। সাধারণত আইএস স্থানীয় জঙ্গিদের সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে তোলে। ফিলিপাইনের মিন্দানাও ও আবু সালাফ গ্রুপ, আনসার খলিফা ফিলিপাইনস, মাউটে গ্রুপ- এদের সঙ্গে আইএস রাজনৈতিক সখ্য গড়ে তুলেছে। আর এরাই সেখানে জঙ্গিবাদী কার্যক্রম চালাচ্ছে। থাইল্যান্ডের দক্ষিণে তিনটি প্রদেশ- ইয়ালা, নারালিওয়াট ও পাটানিতে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড চলছে এবং এর পেছনে আইএসের ইন্ধন আছে। দুটি সংগঠনের কথা জানা যায়- Barisan Ruslun National Malaya Patani’র সশস্ত্র শাখা Runda Kumpulan kecil I Gerakan mujahideen Islam Patani. এরা আইএসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইন্দোনেশিয়াতেও আইএসের সমর্থিত সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো (লস্কর জিহাদ, জামিয়া ইসলামিয়া, ইসলামিক ডিফেনডার্স ফ্রন্ট) তৎপর। সেখানে হামা আনসারাট দাওলাকে প্রো-আইএস বলে ধরে নেওয়া হয়। তুলনামূলক বিচারে মালয়েশিয়াতে ইসলামিক জঙ্গিদের তৎপরতা কম।

শ্রীলংকার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আইএস জানান দিল তাদের অস্তিত্বের কথা। আমি এটাকে বলছি আইএসের দ্বিতীয় উত্থান। আইএসের জন্মদাতা আবু বকর আল বুগদাদি আদৌ বেঁচে আছেন কিনা কিংবা বেঁচে থাকলে কোথায় আছেন, সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া না গেলেও আইএস সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে যেসব স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করে, শ্রীলংকার ক্ষেত্রে সেই একই স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করতে আমরা দেখেছি। যেমন স্থানীয় কোনো সংগঠনকে ব্যবহার করা (এ ক্ষেত্রে ন্যাশনাল তওহিদ জামিয়াত), আত্মঘাতী হামলাকারীদের ব্যবহার (৭ জনের একটি গ্রুপ ছবি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে), অপারেশনে যাওয়ার আগে আইএস ও বুগদাদির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ, ‘সাইট ইনটেলিজেন্স’ নামে ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার ওয়েবসাইটে তা প্রকাশ, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, শক্তিশালী বিস্ম্ফোরক ব্যবহার ইত্যাদি। আইএসের স্ট্র্যাটেজি অনেকটা Spider web স্ট্র্যাটেজির মতো। ছোট ছোট সেলে বিভক্ত হয়ে আইএস এখন তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। মাকড়সার জালের মতো সংগঠিত হচ্ছে আবার ধ্বংসও হচ্ছে। মাকড়সা যেমন ঘরের এক কোণে জাল বোনে, সেই জাল নষ্ট করে দিলে অন্যত্র, অন্য কোথাও গিয়ে জাল বোনে- আইএসের বর্তমান স্ট্র্যাটেজি অনেকটা সেরকম। আগের মতো তারা সুসংগঠিত হয়ে একটি বিশাল এলাকা নিয়ে (সিরিয়ার রাকাকে কেন্দ্র করে) যে ‘বিশাল সাম্রাজ্য’ তারা গড়ে তুলেছিল, এখন তাতে তারা পরিবর্তন আনছে বলেই মনে হয়। এটাই হচ্ছে Spider web-এর তত্ত্ব। এক জায়গায় ধ্বংস হবে, এরপর অন্য জায়গায় গিয়ে তারা আবার সংগঠিত হবে। আবু মুসাব আল সুরি (The Global Islmic Resistance) হচ্ছেন এই তত্ত্বের প্রবক্তা। এখন শ্রীলংকার সন্ত্রাস যে শেষ সন্ত্রাস, তা বোধকরি অনেকেই স্বীকার করবেন না। হয়তো দেখা যাবে, আইএস অন্য কোনো দেশে আবারও সংগঠিত হয়ে স্থানীয় কোনো সংগঠনকে ব্যবহার করে এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাবে। দক্ষিণ এশিয়া তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হচ্ছে এদের জন্য এক ধরনের উর্বর ভূমি। এ অঞ্চলে দরিদ্রতা আছে, মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বসবাস, যারা বঞ্চনার শিকার ও তাদের মাঝে হতাশা আছে- আইএসের পক্ষে এদের রিক্রুট করা সহজ।

