মোদিকে ভোট জেতাতে ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধাবস্থা থাকছে

আলতাফ পারভেজ :: মাত্র এক মাস হলো ভারতীয়রা তাদের ‘বাপু’ মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুবার্ষিকী পালন করেছে। অহিংসার দর্শন প্রচার করতে গিয়ে গান্ধী প্রায়ই বলতেন, ‘চোখের বদলে চোখ নীতি পুরো বিশ্বকে অন্ধ করে দেবে মাত্র।’ তবে সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া ভারতীয়রা এ মুহূর্তে স্পষ্টত সেটাই চাইছে।

১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরে আত্মঘাতী হামলায় ৪৪ আধা সামরিক সেনা হারিয়ে জাতীয়তাবাদী উত্তেজনায় উদ্বেল হয়ে ওঠে ভারত। আরএসএস-বিজেপি পরিবার দীর্ঘদিন এই ভারতই চাইছিল। মোদি সরকার দ্রুত উত্তেজিত নাগরিক সমাজকে আকাঙ্ক্ষামতো পণ্য সরবরাহ করেছে। ১২টি যুদ্ধবিমান সীমান্ত অতিক্রম করে প্রায় ৬০ কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত ভূমিতে বোমা ফেলামাত্রই ভারতজুড়ে একরূপ তৃপ্তি ও স্বস্তি নেমে আসে। যদিও ২৬ ফেব্রুয়ারি যেখানে বোমা পড়েছে সেটা জাবা নামের জঙ্গলাকীর্ণ একটি গ্রাম মাত্র। সেখানে ৩৫০ জঙ্গি হত্যার দাবির পক্ষেও কোনো তথ্য-প্রমাণ মেলেনি এখনো। কিন্তু ভারতের ‘বিজয়’ উদযাপনে তাতে কমতি ছিল না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তান দুটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ফেলে দিয়ে এ ঘটনার প্রতিউত্তর দিয়েছে। এভাবে দুই সপ্তাহের উত্তেজনা শেষে পাকিস্তান-ভারত এখন প্রায় পূর্ণাঙ্গ এক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। গান্ধী বিশ্বকে যুদ্ধবিরোধী দর্শন শেখাতে চাইলেও দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশেষভাবে নিজ দেশে তিনি যে অনেকাংশে ব্যর্থ সেটাই আবারও প্রমাণিত হলো।

যেকোনো দেশে জনসমাজ চরমভাবে আবেগগ্রস্ত হয়ে পড়লে কাণ্ডজ্ঞানের ব্যবহার কমে যায়। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্য এটাই মোক্ষম সময়। শান্তি, স্বস্তি ও ন্যায়বিচারের কবর রচিত হয় এতে। ভারতীয়দেরও এ মুহূর্তে এটা বোঝানো দুঃসাধ্য যে কাশ্মীরে আজাদির আন্দোলন চলছে প্রায় ৯০ বছর হলো। তাদের ৪৪ জন জওয়ান নিহত হওয়ার আগেও দশকের পর দশক ধরে সেখানে মানুষ মরছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সামরিকায়িত অঞ্চলের নাম কাশ্মীর। জইশ-ই-মুহাম্মদ কিংবা আদিল আহমেদ ধর কোনো হঠাৎ সৃষ্ট সন্ত্রাসী বাস্তবতা নয় এবং পাকিস্তানের বালাকোটের বনাঞ্চলে কোনো কল্পিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালালেই কাশ্মীরে শান্তি স্থাপিত হয়ে যাবে না।