বিশ্বব্যাপী জঙ্গি তৎপরতা বাড়ছে। ৯/১১-এর ঘটনাবলির পর যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করেছিল। ১৭ বছর পরও সেই যুদ্ধের শেষ হয়নি। পাঠকদের কিছু তথ্য দিই, যাতে বোঝা যাবে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে এ যাবৎ কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। যুদ্ধের পেছনে এ যাবৎ খরচ হয়েছে ৪ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার। ওই যুদ্ধে ১৪,৫৫,৫৯০ জন ইরাকি মারা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মারা গেছে ৪৮০১ জন সেনা আর আন্তর্জাতিক ফোর্সের মৃত্যুর সংখ্যা ৩৪৩০ জন (Infromation clearing House, April 20, 2019)। চিন্তা করা যায়, যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ঘণ্টায় খরচ হয় এক মিলিয়ন ডলার। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর কারণেই পৃথিবীর মুসলমানপ্রধান অঞ্চলগুলোতে জন্ম হয়েছে জঙ্গি সংগঠনগুলোর। আর আইএস এদের উৎসাহিত করছে জঙ্গিবাদ অব্যাহত রাখতে। সারা ফিনিয়ান কানিংহাম, নোয়াম চমস্কি কিংবা অধ্যাপক মিসেল চসুডোভস্কির লেখার সঙ্গে পরিচিত, তারা জানেন, ওইসব গবেষক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর পেছনে একটা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য কাজ করছে। আল কায়দা কিংবা আইএসের উত্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধন ছিল ও এখনও আছে- এমন কথাও কোনো কোনো মহল থেকে বলা হয়। একটি বিশেষ মহল আইএসকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে আসছে। অর্থ একটি ফ্যাক্টর। অর্থ ছাড়া এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যায় না। ফিনিয়ান কানিংহাম তার প্রবন্ধ ‘9/11 Pavid the way for Americas Permanent war or Aggression’-এ মার্কিন ব্যবসায়িক শ্রেণির স্বার্থের কথা উল্লেখ করেছেন (পাঠক, ইরাক পুনর্গঠনের কথা স্মরণ করুন। যুদ্ধ-পরবর্তী ইরাকে পুনর্গঠনের কাজ পেয়েছিল মার্কিন কোম্পানিগুলো)। মিসেল চসুডোভস্কি তো স্পষ্ট করেই বলেছেন,alleged jihadi plotters were the Product of US state terrorism. ৯/১১ নিয়ে চসুডোভস্কি এই মন্তব্য করেছিলেন (পাঠক পড়ূন চসুডোভস্কির বহুল আলোচিত গ্রন্থ The Globalization of War)। চমস্কির বই ৯/১১: 9/11: war there an Alternativeও পড়ে দেখতে পারেন।

শ্রীলংকায় আইএসের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে যত প্রশ্নই থাকুক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে, আইএস তাদের স্ট্র্যাটেজিতে পরিবর্তন এনে তাদের অস্তিত্ব জানান দিল। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের জন্য এটা একটা ‘ওয়েকআপ’ কল। আইএস আছে। তাদের স্ট্র্যাটেজিতে পরিবর্তন আনছে মাত্র। একসময় তারা সিরিয়াতে বিশাল এক ‘জিহাদি বাহিনী’ গঠন করে একটি ‘জিহাদি রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করেছিল। সে চেষ্টা সফল হয়নি। এখন ‘ইসলামের নামে’ এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আইএস তাদের অস্তিত্ব আবারও জানান দিয়ে গেল মাত্র।

প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক
[email protected]

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Advertisement