কেবল ২০১৮ সালে কাশ্মীরে ২৬০ জন স্থানীয় গেরিলার পাশাপাশি ১৫০ জন ভারতীয় সৈনিকও মারা গেছে। আহত-নিহত বেসামরিক মানুষের সংখ্যাও তদ্রূপ। এরূপ প্রতিটি মৃত্যুই হতাশাজনক। ভারত-পাকিস্তানের সাম্প্রতিক উত্তেজনাকে ওই রক্তপাতের সঙ্গে মিলিয়েই পাঠ করা জরুরি। কিন্তু ভারতীয় ‘মিডিয়া’ এ ক্ষেত্রে গত দুই সপ্তাহজুড়ে ঠিক উল্টো ভূমিকায় ছিল। পুলওয়ামা আত্মঘাতী হামলাকে তারা সব অতীত পটভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করেই দেখাতে শুরু করে।

৪৪ জন সৈনিক নিহত হওয়ার পর থেকে সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ ভারতীয় প্রচারমাধ্যম পুরো দেশকে ধর্ম ও জাতিবাদী এক উত্তেজনায় মাতিয়ে তোলে। এটা তাদের কাটতি বাড়তে সাহায্য করে। তবে চলতি যুদ্ধাবস্থার দায় অনেকটা এসব প্রচারমাধ্যমের ওপরও বর্তায়। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে আরএসএস-বিজেপি পরিবারের প্রচারণার পথই কেবল মসৃণ হয়েছে এতে।

রাজনীতি ও যুদ্ধের যুগলবন্দী
আগামী ৪ অথবা ৫ মার্চ ভারতে জাতীয় নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষিত হবে। এপ্রিল-মেজুড়ে কয়েক দফায় এই নির্বাচন হবে। লোকসভার পাশাপাশি চারটি রাজ্যের (অন্ধ্র, ওডিশা, সিকিম, অরুণাচল) বিধানসভা নির্বাচনও হবে একই সঙ্গে। ইতিমধ্যে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে। বিজেপি সফলতার সঙ্গে পাকিস্তানে বোমাবর্ষণকে তার প্রধান সফলতা হিসেবে তুলে ধরছে। বিজেপির পাকিস্তান বিদ্বেষের সঙ্গে সাড়া দিয়ে দেশজুড়ে কাশ্মীরি শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের ওপর হামলা চলছে। বাড়তি হিসেবে মুসলমান ঘৃণাও এ মুহূর্তে ভারতজুড়ে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে তীব্র। ধারণা করা যায়, পুরো নির্বাচনী মৌসুমে বিজেপি সরকার ‘লাইন-অব-কন্ট্রোল’জুড়ে উত্তেজনা বহাল রেখেই তাদের পুনর্নির্বাচন নিশ্চিত করতে ইচ্ছুক। ভারতের বিরোধী দলগুলো ইতিমধ্যে মোদির বিরুদ্ধে দুই মাস আগের সুবিধাজনক অবস্থান খানিকটা হারিয়ে ফেলেছে। প্রচারমাধ্যমের জাতীয়তাবাদী উন্মাদনার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে তারা মূলত বিজেপির রাজনৈতিক কৌশলের কাছে আত্মসমর্পণ করে। যদিও সর্বশেষ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২১টি বিরোধী দল একসঙ্গে বসে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সৈনিকদের আত্মদান নিয়ে ‘সংকীর্ণ রাজনীতি’ না করার জন্য মোদির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

বিরোধী দলের এরূপ আহ্বান যে নির্বাচনী প্রচারণায় অগ্রাহ্য হবে সেটা প্রায় অবধারিত। তা ছাড়া কাশ্মীর সমস্যার সমাধান এবং পাকিস্তানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার প্রশ্নে বিরোধীদলগুলোর এমন কোনো অবস্থান নেই যা বিজেপির চেয়ে পৃথক। এ ক্ষেত্রে সবাই তারা সমাধান খুঁজছে কেবল সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে। আপত্তি কেবল এটাই, মোদি বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করছেন।

পাকিস্তান কি যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য?
খাইবার-পাখতুনওয়ারায় প্রথম ভারতীয় হামলায় পাকিস্তানের নাগরিকেরা হতবিহ্বল থাকলেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারতীয় বিমান ভূপাতিত হওয়ায় তারাও ইতিমধ্যে যুদ্ধ-উন্মাদনায় ভালোভাবেই শরিক হতে পেরেছে। করাচির রাজপথে মিষ্টি বিতরণের দৃশ্য খবরের পাতায় এসেছে। ভারতীয় বিমান হামলা স্বভাবত দেশটিতে সমালোচনার শক্তিকে পিছু হটিয়ে দিয়েছে। গত দুই সপ্তাহ থেকে মনে হচ্ছিল ইমরান খান সরকার যুদ্ধাবস্থা চাইছে না। পারমাণবিক বোমা ছাড়া সামরিক সক্ষমতায় তারা ভারতের সমকক্ষ নয়। উপরন্তু, দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থাও ভালো নেই। কিন্তু ভারতের বিমান হামলা তাদের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য মান-মর্যাদার প্রশ্ন তৈরি করে ফেলেছে। ভারতের বিমান হামলা ছিল স্পষ্টতই পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। ফলে পাকিস্তানিদের আহত আবেগ যেকোনভাবে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক ছিল এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভাগ্য তাদের সহায় হয়েছে। তবে কোনো ধরনের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে এখনো হামলা না করে তারা পরিমিতি বোধের পরিচয় দিয়েছে। উপরন্তু, একজন পাইলটকে হাতে পাওয়ার পরও ইমরান খান নাটকীয়ভাবে আবারও ভারতের প্রতি সংলাপের আহ্বান জানিয়ে বিশ্ব প্রচারমাধ্যমে কিছুটা সুবিধাজনক ইমেজ তৈরি করে নিয়েছেন। ভারতের বুদ্ধিজীবীদের একাংশও ইমরানের এই আহ্বানকে ইতিবাচক মনে করে টুইটারে মন্তব্য করেছেন।

তবে তাতে যুদ্ধের উত্তেজনা থামছে না। আকাশযুদ্ধ ছড়াচ্ছে স্থলেও। লাইন অব কন্ট্রোল-এর দুই পাশেই বিপুল সৈন্য সমাবেশ ঘটেছে। পাকিস্তানের পাঁচটি সীমান্ত আউটপোস্ট ধ্বংস এবং জম্মুতে একটা পাকিস্তানি বিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে ভারত। একইভাবে পাকিস্তানও পাঁচজন ভারতীয় সৈন্যকে আহত করার দাবি করেছে। এরূপ দাবি-পাল্টা দাবি আসন্ন সময়ে কেবল বাড়তেই থাকবে।

অস্ত্র উৎপাদক দেশগুলোর বাড়তি সুযোগ, কাশ্মীরে মানবিক বিপর্যয়
বিশ্বের মুরব্বি দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান-ভারত চলতি পঞ্চম যুদ্ধে প্রথম প্রতিক্রিয়া দেখায় যুক্তরাষ্ট্র। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও মঙ্গলবার সামরিক কর্মকাণ্ড আর না ছড়াতে ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লির প্রতি আহ্বান রেখেছিলেন। চীনও দুই পক্ষকেই সংযমের ডাক দিয়েছে। তারা সংলাপে বসতে অনুরোধ করেছে উভয় দেশকে। একই রকম অনুরোধ রেখেছেন জাতিসংঘের মহাসচিবও। বলা বাহুল্য, এসব অনুরোধ ইতিমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে।

চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্কের গভীরতা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের অনুরূপ সুসম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ায় দুই পরাশক্তির নিরপেক্ষ কোনো সালিসি ভূমিকার সুযোগ নষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে জইশ-ই-মুহাম্মদের প্রধান মাসুদ আজহারকে ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করতে আবারও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নতুন করে প্রস্তাব আনার উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ মূলত কূটনীতিকভাবে চীন-পাকিস্তান সম্পর্ককে চাপে ফেলার ইচ্ছাতাড়িত। পূর্বে এরূপ এক প্রস্তাবে চীন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরে জইশ-এর আত্মঘাতী হামলার পর চীনের পক্ষে আবার জাতিসংঘে মাসুদ আজহারের নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করা বিব্রতকর হবে। এ ছাড়া মার্চ থেকে ফ্রান্স নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে আসছে, এটা ভারতের জন্য বড় এক কূটনীতিক আশাবাদের দিক। পাকিস্তানের সঙ্গে বিবাদে ফ্রান্স প্রকাশ্যেই ভারতের পক্ষ নিচ্ছে। এর কারণ অবোধগম্য নয়। ভারতের অন্যতম অস্ত্র বিক্রেতা ফ্রান্স। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন সবারই এই যুদ্ধে ব্যাপক লাভ রয়েছে। এসব দেশের সমরাস্ত্র শিল্প খাত ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লির চলতি আক্রমণাত্মক ভূমিকায় গোপনে খুশি হতেই পারে।

তবে কাশ্মীরিদের জন্য এটা এক প্রবল দুর্যোগ। এই যুদ্ধাবস্থার পূর্বেই কাশ্মীরজুড়ে প্রতি ১০ জন বেসামরিক মানুষের বিপরীতে ১ জন ভারতীয় সৈন্য অবস্থান করছিল। সেখানে নতুন করে ১০ হাজারের মতো সৈনিক পাঠিয়েছে ভারত। কাশ্মীরজুড়ে ব্যাপক ধরপাকড় চালানো হচ্ছে। প্রধান নেতাদের মধ্যে প্রায় সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে চলছে হরতালও। সামগ্রিক অবস্থায় কাশ্মীরজুড়ে ওষুধ ও খাবারের সংকট দেখা দিতে শুরু করেছে। ভারতীয় প্রচারমাধ্যম, প্রশাসন ও রাজনীতিবিদেরা কাশ্মীরের মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়ে এ মুহূর্তে উদাসীন ভূমিকা পালন করছেন।

অতীতের হৃদ্যতা এখন কেবল স্মৃতি
আধুনিক যুদ্ধবিদ্যার একটা বড় উপসংহার হলো যখন দুই প্রতিপক্ষের হাতে পারমাণবিক বোমা থাকে তখন সেই যুদ্ধে কেউই জিততে পারে না। তবে আপাতত যুদ্ধ অনেকখানি বেধে গেছে এবং বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতিও শুরু হয়ে গেছে। এটাই বাস্তবতা। পাকিস্তান ও ভারত উভয় দেশে ইতিমধ্যে কয়েকটি বেসামরিক বিমানবন্দর সাময়িক বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।

পাকিস্তান-ভারত সম্পর্কের বর্তমান পর্যায়ে এটা ধারণা করাও কঠিন যে পাকিস্তান একদা (১৯৯০) তার দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘নিশান-ই-পাকিস্তান’-এ ভূষিত করেছিল এক ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে। পাকিস্তান এবং ভারতে কেউই এ মুহূর্তে মনে করছে না যে আপাতত দুই দেশের মধ্যে অতীতের সেই হৃদ্যতা আর ফিরে আসবে এবং কোনোরূপ সমঝোতা বা শান্তি আলোচনা সম্ভব। বিশেষ করে ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের যে প্রচণ্ড ঢেউ বয়ে যাচ্ছে তাতে ভারতের কোনো রাজনীতিবিদের পক্ষে আর অদূরভবিষ্যতে পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করার অবকাশ নেই। আবার পাকিস্তানের সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ভারতের আহত পাইলটের ছবি যেভাবে প্রতিশোধস্পৃহার সঙ্গে ভাইরাল হচ্ছে তাতেও স্পষ্ট, উভয় দেশের মানুষ ক্রমে ক্রমে তাদের শাসকদের যুদ্ধ উন্মাদনায় শরিক হয়ে পড়ছে। এসবই দক্ষিণ এশিয়ার জন্য দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Advertisement